হাসিবের সাইকেল | ১ম পর্ব

হাসিবের সাইকেল | প্রতীকী ছবি

*প্রেক্ষাপটঃ এটি একটি গল্পনির্ভর বাস্তব জীবনভিত্তিক অতি দুঃখজনক কিংবা বিয়োগান্তক ঘটনা। ২০০২ সালে এই রাজধানী ঢাকায় গল্পের ছোট ছেলেটিকে অপহরণকারীরা নৃশংসভাবে টুকরা টুকরা করে হত্যা করে। আজ পড়ুন তৃতীয় অথবা শেষ পর্বের মধ্যে এর প্রথম পর্ব।

আলী আহসান প্রিন্সঃ ট্রিং টিং করে বেল বাজছে, সাঁই সাঁই করে রাস্তা আর আশেপাশের সবকিছু পার হয়ে যাচ্ছে। নতুন সাইকেলের গন্ধে মনের ভেতর আনন্দের সুড়সুড়ি অনুভুতি। কি দারুন চকচকে নীল রঙের সাইকেল! সিটের উপর বসে প্যাডেল ঘোরানোর সময় নিজেকে রাজার মতন মনে হচ্ছে নিজেকে।

কিন্তু কে যেন পিছন থেকে বার বার হালকা করে ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কাটা এবার জোরে জোরে লাগছে, মনে হচ্ছে ও পড়ে যাবে আর একটু জোরে ধাক্কা লাগলে। কিন্তু পড়ে গেলেই ওর সাইকেলটা নষ্ট হয়ে যাবে।

খুব শক্ত করে হ্যান্ডেলটা ধরে আছে ও এখন, যেন কিছুতেই পড়ে না যায়। কিন্তু শেষ রক্ষা করা গেল না, ব্যালান্স হারিয়ে ও পড়ে যাচ্ছে নিচে। সাইকেলটা রাস্তায় বাড়ি খাওয়ার আগেই ওর সমস্ত চেতনা ফিরে এল।

আম্মা অনেকক্ষন থেকে ডাকছেন, হাসিব, এই হাসিব! ওঠ বাবা। আর কতক্ষন ঘুমাবে? চোখ মেলে তাকাতেই দেখে আম্মা ওকে ডাকছেন। হাসিবের এবার মনে পড়ল, ও স্বপ্ন দেখছিল এতক্ষন। ধুর! কি সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিল আর আম্মা এসে ওর ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে দিলেন।

ঘুম জড়ানো কণ্ঠে হাসিব বিড়বিড় করতে থাকল, ইস! কি সুন্দর একটা স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। বিছানায় ওর পাশে এসে বসলেন মিলি। ছেলেটার মাথা ভর্তি চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানতে চাইলেন, কি স্বপ্ন দেখছিলে তুমি? আমাকে বলবে বাবা?

হাসিব একটু লজ্জা পেল স্বপ্নটার কথা বলার সময়। সব শুনে মিলি একটু হাসলেন। তোমার আব্বুকে বলব তোমাকে একটা সাইকেল কিনে দিতে কিন্তু সামনে পরীক্ষা, আগে রেজাল্ট ভাল কর।

হাসিবের একটু রাগ হল, সেই কবে থেকেই তো আপনি বলছেন রেজাল্ট ভাল কর তাহলে সাইকেল কিনে দেব। ক্লাস ফাইভের সময়ও আপনি এই কথা বলেছেন। আমার রেজাল্টতো অনেক ভাল হয়েছে, তবুও আব্বু সাইকেল কিনে দেননি।

মিলি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। দিদারকে বলেছিলেন তিনি কিন্তু ব্যবসা নাকি ভাল যাচ্ছে না, এই সমস্যা সেই সমস্যা, তাই আর কেনা হয়নি। একটা সাইকেলের যে কি শখ হাসিবের কিন্তু কিনে দেব দেব করেও কিনে দেওয়া হচ্ছে না।

ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, আমি তো আর চাকরি করি না রে বাবা। আমার কাছে টাকা থাকলে আমি এখুনি তোমাকে একটা সুন্দর সাইকেল কিনে দিতাম। এখন ওঠ বাবা, স্কুলে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।

মিলি ছেলের কাছ থেকে উঠে ওর জন্য খাবার রেডি করতে গেলেন। কাল রাতে গাজরের হালুয়া বানিয়ে রেখেছেন। রুটি দিয়ে ছেলেটা এই হালুয়া খেতে খুব পছন্দ করে। অনেকগুলো রুটি বানিয়ে মিলি ডাইনিং টেবিলে রাখলেন।

