সিডনিতে কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন

শফিকুল আলম: কথা সাহিত্যিক বা কথা শিল্পী ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন রয়েছেন সিডনিতে। তিনি এসেছেন একুশ একাডেমির আমন্ত্রণে। আয়োজকগন তাঁকে নিয়ে আজ ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যা ০৭:৩০ টায় হার্স্টভিল সিভিক সেন্টারে তাঁর বিখ্যাত ‘উপন্যাস গায়ত্রী সন্ধ্যা’ এই শিরোনামে সাহিত্যানুরাগীদের জন্য একটি উপভোগ্য সন্ধ্যার আয়োজন করেছেন।

তাঁর মতো গুনিজনের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ আমরা গ্রহন করতে পারি। কালের চিত্রায়ন সেলিনা হোসেনের প্রিয় বিষয়। ‘জল্লোচ্ছ্বাস’ (১৯৭২), ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬), ‘মগ্ন চৈতন্যে শিস’ (১৯৭৯), ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮১), ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ (১৯৮৩), ‘পদশব্দ’ (১৯৮৩), ‘চাঁদবেনে’ (১৯৮৬), ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ (১৯৮৭), ‘ক্ষরণ’ (১৯৯৮), ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ (১৯৮৩), ‘খুন ও ভালোবাসা’ (১৯৯০), ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ (১৯৯২), ‘ভালবাসা প্রীতিলতা’ (১৯৯২), ‘টানাপোড়েন’ (১৯৯৪), ‘দ্বীপান্বিতা’ (১৯৯৭) এবং ‘যুদ্ধ’ (১৯৯৮) সর্বত্রই সেলিনা হোসেন নিমগ্ন কাল-চিত্রণে।

কখনও প্রেম বা সামাজিক দ্বন্দ্ব বা অন্য উপাদান প্রাধান্য পেলেও পাঠক সহজেই ঋদ্ধ হন তাঁর কাল-সচেতনতায় যা বর্তমান সাহিত্যে মাঝে মাঝে দুর্লভ হয়ে উঠতে চায়। সহজাত সে ক্ষমতাকে আশ্রয় করেই সেলিনা হোসেন নির্মাণে সিদ্ধান্ত নেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত পরিধিকে। সে সময়ের শুরুটি কাকতালীয়ভাবে তাঁর নিজের জন্মবছরও বটে। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে দীর্ঘ দশবছর নিরবিচ্ছিন্ন মগ্নতার ফলস্বরুপ আমরা বাঙালি পাঠক পেয়েছি দীর্ঘ প্রায় আটশত ত্রিশ পৃষ্ঠার ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’র তিনটি খণ্ড।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উপন্যাস অর্থই যেন ৬/৭ র্ফমার একটি গল্পতে বদ্ধগ্রন্থ। কারো কারো সৃজনশীল প্রয়াস সে আয়তন দ্বিগুণের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু দু’শো/আড়াইশো কিছুতেই অতিক্রম্য নয় যেন। না, শারীরিক আয়তনকে বড় করে না দেখেও এ আলোচনা চলতে পারে। যোশেফ কনরাডের Heart of Darkness, জেমস জয়েসের The Portrait of an Artist as a Young Man, অথবা আর্নেস্ট হোমিংয়ের The Old Man and the Sea উপন্যাসের আয়তন স্বল্পতা অজানা নয় কারো। কিন্তু তাই বলে মার্সেল প্রুস্তের Remembrance of Things Past, লিও তলস্তোয়ের War and Peace, বা Anna Karenina যে তাদের আয়তন প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ তা ভুলে যাওয়া চলে না।

সবসময়ই আয়তন প্রশ্নে রিজিয়া রহমান বিশেষ উল্লেখের দাবিদার, আর সেলিনা হোসেনের ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ সে মাত্রায় নতুন সংযোজন। গায়ত্রী সন্ধ্যা’র যখন শুরু তখন ভারত স্বাধীন হচ্ছে। সেই উত্তাল সময়ে দেশান্তরী হওয়ার সময় ট্রেনে জন্ম নিচ্ছে উপন্যাসের একটি অন্যতম চরিত্র প্রতীক।

ট্রেনে সে-সময় এক বিশাল সংখ্যার উদ্ধাস্ত জনসমষ্টির সাথে রয়েছে প্রতীকের বাবা আলী আহমদ, মা পুস্পিতা এবং বড়ভাই ছয় বছরের প্রদীপ্ত। তারপর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা এবং গণঅভ্যুত্থান। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী যখন সাধারণ মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে তখন প্রদীপ্ত’র স্ত্রীর সন্তান পৃথিবীর বাতাস নিতে আসছে। আর পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্ট যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন তখন প্রদীপ্ত’র সন্তান নেয় নতুনতর নাম অজেয় মৃত্যুঞ্জয় মুজিব। এই যে সংক্ষিপ্ত কাহিনী-কথা তা কিন্তু গায়ত্রী সন্ধ্যাতে অনেক গভীরে প্রোথিত, বহুধা এর শাখাপ্রশাখা।

আর চরিত্র? কয়েকশ মানুষ এ কাহিনীতে অংশগ্রহণ করেছে এবং অপসৃত হয়েছে। কিন্তু বারবার ফিরে এসেছে যারা কাহিনীর স্তম্ভে, তাদের আশ্রয় করেই নির্মিতি পেয়েছে বাঙালি জাতিসত্ত্বার নির্মাণ ইতিহাস, তার সাতাশ বছর। প্রধান কলাকুশলীদের তালিকাটিও প্রসারিত হয়েছে। আলী আহমদ, পুষ্পিতা, প্রদীপ্ত, প্রতীকের সাথে যুক্ত হয়েছে মঞ্জুলিকা ও বন্যা – প্রদীপ্ত ও প্রতীকের দুই প্রেমাস্পদ। স্বীকার করতেই হবে ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’তে সেলিনা হোসেন সাতচল্লিশ থেকে পঁচাত্তর কালপরিধির সকল রাজনৈতিক অভিঘাতকে শব্দরূপ দিয়েছেন।

সাতচল্লিশোত্তর বাংলায় একের পর এক আমরা কী দেখেছি? ভাঙার প্রশ্নে পাকিস্তানিদের অনড় মানসিকতা, নাচোল বিদ্রোহ, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, এগারো দফা, গণআন্দোলন, নকশাল আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এখানেই শেষ নয়, লক্ষ শহীদের রক্ত দিয়ে কেনা মুক্তিযুদ্ধও যেন দেশকে দিতে পারেনি একটি সুস্থ প্রতিবেশ।

প্রকাশ ঘটে জাসদের, অস্ত্রের ঝনঝনানি ধ্বনিত হয় সর্বত্র, উত্তরাঞ্চলে প্রসস্ত মুখগহ্বর নিয়ে এগিয়ে আসে দুর্ভিক্ষ এবং চুড়ান্ত ঘটে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিহত হন। এবং ১৫ আগস্টের ঘটনার ভেতর দিয়েই শেষ হয় সেলিনা হোসেনের কাল পরিক্রমা। গায়ত্রী সন্ধ্যা’র বৈশিষ্ট্য এখানেই যে এর চরিত্ররা রাজনৈতিক ডামাডোলের বাইরে কেউ নয়।

সামগ্রিকভাবেই তারা ঐ সকল ঘটনার অংশীদার। কখনও কখনও সম্পৃক্ততার প্রশ্নটিকে স্বাভাবিক করার জন্য সেখানে অনুপ্রবেশ ঘটেছে নতুন চরিত্রের যারা ভিন্ন প্রশ্ন মাথায় রেখে যুক্ত আলী আহমদ ও তাঁর পরিবারের সাথে। গায়ত্রী সন্ধ্যা’র আর একটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি হলো ইতিহাসের মানুষেরা এখানে বড় জীবন্তভাবে কথা বলেন।

ইলা মিত্র, সোমেন চন্দ্র বা শহীদ সাবের নিজেই যখন প্রবেশ করে ফেলেন উপন্যাসের কাহিনীতে তখন আমাদের অনেক দ্বিধা অপসৃত হয়। সত্য অনেক বেশি উজ্জ¦ল হয়ে ওঠে। শেখ মুজিব যখন সাতই মার্চের ভাষণ শুরু করেন তখন ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’র কাহিনী যেন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে সহজেই। বাকী কথা আমরা ঔপন্যাসিকের নিজের মুখে শুনবো। সবার উপস্থিতি কামনা করছি।

ঢা/এসএ/মমি

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )