হেলাল,তবারক; মৌলভীবাজা‌রের প্রবীনতম দুই রাজনী‌তি‌বিদ

হেলাল,তবারক; মৌলভীবাজা‌রের প্রবীনতম দুই রাজনী‌তি‌বিদ
  •  
  •  
  •  
  •  

ঢাকা১৮ ডেস্ক: তারা দুজ‌নেই দ‌ক্ষিন সি‌লে‌টের বামপন্থী রাজনীতির দুই পু‌রোধা ব‌্যা‌ক্তিত্ব। ১৯৬২ সা‌লে শিক্ষা ক‌মিশন রি‌র্পোট বা‌তি‌লের আ‌ন্দোলনে স্কুল ছাত্র থাকা অবস্থায় তা‌দের রাজ‌নৈ‌তিক জীবন শুরু। দুজ‌নের রাজনৈ‌তিক জীব‌নের বয়স পঞ্চাশ বছর পে‌রি‌য়ে‌ছে বহু‌দিন আ‌গে। ১৯৭০ সাল থে‌কে অ‌নে‌কের নির্বাচন প‌রিচালনা থে‌কে রাজ‌নৈ‌তিক কৌশল নির্ধারন ক‌রে জিতি‌য়ে নি‌য়ে এ‌লেও কিন্তু,আমা‌দের মৌলভীবাজার জেলাবাসীর দুর্ভাগ‌্য; তা‌ঁ‌দের ম‌তো পোড় খাওয়া,মা‌ঠের রাজনীতি‌বিদ‌দের অন্তত একবা‌রের জন‌্যও এম‌পি বানা‌তে পা‌রিনি আমরা।

স‌া‌বেক প্রতিমন্ত্রী,চারবা‌রের সা‌বেক এম‌পি এড‌ভো‌কেট এবাদুর রহমান চৌধুরী এ মুহু‌র্তে মৌলভীবাজার জেলার জী‌বিত প্রবীনতম রাজনীতি‌বিদ। তাঁর প‌রেই জী‌বিত ও স‌ক্রিয় যে দুজন রাজনীতি‌বি‌দের নাম নি‌তে হ‌বে তারা হ‌লেন লুৎফুর রহমান চৌধুরী হেলাল ও এড‌ভো‌কেট তবারক হোসেইন এই দুই ব‌রেন‌্য রাজনী‌তি‌বিদ ও সমাজকর্মী তা‌দের জীব‌নের দীর্ঘ ও মুল‌্যবান সময়টুকু রাজনী‌তি ও মান‌ু‌ষের জন‌্য ব‌্যয় ক‌রে‌ছেন। কিন্ত‌ু,আমা‌দের পরবর্তী প্রজন্ম দু‌রের কথা খোদ আমা‌দের প্রজ‌ন্মের বেশিরভাগই জা‌নেন না তা‌দের কী‌র্তিগাথা।
আজ‌কের লেখায় আ‌মি এই দুই বর্ষীয়ান রাজনী‌তি‌বি‌দের কর্মময় জীব‌নের কিছুটা খুব সংক্ষিপ্ত প‌রিস‌রে তু‌লে ধরবার চেষ্টা করব।

লুৎফুর রহমান চৌধুরী হেলালঃ
১৯৬২ সা‌লে শিক্ষা ক‌মিশন রি‌র্পোট বা‌তি‌লের আ‌ন্দোলনে স্কুল ছাত্র থাকা অবস্থায় তার রাজনৈ‌তিক জীবন শুরু। ১৯৬৪ সা‌লে কুলাউড়া,বড়‌লেখা ও রাজনগর এ তিন থানা নি‌য়ে অ‌ভিভক্ত ছাত্র ইউ‌নিয়‌নের আঞ্চ‌লিক সাধারন সম্পাদক,১৯৬৪ সা‌লে মৌলভীবাজার মহকুমা ছাত্র ইউ‌নিয়‌নের সহ সাধারন সম্পাদক নির্বা‌চিত হন। স্নাতক পর্যা‌য়ে পড়া‌লেখার উ‌দ্দে‌শ্যে চট্রগ্রা‌মে চ‌লে যান। এসময় চট্রগ্রাম সি‌টি ক‌লেজ ছাত্র ইউ‌নিয়‌নের সাধারন সম্পাদক ও ১৯৭০ সা‌লে পুর্ব পা‌কিস্তান ছাত্র ইউ‌নিয়ন মেনন গ্রুপের চট্রগ্রাম জেলা কমি‌টির ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক ও কেন্ত্রীয় ক‌মি‌টির সদস‌্য নির্বা‌চিত হন।
(পরবর্তী‌তে পুর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউ‌নিয়‌ন)।
মহান মু‌ক্তিযুদ্ধে প্রখ‌্যাত রাজনী‌তি‌বিদ নবাব আলী ছফদর খান রাজা সা‌হেবের (সাবেক এম‌পি নবাব আলী আব্বাস খা‌নের পিতা)নেতৃ‌ত্বে কুলাউড়ায় মু‌ক্তিযুদ্ধ সংগঠ‌নে অসামান‌্য ভু‌মিকা রা‌খেন।

মাওলানা ভাসানীর ঘ‌নিষ্ট সা‌ন্নিধ‌্য পাওয়া এ রাজনীত‌ি‌বিদ
স্বাধীনতার পর ভাষানী ন‌্যাপ ও ১৯৭৪ সা‌লে ক‌্যা‌প্টেন হা‌লিম চৌধুরী, কাজী জাফর আহ‌মদ ,রা‌শেদ খান মেনন,হায়দার আকবর খান র‌নোর সা‌থে ইউনাই‌টেড পিপলস পা‌র্টি গঠ‌নে স‌ক্রিয় হন। এ দ‌লে কেন্দ্রীয় ক‌মি‌টির সদস‌্য ,৭৮ থে‌কে ৮৫ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠ‌নিক সম্পাদক ও সর্বশেষ সহ সাধারন সম্পাদ‌কের দা‌য়িত্ব পালন ক‌রেন। ১৯৮৬ সা‌লে জাতীয় পা‌র্টির প্রতিষ্টার দিন থে‌কে দলটির কেন্দ্রীয় ক‌মি‌টির সদস‌্য,মৌলভীবাজার জেলা ক‌মি‌টির সাধারন সম্পাদক ও সভাপ‌তি প‌দে দীর্ঘকাল ‌ছি‌লেন। জেলা জাতীয় পা‌র্টির বর্তমান সভাপতি সৈয়দ শাহাবু‌দ্দিন আহ‌মেদও জেলার এ সম‌য়ের প্রবীনতম এক স‌ক্রিয় রাজনী‌তি‌বিদ। জনাব হেলাল জাপার কেন্দ্রীয় ক‌মি‌টির যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও সর্বশেষ ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রেসি‌ডিয়াম সদ‌স্যের পদমর্যাদায় পা‌র্টি চেয়ারম‌্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশা‌দের উপ‌দেষ্টা হি‌সে‌বে স‌ক্রিয় ছি‌লেন রাজনী‌তি‌তে। ২০১৪ সা‌লের নির্বাচন নি‌য়ে এরশা‌দের সা‌থে মত‌বি‌রো‌ধের জের ধ‌রে কাজী জাফর আহ‌মে‌দের নেতৃ‌ত্বে নতুন দল গঠ‌নে স‌ক্রিয় হন। লুৎফুর রহমান চৌধুরী দল‌টির প্রতিষ্টালগ্ন থে‌কে দল‌টির প্রেসিডিয়াম সদস‌্য হি‌সে‌বে দা‌য়িত্ব পালন কর‌ছেন।

১৯৮৬ সা‌লের জাতীয় নির্বাচ‌নে জাত‌ীয় পা‌র্টির প্রার্থী হি‌সে‌বে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসন থে‌কে লাঙ্গল প্রতী‌কে নির্বাচন ক‌রেন। ১৯৮৬ সা‌লের শুরু‌তে বৃহত্তর সি‌লে‌টে প্রথমবা‌রের আওয়ামীলী‌গের দুই সা‌বেক এম‌পি জাতীয় পা‌র্টিতে যোগ দেন। তারা হ‌লেন বড়‌লেখার সিরাজুল ইসলাম ও মৌ‌লভীবাজা‌রের গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী। ৮৮ সালে নিজ আসন কুলাউড়ায় মাত্র বি‌শের কোঠায় থাকা নবাব আলী আব্বাস খান জাতীয় পা‌র্টির টি‌কে‌টে প্রথমবার এম‌পি হন। পরবর্তী সম‌য়ে আ‌রো দুবার কুলাউড়া থে‌কে এম‌পি নির্বা‌চিত হন নবাব আলী আব্বাস। পাদপ্রদীপের আ‌লোর বাই‌রে অ‌নেকটা নিভৃতচারী জীবন যাপন করা লুৎফু্র রহমান চৌধুরী হেলাল এস‌বের নেপ‌থ্যের কা‌রিগর হি‌সে‌বে কাজ ক‌রেন। জাতীয় পা‌র্টি জামানায় বৃহত্তর সি‌লে‌টের অন‌্যতম এই কিং মেকার রাজনী‌তি‌বিদ গত সা‌ড়ে তিন বছর আগে স্বপ‌রিবা‌রে আ‌মে‌রিকায় গে‌লেও নিয়‌মিত এখন দে‌শে আসা যাওয়ার ম‌ধ্যে র‌য়ে‌ছেন। স‌ক্রিয় র‌য়ে‌ছেন আ‌মে‌রিকায় বাংলা‌দেশী ক‌মিউ‌নি‌টি‌তেও।

লুৎফুর রহমান চৌধুরী হেলাল ব‌্যা‌ক্তিগত জীব‌নে দুই পুত্র ও এক কন‌্যার জনক। তার বাবা তু‌তিউর রহমান চৌধুরী ১৯৭০ সা‌লে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নেন।

বহু বছর আ‌গে লুৎফুর রহমান চৌধুরী হেলাল আমা‌কে আলাপচারীতায় ব‌লে‌ছি‌লেন, ৫০ বছ‌রের বে‌শি সময় রাজনী‌তি করলেও কোন ধর‌নের সরকারী লাভজনক পদ,আ‌র্থিক স‌ু‌যোগ সু‌বিধা এক টুক‌রো জ‌মি বা কোন ব‌্যাংক লোনও আমি নেই‌নি। মানু‌ষের কল‌্যা‌নের রাজনীতি ক‌রে‌ছি। নি‌জে কিছু পাবার বা হওয়ার জন‌্য কোন‌দিন রাজনী‌তি ক‌রি‌নি।

এড‌ভোকেট তবারক হো‌সেইন-
বড়‌লেখার নান্দুয়া গ্রা‌মের সন্তান তবারক হোসাইন ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে যোগদান দেন ছাত্রাবস্থায়।
৬৫ সা‌লে সি‌লেট এমসি ক‌লে‌জে ভ‌র্তির পর পর্যায়ক্রমে এম‌সি ক‌লেজ শাখা ছাত্র ইউ‌নিয়নের সভাপতি,সি‌লেট জেলা শাখার সহ সাধারন সম্পাদক, সহ সভাপ‌তির দা‌য়িত্ব পালন ক‌রেন। ১৯৬৬ সা‌লে আয়ুব খান‌কে জুতা ছু‌ড়ে মারার অপরা‌ধে ক‌লেজ থে‌কে তা‌কে অ‌লি‌খিতভা‌বে ব‌হিস্কার করা হয়। এসময় তি‌নি শিক্ষকতার পাশাপা‌শি কৃষক স‌মি‌তির সংগঠন গড়‌তে আত্বনি‌য়োগ ক‌রেন। ১৯৬৯ সা‌লে তবারক হোসেইনকে আহবায়ক করে তার নেতৃ‌ত্বে বড়‌লেখায় ন‌্যাপ গ‌ঠিত হয়। ১৯৭০ সা‌লের নির্বাচ‌নে ন‌্যাপ প্রার্থী অপুর্ব কা‌ন্তি‌ ধ‌র ৭৩ সা‌লের নির্বাচ‌নে বিদ‌্যুত কা‌ন্তি দের নির্বাচ‌নে তি‌নি ছি‌লেন মুল সমন্বয়ক। মহান মু‌ক্তিয‌ু‌দ্ধে ন্যাপ-কম্যনিষ্ট পার্টি – ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সহকারী ক্যাম্প পরিচালক ছিলেন।১৯৭২ সালে রাজনগ‌রের মুন্সিবাজারে অনু‌ষ্টিত কৃষক সম্মেলনে সাংগঠনিক কমিটির আহ্বায়ক নির্বা‌চিত হন।

