১৯৯২ সাল, ছাত্রলীগ এবং মনিরুজ্জামান বাদল

  •  
  •  
  •  
  •  

মোঃ শফিকুল আলম: ১৯৯২ সালের ৯ জানুয়ারী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী এবং পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদয্যালয় – টিএসসি সড়ক দ্বীপে প্রধান অতিথি হিসেবে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আসছেন।

পেছনে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বামে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-ছাত্র মিলনায়তন, ডানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, সামনে রোকেয়া হল এবং ভাষা ইনস্টিটিউটের মাঝখান দিয়ে নীলক্ষেত অভিমুখি উন্মুক্ত সড়ক।

মন্চের ডান-বাম এবং সম্মুখভাগ উন্মুক্ত ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মহানগরের বিভিন্ন থানা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি।

প্রিয় নেত্রীকে বরনডালা সাজিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে সবাই উচ্ছাসে ফেটে পরছিলো। এরই মধ্যে শীতের পড়ন্ত বিকেলে উৎসবের মিলনমেলায় শাহাবাগের দিক থেকে প্রিয় নেত্রী এসে যোগ দিলেন।

আমি এবং ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব মনিরুজ্জামান বাদল ভাই সবার মতো একটু এগিয়ে গিয়ে নেত্রীকে স্বাগত জানালাম। বাদল ভাই যেকোনো আনুষ্ঠানিকতায় সাদা শার্ট পরতেন।

সেদিনও ব্যতিক্রম ঘটেনি। সাদা শার্ট পরিহিত এবং clean shaved ছিলেন। সাথে তাঁর ঐতিহাসিক মটর বাইকটিও ছিলো। নেত্রী মন্চে উপবিষ্ট হলে আমি এবং বাদল ভাই মন্চ ঘেষে লাইব্রেরির দিকটায় দাঁড়ালাম।

অনুষ্ঠান চলাকালীন প্রায় পুরো সময়টা বাদল ভাই তাঁর ডান হাতটি আমার বাম কাঁধে রেখেছিলেন এবং আমরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই রোকেয়া হলের দিক থেকে ছাত্রলীগে নতুন সৃষ্ট তৃতীয় বিশ্ব হিসেবে পরিচিত (মোস্তফা মোহসিন মন্টু গ্রুপ হিসেবে অধিক পরিচিত ছিলো) একটি গ্রুপ উত্তেজক শ্লোগান দিয়ে সমাবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি করছিলো।

এরই মধ্যে প্রিয় নেত্রী মন্চে থাকাবস্থায় দু’এক রাউন্ড গুলিও ফুটিয়েছে। নেত্রী সমাবেশস্থলে উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই ঘটনার সূত্রপাত।

প্রথমে মন্টুগ্রুপের একজন কারাভ্যন্তরীণ থাকা জহুরুল হক ছাত্র-সংসদের সাবেক জিএস মোশাররফ হোসেন রাজার মুক্তি চাই সম্বলিত ব্যানারটি ছিঁড়ে ফেললো।

সমাবেশের কখা চিন্তা করে রাজার পক্ষের কেউ প্রতিবাদ করেনি। সদ্য ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তখন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী দিয়ে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার পরিপূর্ণ রেখেছিলো।

এরই মধ্যে ছাত্রলীগ অনেকটা জহুরুল হক হল এবং জগন্নাথ হলে caged ছিলো। জহুরুল হক হল থেকে সরকারের ‘বি-টীম’ মন্টুগ্রুপ ফরিদপুর-বরিশাল গ্রুপ (প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব) বিতাড়িত করে জগন্নাথ হলে সীমাবদ্ধ করে রাখে।

ফরিদপুর-বরিশাল গ্রুপ সেদিন শেখ হাসিনার আগমন সংহত করতে জহুরুল হক হল পূন:দখল করে নিলে মন্টুগ্রুপ সমাবেশস্থলে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করে।

এরই মধ্যে প্রধান অতিথি জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি এ্যাডভোকেট হাসান (রাজার আইনজীবি) আমাদের দিকে এগিয়ে আসে।

আপার বক্তৃতা শেষ। বাদল ভাই আমাকে হাসানকে নিয়ে টিএসসির দেয়াল ঘেঁষে চা’দোকানে যাওয়ার কথা বলে শামসুননাহার হলের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনলাম কিন্তু গুরুত্ব দিলামনা।

মন্টু গ্রুপকে মিছিলসহকারে সোহরাওয়ার্দী পার্কের দিকে যেতে দেখলাম। এরই মধ্যে ছাত্রলীগের সভাপতি শাহে আলম ভাই অনেকটা ত্রস্ত হয়ে আমার দিকে দৌঁড়ে আসলেন।

আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বাদল তোমার সাথে ছিলো। কোথায় গেলো? আলম ভাই’র মুখাবয়ব দেখে আমার বুঝতে বাকী থাকলোনা যে কোনো একটা অঘটন ঘটেছে। আমি এক দৌঁড়ে শামসুননাহার হলের দিকে গেলাম।

কেউ একজন আমাকে দেখে বাদল ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা জানালো এবং ঢাকা মেডিকেলে যেতে বললো। এক দৌঁড়ে ঢাকা মেডিকেলে গেলাম।

এমার্জেন্সী গেটে আফজাল হোসেন এবং আতাউর রহমানের চিৎকার বাদল ভাই আর নেই। তাৎক্ষণিক আমরা বিক্ষোভে ফেটে পরলাম। আমরা প্রথম শ্লোগান উত্থাপন করলাম খুনি মন্টুর বহিষ্কার এবং ফাঁসি চাই।

মন্টু সাহেব তখনও যুবলীগের চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে এ ধরনের শ্লোগান উত্থাপন তখন অনেকটা ধৃষ্টতার ব্যাপার ছিলো।

তিনি আমাদের মতো দু’একজনকে তখন পৃথিবী থেকে নাই করে দিতে পারেন জেনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গুলিস্তান আওয়ামীলীগ অফিসের সামনে বাদল ভাই এর লাশ নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করলাম।

মন্টু সাহেবের চোখ রাঙানির অবসান ঘটলো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় এবং সাহসী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে। আওয়ামীলীগের নির্বাহী কমিটির সভায় জনাব মন্টুর বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগকে জিম্মি করার রাজনীতির অবসান ঘটে।

দু:খজনক হলেও সত্য মন্টু সাহেবের সকল সহযোগী খুনিরা (বাদল ভাই’র খুনিরাসহ) এখন শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যেই নেই তারা নেতৃত্ব্রের পর্যায়ে রয়েছে। শুধু মন্টু সাহেবই নেই বাকী সবাই আছেন।

জানিনা ছাত্রলীগ আজ এই দিনটিকে কিভাবে স্মরণ করছে। মনিরুজ্জামান বাদলকে যারা চিনতেন বা তার নেতৃত্বে আমরা যারা সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করেছি তারা তাঁর অসাধারন নেতৃত্বগুনে আজও মুগ্ধ হয়ে আছি।

তাঁর অসাধারন ত্যাগের মহিমা আমাদের কাছে চিরঅম্লান থাকবে। আজকের এই দিনে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে বাদল ভাইকে স্মরণ করছি। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

মোঃ শফিকুল আলম
মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।
[ঢা/এফএ]

জানুয়ারি ১০, ২০২১ ৭:০১

(Visited 62 times, 1 visits today)