হাসিবকে সারপ্রাইজ দেবেন বলে হালুয়ার বাটিটা তিনি ডাইনিং টেবিলের পাশের ড্রেসারের নিচে রেখে দিয়েছিলেন। ছেলেটা খেতে খুব পছন্দ করে, যে কোনও ভাল খাবার সামনে পেলে এক মুহুর্তে শেষ করে দেয়।

কোনও ধরনের গল্প শুরু হলে, হাসিবের সেই গল্প যেয়ে খাবারের গল্পের সাথে মিশে যায়। যেমন ওকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার স্কুল কেমন হল আজ? হাসিব তখন বলবে, স্কুল খুব ভাল হয়েছে।

এরপর বলবে, জান আম্মু! আজকে আমাদের এক বন্ধু কি টিফিন নিয়ে এসেছিল? তখন ওর চোখ মুখ চকচক করবে সেই সব কাল্পনিক খাবারের গল্পে। হাসিবকে দেখলে মনে হবে ও যেন সেই খাবারগুলো ঠিক সামনে দেখতে পাচ্ছে।

এত সুন্দর করে খাওয়ার গল্প করতে থাকবে, তখন আর ইচ্ছা হয় না ওকে বলে “তোমার স্কুলের গল্প কি শুধু খাবার দাবারের গল্পই হয় সবসময়”?

মিলি জানেন, লুকিয়ে না রাখলে সকাল পর্যন্ত হালুয়া রাখা যাবে না, তার আগেই শেষ হয়ে যাবে। নিচু হয়ে ড্রেসারের নিচে হাত দিলেন তিনি কিন্তু কিছু নেই ওখানে। পুরো ড্রেসারের নীচে, পাশে কোথায় হালুয়ার বাটিটা নেই।

মিলির স্পষ্ট মনে আছে এখানেই তিনি রেখেছিলেন হালুয়ার বাটিটা। ফ্রিজের ভেতর খুলে দেখলেন, নাহ ! ওখানেও নেই। তাহলে গেল কোথায়? কাজের মেয়েটা ভুল করে কিচেনে রাখল নাকি? সেখানেও ভাল করে খুঁজে দেখলেন, কোথাও নেই গাজরের হালুয়া।

একদম বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? মিলি নিজের হাতে হালুয়ার বাটিটা ড্রেসারের নিচে রেখে গেছেন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে। হাসিব রেডি হয়ে চলে এসেছে ডাইনিং টেবিলে। রুটিগুলো দেখে এবার ও ভয় পেল।

আম্মু এখুনি বুঝে ফেলবে ও কি করেছে। ইস, এখন কি হবে? ভয়ে ভয়ে হাসিব ডাইনিং এর একটা চেয়ার টেনে বসল। অপেক্ষা করছে এর পর কি হয়। নির্ঘাত আজকে কান ধরে উঠ বস করতে হবে ওকে। ভুল করলেই কান ধরে উঠবস, কোনও মাফ নেই।

মিলি ডাইনিং এ ফিরে এসে দেখেন হাসিব মুখ নিচু করে বসে আছে। অনেক পিঁয়াজ আর ধুনেপাতা দিয়ে ডিম ভাজা হাসিব খুব পছন্দ করে। ওর সামনে ডিম ভাজা আর দুটো রুটি দিলেন তিনি। কিন্তু ছেলেটা মুখ নিচু করে বসে আছে কেন?

এই হাসিব, মুখ নিচু করে বসে আছ কেন? তাড়াতাড়ি খাও, নাহলে তোমার অনেক দেরি হয়ে যাবে স্কুলে। রাস্তায় যে জ্যাম থাকে! হঠাত মিলি বুঝতে পারল হাসিব কেন মাথা নিচু করে বসে আছে। তুমি কি গাজরের হালুয়া সবটুকু খেয়ে ফেলেছ? কখন খেয়েছ?

মাথা নিচু করেই হাসিব বলল, কালকে রাতে। ঘুমানোর আগে একটু খেলছিলাম বলটা নিয়ে, তখন হাত থেকে পড়ে আমার টেনিস বলটা গড়িয়ে এখানে চলে আসল। ড্রেসারের নিচে থেকে বলটা নিতে যেয়ে দেখি গাজরের হালুয়া।

কিছুক্ষন আগের অপরাধীভাবটা চলে গেল ওর মুখ থেকে, দুই পাটি দাঁত বের করে বলল তারপর খেয়ে ফেললাম। মিলি ওর হাসি দেখে আর রাগ করতে পারলেন না। সবটুকু খেয়ে ফেললে? একটু রাখতে পারতে? তাহলে এখন রুটি দিয়ে খেয়ে যেতে পারতে!

তোমার আর হেনার জন্যই তো বানাই। তোমার আব্বু তো মিষ্টি জিনিস খায়ই না একদম। কিন্তু তোমার আপু মন খারাপ করবে টেবিলে হালুয়া না দেখলে কারন ও কাল রাতে দেখেছে যে হালুয়া বানানো হয়েছে।

মিলি ওকে বকা দেয়নি, মনে হয় এই খুশিতেই হাসিব গপাগপ করে রুটি ডিম দিয়ে খেয়ে নিল। আপুকে সরি বলে একটা চকোলেট দিলে খুশি হয়ে যাবে। নিচে থেকে দারোয়ান জানাল যে রিকসা এসে গেছে।

হাসিবের টিফিন বক্স আগেই রেডি করে রেখেছেন মিলি। ওর স্কুল ব্যাগের ভেতর টিফিনের বাক্সটা দিয়ে ওকে বললেন খুব সাবধানে যাবে।

মিলির বেশিরভাগ সময় কাটে নামাজের পাটিতে, বাকি সময় সংসারের টুকটাক কাজ আর রান্না। সব কিছু বুয়াকে দিয়ে করালেও রান্নাটা তিনি নিজে করতে পছন্দ করেন। হেনা আরও আগেই কলেজে চলে গেছে। তাই এখন আর তার কিছু করার নেই।

হাসিব স্কুলে চলে যাওয়ার পর মিলি বুয়াকে বলে আসলেন কি কি করতে হবে। এরা প্রতিদিন একই কাজ করে তারপরও মিলিকে সব বলে দিতে হয়। এখনও রান্নার অনেক দেরী আছে, ওজু করে মিলি তসবী নিয়ে বসলেন।

স্কুলের ছুটির এখনও আধাঘন্টা বাকি আছে। দিদারকে ফোন করেছিলেন গাড়ি পাঠানো যাবে কিনা জানার জন্য কিন্তু অফিসের ফোন কেউ ধরছে না আর মোবাইল বন্ধ। কয়েকবার ফোন করেও যখন কোনও সাড়া শব্দ পাননি তখন আর উপায় না দেখে পাশের ফ্লাটের রুমানা ভাবীকে জানালেন যেন উনাদের সাথে হাসিবকে নিয়ে আসেন।

ভাবীর ছেলে সজীবও একই স্কুলে পড়ে কিন্তু ক্লাস সেভেনে, হাসিবের এক ক্লাস উপরে। প্রায় সময়ই হাসিব আর সজীব এক সাথে আসা যাওয়া করে।

খিলগাঁও বাজার থেকে শুরু করে শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি পার হয়ে দক্ষিন শাহজাহানপুর জামে মসজিদ পর্যন্ত পুরোটা পথ একদম জমে আছে রিকসা, গাড়ি, সিএনজিতে। অনেক সময় লেগে গেল রিকসাটা শাহজাহানপুর কবরস্থান পর্যন্ত আসতে।

আর একটু গেলেই সামনে ডিআইটি এভিনিউ এর মাথায় শহীদ স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত যেতে পারলেই বাকিটা হেটে যেতে পারবে। রিক্সা যখন ডিআইটি এভিনিউ এর কাছে তখন ভাড়া মিটিয়ে নেমে গেল ওরা।

কিছুদুর দ্রুত হেঁটে মতিঝিল মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের গেটের এক কোনায় বড় গাছটার নীচে এসে দাঁড়াল সাইদ আর লিটন। সাইদ কি যেন বলল নিচু স্বরে, লিটন খিকখিক করে হাসল সেই কথা শুনে।

লিটনের হাতে চিকেন বার্গার এর প্যাকেট। দুর থেকে ওরা দেখল হাসিব স্কুল ব্যাগটা হাতে নিয়ে বের হয়েছে। লিটনের দিকে তাকিয়ে মাথাটা একটু কাত করল সাইদ, তারপর হনহন করে ভীড়ের ভেতর মিশে গেল।

[চলমান..]

আলী আহসান প্রিন্স
আলী আহসান প্রিন্স

লেখক পরিচিতিঃ ইউকে প্রবাসী বাংলাদেশী; তিনি পেশায় ম্যাকলারেন রেসিং কোম্পানীতে ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট অফ বিজনেস টেকনোলোজি হিসাবে কর্মরত আছেন।
[ঢা-এফএ]

(Visited 3 times, 1 visits today)