স্বাধীনতার পর তি‌নি সাংবা‌দিকতায় অসামান‌্য ভু‌মিকা রা‌খেন। দৈ‌নিক বাংলার সি‌লেট অফি‌সের ষ্টাফ রি‌পোর্টার, সাপ্তা‌হিক সি‌লেট সংবা‌দের প্রধান সম্পাদক,দেশবার্তা প‌ত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হি‌সে‌বে কাজ ক‌রেন। সি‌লে‌টের সাংবাদিকতায় তরুন এক‌টি প্রজ‌ন্মের উত্থানে তি‌নি অনবদ‌্য ভু‌মিকা রা‌খেন।সিলেটে সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন দ্বারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। ‌সিলেট প্রেস ক্লাবের স্বাধীনতা উত্তর সময়ের সাধারন সম্পাদক ছিলেন। আজ প্রেসক্লাব যে ভুমিতে অবস্থিত সে জ‌মি‌টি আদায়েও তার ভু‌মিকা ছিল।

তি‌নি সি‌লেটে ও পরবর্তী সময় থে‌কে অদ‌্যাব‌ধি সুপ্রীম কো‌র্টে আইনজীবি হিসে‌বে কাজ কর‌ছেন। দুবার বার কাউ‌ন্সি‌লে নির্বা‌চিত হন,ছি‌লেন ঢাকাস্থ মৌলভ‌ীবাজার স‌মিতির সভাপ‌তি।

ড. কামাল হো‌সেন গন‌ফোরাম গঠন কর‌লে তি‌নি গন‌ফোরা‌মের প্রেসি‌ডিয়াম সদস‌্য হি‌সে‌বে দীর্ঘদিন দা‌য়িত্ব পালন ক‌রেন। স্ত্রীর অসুস্থতা ও পা‌রিবা‌রিক কার‌নে অ‌তি সাম্প্রতিক সম‌য়ে তি‌নি রাজনী‌তি‌তে সেভা‌বে স‌ক্রিয় নন।

তবারক হোসেইন সম্প‌র্কে ২০১৪ সা‌লের নির্বা‌চনের আ‌গে এড‌ভো‌কেট এবাদুর রহমান চৌধুরী এক‌টি মন্তব‌্য ক‌রেন। এবাদুর রহমান চৌধুরী সে‌দিন ব‌লেছি‌লেন, বড়‌লেখায় আমি আর নৌকা মার্কা ছাড়া সুষ্ঠ নির্বাচন হ‌লে এই মুহু‌র্তে একজন মানুষ লড়াই করার শ‌ক্তি রা‌খে,তি‌নি এড‌ভো‌কেট তবারক হোসেইন। এবাদুর রহমান চৌধুরী আমার মাধ‌্যমে তবারক হো‌সেইনের কা‌ছে এক‌টি বার্তা পাঠান। আমি সে বার্তা‌টি স্বশরী‌রে তাঁর কা‌ছে পৌ‌ঁ‌ছে দিই। তবারক হো‌সেন,বৃহত্তর সি‌লে‌টের একজন বর্ষীয়ান রাজ‌নৈ‌তিক ব‌্যা‌ক্তিত্ব;যার এক‌টি সাফল‌্যময় পেশাদার সাংবা‌দিকতার ক‌্যারিয়ার ছিল,বর্তমা‌নে একজন খ‌্যা‌তিমান আইন‌বিদ।

আমরা যারা লেখা‌লে‌খি সাংবা‌দিকতা ক‌রি,তাদের দায়বদ্ধতার দায় থা‌কে। দায়বদ্ধতা থা‌কে আমা‌দের গুনী সন্তান‌দের কর্মময় ই‌তিহাস প্রজ‌ন্মের কা‌ছে পৌ‌ঁ‌ছে দেবার। জা‌নি এই লেখা সেই দায় হয়ত খু্ব সামান‌্যই হয়ত শুধতে পার‌বে।
—মুন‌জের আহমদ চৌধুরী

ঢা/আইএইচই

নভেম্বর ৫, ২০২০ ১০:০৩

(Visited 45 times, 1 visits today)