সুযোগসন্ধানী ব্যবসায় ইসলামে শাস্তির বিধান

মহান আল্লাহপাক মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। শুধু নামাজ রোজা, হজ্ব ও যাকাত আদায় করার নাম ইবাদত নয়; বরং আল্লাহ ও তার রাসূলের হুকুম অনুসারে যখন যা করা হবে তাই ইবাদত রুপে গণ্য হবে। ব্যবসা বাণিজ্য হচ্ছে হালাল উপার্জনের একটি অনন্য পন্থা।

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে মহামারী আকাড়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। এ ভাইরাস থেকে বাঁচতে বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন কিছু নীতি।

জানা যায়, কভিট-১৯ বা করোনা ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে চলা। আর সেজন্য দরকার স্যানিটাইজারসহ নানান উপকরণ।

যেমন: ভাইরাস থেকে বাঁচতে যা যা করতে হবে :

১. আক্রান্ত ব্যক্তি হতে কমপক্ষে দুই হাত দূরে থাকতে হবে।

২. বারবার প্রয়োজনমতো সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা, বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কিংবা সংক্রমণস্থলে ভ্রমণ করলে।

৩. জীবিত অথবা মৃত গৃহপালিত/বন্যপ্রাণী থেকে দূরে থাকা।

৪. ভ্রমণকারীগণ আক্রান্ত হলে কাশি শিষ্টাচার অনুশীলন করতে হবে (আক্রান্ত ব্যক্তি হতে দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়া, যেখানে-সেখানে কফ কাশি না ফেলা)।

কিন্তু সাবান, হ্যাক্সিসল, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লোভ্স এ সব সামগ্রী কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেন হিমশিম খাচ্ছে।

আর এর কারণ মূল্য বৃদ্ধি। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এসব পণ্যের দাম বাড়িয়েছে বহুগুণ।

বিভিন্ন ফলের বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা ভাইরাস ইস্যুতে এরই মাঝে বেড়ে গেছে ফলের দাম।

বাজার ঘুরে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফল ভেদে প্রতি কেজিতে খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৮০ টাকা।

আমদানিকারকরা জানান, এই মুহূর্তে চীন থেকে ফল আমদানি বন্ধ থাকায় দেশের ফল বাজারে বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

করোনা ভাইরাসের কারণে চীন থেকে আমদানিনির্ভর রসুন ও আদার দাম বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে পেঁয়াজ, গুঁড়ো দুধ, চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্য তেলসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম।

হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের নাভিশ্বাস বেড়েছে।নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার এখন অস্থির।

মানুষকে জিম্মি করে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কোনো অজুহাত পেলেই আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাজার মনিটরিং কমিটির গাফেলতিতে এই সিন্ডিকেট সুযোগ নিচ্ছে।

তবে করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের সুযোগে দাম বৃদ্ধির দায়ে বিভিন্নব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

করোনার কারণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাহত হওয়ায় দাম বেড়েছে চিকিৎসা সামগ্রি ও যন্ত্রপাতির।

পাশাপাশি সরবরাহ বিঘ্নের শঙ্কায় দাম বেড়েছে ওষুধের কাঁচামালের।

সম্প্রতি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় এটি আরো বেশি সামনে চলে এসেছে। বর্তমানে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল সরবারাহ বন্ধ রয়েছে।

ফলে গত কয়েক দিনে ওষুধের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে।

শুধু তাই নয়, করোনা ভাইরাস থেকে সতর্কতার কারণে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার শুরু করেছেন।

সেই পণ্যটি এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, দেশে ওষুধের কাঁচামাল মজুদ রয়েছে তিন-চার মাসের।

তাদের মতে, ওষুধের কাঁচামালের সবচেয়ে সস্তা উৎস হলো চীন। দেশটির বিকল্পগুলোর মধ্যে আছে ভারত, ভিয়েতনাম। এছাড়া দাম অনেক বেশি হলেও আছে ইউরোপীয় কোম্পানি।

আর এটাকে পুঁজি করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত চীনা সার্জিক্যাল জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে কাজ করছে একটি সিন্ডিকেট।

চক্রটি ডায়বেটিস মাপার কিটস ও অপারেশনে ব্যবহৃত সার্জিক্যাল আইটেমের দাম দিন দিন বাড়িয়ে বিক্রি করছে।

এছাড়া এসব জিনিস-পত্রের দাম বাড়াতে কিছু ব্যবসায়ী ইচ্ছে করেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

করোনা আতংকে চালের বাড়তি দাম এবং মজুদের প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে।

কিছু কিছু অসাধু বিক্রেতারা হঠাৎ করে কৃত্তিম দাম বৃদ্ধি করে বাড়তি মুনাফা লাভ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

করোনা ভাইরাস শুধু মানবদেহই নয়, ভয়ঙ্কর এ ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটেছে অর্থনীতিতেও।

উদ্বেগজনক হলেও সত্যি, ভয়ঙ্কর এ ভাইরাসের জেরে চীন হয়ে পড়েছে একঘরে আর তা কঠিন আঘাত হানছে বাংলাদেশের গোটা অর্থনীতিতে।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও চীনের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ। এতে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার উপক্রম তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প।

করোনার ভাইরাস চোখ রাঙাচ্ছে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারেও। আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, এতে সহসাই পণ্য সংকটের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য যেমন, ফ্রিজ, টিভি, মোবাইল, ওভেন, চার্জারসহ ইলেকট্রনিক্স পণ্যের প্রায় ৮০ ভাগই আসে চীন থেকে। কিন্তু বর্তমানে শিপমেন্ট বন্ধ।

অসুবিধা আর এ সুযোগ নিয়ে যারা সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায় করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির বিধান।

মুনাফাখোরী প্রতিরোধে ইসলামের গৃহীত পদক্ষেপ সমূহ :

ইসলাম মুনাফাখোরীকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং তা প্রতিরোধের জন্য কয়েক ধরনের কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। যথা-

১. পণ্যমূল্য জানে না এমন ক্রেতার নিকট থেকে বেশী মূল্য আদায় করা ইসলামে নিষিদ্ধ এবং এটা এক ধরনের ধোঁকার শামিল। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন,

وَمَنْ عُلِمَ مِنْهُ أَنَّهُ يَغْبِنُهُمْ فَإِنَّهُ يَسْتَحِقُّ الْعُقُوبَةَ؛ بَلْ يُمْنَعُ مِنْ الْجُلُوسِ فِي سُوقِ الْمُسْلِمِينَ حَتَّى يَلْتَزِمَ طَاعَةَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَلِلْمَغْبُونِ أَنْ يَفْسَخَ الْبَيْعَ فَيَرُدَّ السِّلْعَةَ وَيَأْخُذَ الثَّمَنَ وَإِذَا تَابَ هَذَا الْغَابِنُ الظَّالِمُ وَلَمْ يُمْكِنْهُ أَنْ يَرُدَّ إلَى الْمَظْلُومِيْنَ حُقُوقَهُمْ فَلْيَتَصَدَّقْ بِمِقْدَارِ مَا ظَلَمَهُمْ بِهِ وَغَبَنَهُمْ؛ ؛ لِتَبْرَأَ ذِمَّتُهُ بِذَلِكَ مِنْ ذَلِكَ-

‘কোন বিক্রেতা সম্পর্কে যদি জানা যায় যে, সে ক্রেতাদেরকে ধোঁকা দেয় তাহ’লে সে শাস্তির হকদার হবে।
এমনকি আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্য অবলম্বন না করা পর্যন্ত তাকে মুসলমানদের বাজারে বসা থেকে নিষেধ করা হবে।

অন্যদিকে প্রতারিত ব্যক্তি বিক্রয় ভঙ্গ করে পণ্য ফিরিয়ে দিয়ে মূল্য গ্রহণ করতে পারে। আর যদি এই অত্যাচারী প্রতারক তওবা করে এবং অত্যাচারিতদের কাছে তাদের পাওনা ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সে ক্রেতার সাথে কৃত প্রতারণা ও যুলুমের পরিমাণ মাফিক ছাদাক্বা করবে।

যাতে এর দ্বারা আল্লাহর যিম্মা (পাকড়াও) থেকে সে রেহাই পায়’।

এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা তাদের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় তথা ব্যবসার মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় ও মুনাফা লাভের বিধান প্রবর্তন করেছেন। খ্যাতনামা ফকীহ ইবনু কুদামা (রহঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন,

وَأَجْمَعَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى جَوَازِ الْبَيْعِ فِي الْجُمْلَةِ، وَالْحِكْمَةُ تَقْتَضِيهِ؛ لِأَنَّ حَاجَةَ الْإِنْسَانِ تَتَعَلَّقُ بِمَا فِي يَدِ صَاحِبِهِ، وَصَاحِبُهُ لَا يَبْذُلُهُ بِغَيْرِ عِوَضٍ، فَفِي شَرْعِ الْبَيْعِ وَتَجْوِيزِهِ شَرْعُ طَرِيقٍ إلَى وُصُولِ كُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا إلَى غَرَضِهِ، وَدَفْعِ حَاجَتِهِ–

‘সার্বিকভাবে ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সকল মুসলমান ঐক্যমত পোষণ করেছেন।

সুতরাং ক্রয়-বিক্রয় বিধিসম্মত ও জায়েয করে তাদের উভয়েরই উদ্দেশ্যে পৌঁছা ও প্রয়োজন পূরণ করার পথ প্রবর্তন করা হয়েছে’।

সাথে সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা অবলম্বন করা এবং সর্ব প্রকার ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে সুসংবাদ ও অসৎ ব্যবসায়ীদের জন্য দুঃসংবাদ।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,اَلتَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ، ‘সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী (ক্বিয়ামতের দিন) নবী, ছিদ্দীক্ব ও শহীদদের সাথে থাকবে’।

অর্থাৎ যে ব্যবসায়ী পণ্য ক্রয় করে, বিক্রয় করে এবং সত্য কথা বলে সে ক্বিয়ামতের দিন উক্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের সাথে থাকবে।

এটি বিশাল একটি মর্যাদা। যা এই পেশার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি নির্দেশ করে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন,إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّارًا إِلاَّ مَنِ اتَّقَى اللهَ وَبَرَّ وَصَدَقَ- ‘ক্বিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীরা পাপিষ্ঠ রূপে উত্থিত হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং ব্যবসায় সততা ও সত্যবাদিতা অবলম্বন করে তারা ব্যতীত’।

রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হ’ল কোন উপার্জন সর্বোত্তম? তিনি বললেন, عَمَلُ الرَّجُلِ بِيَدِهِ وَكُلُّ بَيْعٍ مَبْرُورٍ، ‘নিজ হাতে কাজ করা এবং প্রত্যেক বায়য়ে মাবরূর’।

যে ব্যবসায় মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকা ও সংশয় থাকে না তাকে ‘বায়য়ে মাবরূর’ বলে।

কাতাদা (রহঃ) বলেন, اَلتِّجَارَةُ رِزْقٌ مِنْ رِزْقِ اللهِ حَلاَلٌ مِنْ حَلاَلِ اللهِ لِمَنْ طَلَبَهَا بِصِدْقِهَا وَبِرِّهَا ‘ব্যবসা আল্লাহর রিযিকের মধ্যে একটি রিযিক এবং আল্লাহর হালালকৃত বস্ত্তগুলির মধ্যে একটি হালাল ঐ ব্যক্তির জন্য, যে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে ব্যবসা করে’।

ইসলাম ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে জাতীয় ও সামষ্টিক স্বার্থকে গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়েছে।

এজন্য যেসব কারবারের ফলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষ আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়, আর আপামর জনসাধারণের ওঠে নাভিশ্বাস, সেসব কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

অত্যধিক মুনাফা লাভের প্রত্যাশায় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী মজুদ করে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার পদতলে তাদেরকে পিষ্ট করা এবং খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য পণ্যে ভেজাল প্রদান করে মুনাফা লুটে নেয়া তেমনি নিষিদ্ধ কারবার।

উপরন্তু এগুলো অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভক্ষণ করার শামিল। আর আল্লাহ রববুল আলামীন কুরআন মাজীদে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভক্ষণ করার বিরুদ্ধে বজ্রনির্ঘোষ বাণী উচ্চারণ করে হুঁশিয়ারী প্রদান করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا

‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ব্যতীত। আর তোমরা একে অপরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল’ (নিসা ৪/২৯)।

