স্ব-মজুরিতে চা শ্রমিকদের ছুটি দেয়া হোক

  •  
  •  
  •  
  •  

মোহন রবিদাস: করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের কারণে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা আজ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, বিশ্ববাসীর জীবনে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। বাংলাদেশেও এই মহামারি করোনা ভাইরাস সকল ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বিশেষজ্ঞগণ বরাবরই বলে আসছেন বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। সেজন্য এই ভাইরাস মোকাবিলায় সরকার কর্তৃক নানা উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে । তারমধ্যে অন্যতম হলো হিসেবে গত ২৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্ব-বেতনে ছুটি সাধারণ ঘোষণা করা হয়েছে ।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এই মহামারির সময়েও চা বাগানগুলো চালু রাখার জন্য সরকারিভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশে করোনা আসবে না। অন্যদিকে চা-কোম্পানি গুলোও চা বাগানের চা শ্রমিকদের স্ব-মজুরিতে ছুটি দিতে চাচ্ছে না। যেখানে ব্যাংক বাদে দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে সেখানে চা শ্রমিকদের কাজে পাঠিয়ে তাদেরকে মৃত্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হলো। অথচ এই চা বাগানগুলোই দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ (করোনা ভাইরাস) অঞ্চল।

নিম্নোক্ত কারণে চা শ্রমিকদেরই করোনায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি:

১/ একজন সাদা (তামাকপাতা ও এক জাতীয় মসলা) মললে (হাতের তালুতে রেখে প্রস্তুত করা হয়) তার কাছ থেকে নিয়ে আরো ৮-১০ জনে খায়।
২/ মদের গ্লাসগুলো ধুয়া হয় না, সাধারণত কাপড় দিয়ে মুছে দেয়।
৩/ সেকশন এলাকায় (যেখানে চা পাতা তোলা হয়) স্যানিটাইজার, সাবান তো দূরের কথা খাবার পানিই থাকে না। এক ঝর্ণার পানি ১০ জনে খায়।
৪/ লাইনগুলাতে ঘন বসতি বেশি- ঘরগুলো এক্কেবারে কাছাকাছি।
৫/ একই গাং- (ছোট নদী) এ অনেক মানুষ স্নান করে।
৬/ চা বাগানের গ্রুপ হাসপাতালগুলোর (ক্যামেলিয়া, কালিঘাট) দিকে তাকালে গায়ে জ্বর আসে। ডাক্তার-নার্সদের গায়ে পিপিই তো নাই এমনকি মাস্কের বদলে পড়ে আছে তেনা-টুকরা। আর প্রবাসীদের স্বাচ্ছন্দ্যে আনাগোনা ও চিকিৎসা নেয়া তো চলছেই।

উপরের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও তাদের কাজ করাই যেন নিয়তি। এর জন্যে অবশ্য তারা আলাদা সুযোগ সুবিধাও পাবেন না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশটা “এক দেশ দুই নীতি”তে চলছে। শুধুমাত্র বাগান মালিকদের খুশী রাখাতেই এ ধরণের একতরফা বিধি নিষেধ সরকার চালু রেখেছে।

তাতে করে আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, এদেশে সরকার মালিকদের জন্য কাজ করছে, অপরদিকে শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে রয়ে গেছে কেবলই শুভঙ্করের ফাঁকি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে চা বাগানের শ্রমিকদের করোনার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা হলেও, তাদের ছুটি বিষয়ক কোন ঘোষণা তারা দেন নি। তবুও শ্রমিকরা নিজেদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে নিজেদের উদ্যোগে অনেক বাগানে কর্মবিরতি দিয়েছিলেন।

গত ৩০ মার্চ সিলেট জেলা প্রশাসকদের সাথে মতামত বিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, চা বাগানের শ্রমিকরা দূরত্ব মেনে কাজ করে, প্রকৃতির সাথে কাজ করে বলে তাদের করোনার ঝুঁকি নেই। তাই তিনি করোনার সময়ে চা বাগানে ছুটির দরকার নেই বলে ঘোষণা দেন। আমরা মনে করি দেশে করোনার প্রাদুর্ভাবে যেখানে সারা দেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি সেখানে এসব কথা আজগুবি, ভ্রান্ত, মনগড়া ও অযৌক্তিক। আমরা চা-শ্রমিকদের পক্ষে এই কথা প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ, পাতা ওজন দেয়া, খাবার ও পানি খাওয়া, সর্দারদের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না। তাছাড়া, চা কারখানা, নার্সারি, স্প্রেয়িং সেক্টরে একত্রভাবে কাজ করতে হয় চা শ্রমিকদের।

এসব দায়িত্বহীন কথা-বার্তা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। আমরা আশংকা করছি এর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়াতে পারে। গত ৩১ মার্চ ডেইলি স্টারে একটি প্রতিবেদনে শ্রীমঙ্গলের মির্জাপুর চা বাগানে একজন নারী চা শ্রমিকের করোনার লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হবার পর আমরা সাধারণ নাগরিক সত্যিই ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। এই ঘটনা আমাদের জানায় যে, কোনভাবেই চা বাগান ঝুঁকিমুক্ত নয়।

দেশের সকল বাজার-হাট, দোকান-পাট (ফার্মেসি, মুদির দোকান বাদে) যেখানে বন্ধ সেখানে হরদম খোলা রয়েছে চা বাগান এলাকার বাজার-হাট, দোকান-পাট সবকিছু খোলা রয়েছে। এমনকি এখন পর্যন্ত বন্ধ হয় নি সরকারি লাইসেন্সধারী মদের দোকান গুলোও। সবচেয়ে আশংকার বিষয় হচ্ছে এসব বন্ধে সরকারিভাবে কোন পদক্ষেপও চোখে পড়ছে না। স্পষ্টতই চা শ্রমিকদের মহা-বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

যেখানে সারা দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে চা বাগানের মানুষ কেন করোনার ঝুঁকি মাথায় রেখে কাজ চালিয়ে যাবে? ইতোমধ্যে সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেতনসহ ১ মাসের ছুটির আদেশ দিয়েছেন। সেখানেও চা শ্রমিকরা বঞ্চিত। সকল প্রতিষ্ঠান ছুটি পেলেও, চা বাগান ছুটি না পাবার প্রতিবাদে বিভিন্ন চা বাগান শ্রমিকরা নিজেদের বাগানে কর্মবিরতি এবং মানববন্ধন করছে।

এই সমাগমের ফলে চা বাগানে করোনা সংক্রমণ হবার ঝুঁকি প্রতিদিন বাড়ছে। চা বাগানের মালিক যেখানে হোম কোয়ারেন্টাইন যাপন করছে, সেখানে বাগানের শ্রমিক কেন সেই সুবিধা পাবে না?

চা শিল্প বাংলাদেশের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৭ লক্ষ চা শ্রমিক নামমাত্র মজুরির বিনিময়ে এই চা শিল্পকে একটি মহীরুহে পরিণত করেছে। অথচ তাদের ন্যূনতম নাগরিক সুবিধার কথা ভাবা হচ্ছে না। এই করোনার দিনেও এই শ্রমিকদের জীবন নিয়ে কেউ ভাবছে না!

সর্বশেষ আজকের (৫ এপ্রিল) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও দেশের বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার কথা উঠে আসলেও চা শ্রমিকদের ব্যাপারে কোন আলোচনাই হয়নি যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক ও বেদনাদায়ক।

চা বাগানের শ্রমিকদের কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অন্য অনেকের চাইতে বেশি। আর তাই চা বাগানের শ্রমিকদেরকে বাঁচাতে এবং একজন নাগরিক হিসেবে তাদের সুবিধা এবং মর্যাদা প্রদানে চা বাগানের একজন চা-শ্রমিক সন্তান হিসেবে দাবি জানাচ্ছি যে, অবিলম্বে মজুরি এবং রেশনসহ চা বাগানগুলোতে ছুটির ঘোষণা করতে হবে।

মোহন রবিদাস
চা-শ্রমিক সন্তান
শমশেরনগর চা বাগান,
কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার
উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ

ঢা/এফএইচপি

এপ্রিল ৫, ২০২০ ৯:৩৬

(Visited 13 times, 1 visits today)