সাইয়িদ কুতুব (রহঃ) বলেন,

وأكل الأموال بالباطل يشمل كل طريقة لتداول الأموال بينهم لم يأذن بها الله، أو نهى عنها، ومنها الغش والرشوة والقمار واحةكار الضرورياة لإغلائها، وجميع أنواع البيوع المحرمة-

‘মুমিনদের মধ্যে সম্পদ আবর্তনের প্রত্যেক পদ্ধতি যার অনুমতি আল্লাহ দেননি বা তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন তার সবই অন্যায়ভাবে অন্যের মাল ভক্ষণ করার মধ্যে শামিল রয়েছে।

যেমন- প্রতারণা, ঘুষ, জুয়া, মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করা এবং সকল প্রকার অবৈধ ক্রয়-বিক্রয়’।

ইসলামের দৃষ্টিতে মুনাফাখোরী :

মহান আল্লাহ বলেন, وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন ও সূদকে হারাম করেছেন’ (বাক্বারাহ ২/২৭৫)।

ব্যবসার লক্ষ্য হ’ল সম্পদের প্রবৃদ্ধি ঘটানো বা মুনাফা লাভ করা। ব্যবসার মাধ্যমে মূলধনের মুনাফা লাভ ইসলামে সম্পূর্ণ জায়েয।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ব্যতীত…’ (নিসা ৪/২৯)।

অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন,لا تتعاطوا الأسباب المحرمة فى اكتساب الأموال، ولكن المتاجر المشروعة التى تكون عن تراض من البائع والمشترى فافعلوها وتسببوا بها فى تحصيل الأموال- ‘ধন-সম্পদ উপার্জনে তোমরা অবৈধ পন্থা সমূহ অবলম্বন করো না। তবে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতিতে বৈধ ব্যবসা করো এবং এর মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করো’।

মানুষ ব্যবসার মাধ্যমে হালাল উপায়ে যে মুনাফা বা লাভ অর্জন করে, কুরআন মাজীদে তাকে ‘আল্লাহর অনুগ্রহ’ (فضل الله) বলা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন,فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللهِ، ‘তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর’ (জুমু‘আহ ৬২/১০)।

অন্যত্র তিনি বলেন, وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُوْنَ مِنْ فَضْلِ اللهِ ‘কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশ-বিদেশ ভ্রমণে বের হবে’ (মুয্যাম্মিল ৭৩/২০)।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় হালাল-হারাম বাছ-বিচার না করে যেকোন উপায়ে মুনাফা অর্জনের অবাধ সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু ইসলামী অর্থনীতিতে অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত মুনাফা অবৈধ বা হারাম। কারণ তা শোষণের হাতিয়ার।

ইসলামী শরী‘আতে মুনাফা বা লাভের কোন পরিমাণ নির্ধারিত নেই। বরং তা সাধারণ বাজারদরের উপর নির্ভরশীল।

মূলতঃ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় হল- যুলুম না থাকা।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেনاِتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ‘তোমরা যুলুম থেকে বেঁচে থাক। কেননা যুলুম ক্বিয়ামতের দিন ঘন অন্ধকার হয়ে দেখা দিবে’।

ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতি (নিসা ৪/২৯)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাইতো বলেছেন, إِنَّمَا الْبَيْعُ عَنْ تَرَاضٍ ‘ক্রয়-বিক্রয় কেবল পারস্পরিক সম্মতিতে অনুষ্ঠিত হয়’

উরওয়া বিন আবিল জা‘দ আল-বারেকী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَرَضَ لِلنَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم جَلَبٌ فَأَعْطَانِى دِيْنَاراً وَقَالَ أَىْ عُرْوَةُ ائْتِ الْجَلَبَ فَاشْتَرِ لَنَا شَاةً. فَأَتَيْتُ الْجَلَبَ فَسَاوَمْتُ صَاحِبَهُ فَاشْتَرَيْتُ مِنْهُ شَاتَيْنِ بِدِيْنَارٍ فَجِئْتُ أَسُوْقُهُمَا أَوْ قَالَ أَقُوْدُهُمَا فَلَقِيَنِىْ رَجُلٌ فَسَاوَمَنِىْ فَأَبِيْعُهُ شَاةً بِدِيْنَارٍ فَجِئْتُ بِالدِّيْنَارِ وَجِئْتُ بِالشَّاةِ فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذَا دِيْنَارُكُمْ وَهَذِهِ شَاتُكُمْ. قَالَ وَصَنَعْتَ كَيْفَ. قَالَ فَحَدَّثْتُهُ الْحَدِيْثَ فَقَالَ اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُ فِىْ صَفْقَةِ يَمِيْنِهِ-

‘নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট পশুর একটি চালানের সংবাদ আসল। তিনি আমাকে একটি দীনার দিয়ে বললেন, উরওয়া! তুমি চালানটির নিকট যাও এবং আমাদের জন্য একটি বকরী ক্রয় করে নিয়ে আস।

তখন আমি চালানটির কাছে গেলাম এবং চালানের মালিকের সাথে দরদাম করে এক দীনার দিয়ে দুইটি বকরী ক্রয় করলাম।

বকরী দু’টি নিয়ে আসার পথে এক লোকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হ’ল। লোকটি বকরী ক্রয় করার জন্য আমার সাথে দরদাম করল।

তখন আমি তার নিকট এক দীনারের বিনিময়ে একটি বকরী বিক্রয় করলাম এবং একটি বকরী ও এক দীনার নিয়ে চলে এলাম।

এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এই হচ্ছে আপনার দীনার এবং এই হচ্ছে আপনার বকরী। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, এটা তুমি কিভাবে করলে? উরওয়া (রাঃ) বলেন, আমি তখন তাঁকে ঘটনাটি বললাম।

তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হে আল্লাহ! আপনি তার হাতের লেন-দেনে বরকত দিন’।

উক্ত হাদীছ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, বৈধভাবে শতভাগ লাভ করলেও তাতে কোন সমস্যা নেই।

সঊদী আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের এক ফৎওয়ায় বলা হয়েছে, ليست الأرباح في التجارة محدودة، بل تتبع أحوال العرض والطلب، كثرة وقلة، لكن يستحسن للمسلم تاجراً أو غيره أن يكون سهلاً سمحاً في بيعه وشرائه، وألا ينتهز فرصة غفلة صاحبه، فيغبنه في البيع أو الشراء، بل يراعي حقوق الأُخوّة الإسلامية،

‘ব্যবসায়ে লাভ বা মুনাফা নির্ধারিত নেই। বরং সরবরাহ ও চাহিদার অবস্থা অনুপাতে মুনাফা কম বা বেশী হতে পারে। কিন্তু মুসলিম ব্যক্তি ব্যবসায়ী হৌক বা অন্য কেউ হোক তার জন্য উত্তম হল, ক্রয়-বিক্রয়ে সরল ও উদার হওয়া এবং ক্রেতার সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ক্রয়-বিক্রয়ে ধোঁকা না দেয়া। বরং সে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অধিকার সমূহের প্রতি খেয়াল রাখবে’।

সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ) এক ফৎওয়ায় বলেন,

ليس للربح حد محدود، بل يجوز الربح الكثير والقليل إلا إذا كانت السلع موجودة في السوق بأسعار محددة معلومة فليس له أن يغر الناس، بل عليه أن يخبر الناس يقول هذه السلعة موجود بأسعار كذا وكذا.. لكن سلعتي أنا هذه ما أبيعها بالسعر هذا، فإذا أحب أن يشتريها بزيادة فلا بأس، لكن يرشد الناس إلى الأسعار الموجودة، أما إذا كانت الأسعار غير موجودة ولا محددة فله يبيع بما أراد من الثمن-

‘লাভ বা মুনাফার কোন পরিমাণ নির্ধারিত নেই। বরং বেশী ও কম লাভ করা জায়েয। তবে বাজারে পণ্য যদি নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট মূল্যে মওজুদ থাকে তাহলে বিক্রেতার জন্য মানুষকে ধোঁকা দেয়া ঠিক নয়।

বরং তার কর্তব্য হল মানুষকে জানিয়ে দেয়া যে, এই দ্রব্যটি এত মূল্যে (বাজারে) মওজুদ আছে। কিন্তু আমি এই মূল্যে আমার এই পণ্যটি বিক্রি করব না।

এক্ষণে ক্রেতা যদি বেশী মূল্যে তা ক্রয় করতে পসন্দ করে তাতে কোন দোষ নেই। তবে বিক্রেতা বাজার দাম সম্পর্কে মানুষকে অবগত করবে। আর মূল্য যদি নির্ধারিত না থাকে তাহলে সে যেকোন মূল্যে বিক্রি করতে পারে’।

ইসলাম সূদের মাধ্যমে মুনাফা লাভের পন্থাকে হারাম ঘোষণা করেছে। তার পরিমাণ কম বা বেশী যাই হোক।

মহান আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِيْنَ، ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের পাওনা যা বাকী রয়েছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা সত্যিকারের মুমিন হয়ে থাক’ (বাক্বারাহ ২/২৭৮)।

আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) বলেন,إِنَّ الرِّبَا وَإِنْ كَثُرَ فَإِنَّ عَاقِبَتَهُ تَصِيْرُ إِلَى قُلٍّ، ‘সূদের দ্বারা সম্পদ যতই বৃদ্ধি পাক না কেন তার শেষ পরিণতি হ’ল নিঃস্বতা’।

ক্রেতাদেরকে ধোঁকা দিয়ে মুনাফা অর্জনের এ উপায়কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কঠোরভাবে নিষেধ করে বলেন, لاَ تَنَاجَشُوا ‘তোমরা দালালী করো না’।

ইবনু কুদামা (রহঃ) বলেন,ولأن فى ذلك تغريرا بالمشترى، وخديعة له، ‘এ ধরনের বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হ’ল, এটি ক্রেতার সাথে প্রতারণা করা ও তাকে ধোঁকা দেয়ার শামিল’।

আর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, اَلْخَدِيعَةُ فِى النَّارِ ‘প্রতারণার ঠিকানা জাহান্নাম’।

আতঙ্কিত হয়ে যারা পন্য মজুদ করে রাখছে আর সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ইসলামে মজুদদারীকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যাতে মুনাফাখোরির কোন সুযোগ না থাকে। কারণ মুজদদারির উদ্দেশ্যই হচ্ছে অত্যধিক মুনাফা অর্জন।

নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَنِ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ ‘যে পণ্য মজুদ করে, সে পাপী’।

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন,هذا الحديث صريح فى تحريم الاحتكار ‘মজুদদারী নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে এ হাদীছটি দ্ব্যর্থহীন’।

উল্লেখ্য যে, সাধারণভাবে পণ্য মজুদ করা দোষের নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজের পরিবারের জন্য এক বছরের খাদ্য মজুদ রেখেছেন।

তবে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফাখোরির উদ্দেশ্যে মজুদ করলে অবশ্যই তা অপরাধ হবে।

মুনাফাখোরী সমাজ ও জনকল্যাণ বিরোধী ঘৃণ্য পুঁজিবাদী মানসিকতা। অত্যধিক মুনাফা অর্জনের নেশায় বুঁদ হয়ে ব্যবসায়ীরা পণ্য-দ্রব্য মজুদ করে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে।

এমনকি অনেক সময় শত শত মণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য (গম, আলু প্রভৃতি) গুদামে রেখে পচিয়ে ফেলা হয়। তবুও চড়া মূল্যের আশায় বাজারজাত করা হয় না।

আবার কখনো কখনো মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য আমদানীকৃত চাল/গম সমুদ্রে নিক্ষেপ করে।

এতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যাতাকলে সাধারণ মানুষ পিষ্ট হয়। দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে তাদের ওঠে নাভিশ্বাস।

কিন্তু সেদিকে মুনাফাখোররা দৃষ্টিপাত করে না। ইসলাম এ ধরনের মুনাফাখোরী মনোভাবকে ধিক্কার দিয়েছে।

তবে ইসলামে হালাল উপায়ে ব্যবসার মাধ্যমে মুনাফা অর্জনে কোন বাধা নেই। বরং তা বৈধ। কিন্তু অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত মুনাফা অবৈধ বা হারাম।

লেখক: তাহমিনা শারমিন, সাংবাদিক, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর
তথ্যসূত্র: ইসলামিক তথ্যসাইট, ধর্মগ্রন্থ, হাদিসের উদ্ধৃতি, ইন্টারনেট

ঢা/তাশা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )