সময়ের পরিক্রমায় সাংবাদিকতা! 

  •  
  •  
  •  
  •  

সাংবাদিকতা পেশাটি আসলে অন্য পেশার চেয়ে আলাদা। এ পেশায় বিশেষ করে রিপোর্টিং এ থেকে অনুভব করেছি সকালে অন্যসব পেশাজীবী সকলেই যে যার অফিসে যান।

অথচ একজন রিপোর্টার অন্য পেশার মতো তাঁর অফিসে না গিয়ে অন্যের অফিসের দিকে ছোটেন। দিন শেষে পেশাজীবীরা যখন বাসার দিকে রওনা হন তখন একজন রিপোর্টার ছুটে চলতে থাকেন তার অফিস পানে।

রাত যখন গভীর হয় সবাই ঘুমিয়ে পড়েন তখন বাসায় ফিরেন এ পেশার মানুষ। অন্য অনেকেই বুঝতে চান না কেন এমনটি হয়।

যে কারণে অনেক বাড়ীর মালিক সাংবাদিকদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে চান না। আবার অন্য পেশাজীবীরা যেমন মাস শেষেই নির্দিষ্ট তারিখেই বেতন পেয়ে যান।

কিন্তু সাংবাদিকদের বেলায় (দুই একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া) কবে বেতন হবে জানেন না প্রধানতম ব্যক্তিসহ প্রায় সকলেই। পেশা হিসেবে সাংবাদিকরা সব কিছুেই থাকেন চরম ঝু্ঁকিতে।

যে কারণে অনেক অভিভাবক একজন সাংবাদিকের কাছে বিয়ে দিতে চান না। আবার অনেক সিনিয়র সাংবাদিকগণকে বলতে শুনেছি গ্রামে বা আত্মীয়দের সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করেন বাবা সাংবাদিকতার পাশাপাশি কি করছো?

অনেক সম্পাদক মহোদয়রাও তাদের আত্মীয়ের কাছে এমন বিড়াম্বনাপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন বলে তাদের মুখ থেকেই শোনা। তবে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন আসছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড একটি গুরুত্বপপূর্ণ বিষয়। ওয়েজ বোর্ডে যে সব বিষয়গুলো আছে তা কয়টা গণমাধ্যম মানে? পুরো গণমাধ্যম সেক্টরে হাতে গোনা দুই/একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউই ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করে না বল্লেই চলে।

এর মধ্যে অনেক গণমাধ্যমের মালিক পক্ষ সাংবাদকদের তাদের কৃতদাস হিসেবে মনে করেন। কথায় কথায় চাকরি খেয়ে ফেলেন।

অনেক মালিক আবার তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে একটা গণমাধ্যম খুলে বসেন। সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সাথে লিয়াজো রাখতেও গণমাধ্যম মালিকরা সাংবাদিকদের ব্যবহার করেন।

সাংবাদিকদের অনেকে আবার ব্যবহৃত হতেও ভালবাসেন। তবে এটাও সত্যি অনেক গণমাধ্যম কর্মীও মালিকদের চাটুকারিতা করেই ভাল থাকেন। পেশা দরিত্বের চেয়ে মালিকের তোশামদি ও তাদের ব্যক্তিগত কর্মীর কাজ করাটাকে সম্মানের মনে করেন।

অনেক গণমাধ্যম মালিক ও মালিকের তোশামদি সাংবাদিক আছেন তারা নিজেকে সাংবাদিকদের প্রভু মনে করেন। তারা নির্ধারণ করে দেন কবে কখন কাকে হেয় করতে হবে।

কালো টাকার মালিক ও ভূঁইফোড় অনেক মালিক একটা গণমাধ্যম খুলে নিজেকে জাহির করতে শুরু করেন। অনেক সাংবাদিক নিজেও জানেন না তার করণীয়। মাঝে মাঝে সাংবাদিক সম্মেলনে তেল দেয়া ও তীর্যকপূর্ণ কথা শুনে আহত হতে হয়।

সেখানে থাকে না সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের ছাপ। আজকাল অনেককে দেখা যায় নাম সর্বস্ব গণমাধ্যম খুলে বসে চাঁদাবাজি করতে। ভোর থেকে রাত অবাধি তাদের কাজ সমাজের নানা জায়গায় যেয়ে জাহির করা ও সাংবাদিকতা ফলানো।

আজকাল এমনও দেখা যায় বাসার বেডরুমে যেয়েও সাংবাদিকতা জাহির করতে। একজন সাংবাদিক তাঁর আগে জানা উচিত করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো।

অনেক গণমাধ্যম মালিককে বলতে শোনা যায় আমি সাংবাদিক পালন করি। সাংবাদ মাধ্যমে ভর্তুকী দিয়ে চালাই। আরে ভাই আপনাকে এমন ভর্তুকী দিতে বলেছে কে?

এসব মালিকের অনেকেরই কালো টাকা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। অনেক গনমাধ্যম মালিক আবার মন্ত্রীত্ব আর এমপিত্ব টিকিয়ে রাখতে এটিকে ব্যবহার করেন।

আজকাল দেখা যায় ওমুক গ্রুপের টেলিভিশন বা পত্রিকা। সামাজিক দাবদ্ধতার জায়গা থেকে কয়জন মালিক গণমাধ্যমকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছেন?

তবে আশার কথা বাংলাদের প্রায় সব পালিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যলয়গুলোতে সাংবাদকতা বিভাগ খোলা হয়েছে। এ বিভাগ থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা এ সেক্টরে আসলে বাড়বে এ পেশার মর্যাদা।

পেশা হিসেবেও আরো সমৃদ্ধ হবে। তবে এ কথাও সত্য সাংবাদিকতা একটা প্যাসন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে ভাল সাংবাদিক হওয়া য়ায় না।

দেশের অনেক ভাল সাংবাদিক আছেন যাদের প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তারপরেও প্যাসন নিয়ে অনেক উচু মানের সাংবাদিক হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত।

ঢাবি’র গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা থেকে পাশ করা সাবেক অনেক শিক্ষার্থী এখন গণমাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অনেকেই আছেন যারা দীর্ঘদিন রিপোর্টিং করে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যুক্ত হয়েছেন।

এমনকি অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় এ থেকেও গণমাধ্যমে কাজ করছেন। এসব কারণে ব্যবহারিক ও প্রয়োগিক বিষয়েও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমন্ডীগণও সমৃদ্ধ হতে পারছেন।

বাস্তব বিষয় সম্পর্কে অবগত হতে পারছেন। একটা সময় প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপর নির্ভর ছিলো এই বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। তবে দিন বদলেছে। বদলেছে শিক্ষা ব্যবস্থা।

মনে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তির পর তৎকালীন সময়ে আমাদের শ্রেণী শিক্ষক ও পরবর্তীতে ঢাবি’র ভাইস চ্যান্সেলর জনাব অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মহোদয় প্রথম দিনের ক্লাসে বলেছিলেন, যার নেই কোন দিক সে হয় সাংবাদিক।

এর সাথে আরো যোগ করে বলেছিলেন যার নেই কোন গতি সে করে উকালতি। ক্লাসের সবাই হেসে উঠলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে শুরু করলেন দিন এখন বদলেছে।

সাংবাদিকতা অন্য অনেকগুলো পেশার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি জনসংযোগেও ছিলো না কোন ধরনের পেশাদারিত্ব।

লোয়ার ডিপার্টমেন্ট এসিসট্যান্ট (এলডিএ) দিয়েই এক সময় এ বিভাগ/শাখার কাজ চালিয়ে নেয়া হতো। তবে দিন বদলেছে। এসব জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা থেকে স্নাতক ও স্নাতকত্তোর ডিগ্রী নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

স্পেশালাইজড করা হয়েছে এ সক্টরকে। অনেক মাল্টি ন্যাশনাল/ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সময়ের প্রয়োজনে ব্র্যান্ডিং ও জনসংযোগ নামে স্বতন্ত্র বিভাগ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ করছে। প্রাইভেট ও গভার্মেন্ট সেক্টরে এখন জনসংযোগ বিভাগ গুরুত্ব বহন করে চলেছে।

সময়ের চাহিদা বিশ্বব্যাংক, দাতা সংস্থা ও দেশীয় চাহিদার আলোকে এ পেশাতে পেশাদারিত্বের ছাপ লেগেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও পেশা দারিত্ব আসছে এ সেক্টরে। তখন এতো বিশাল জনবল হয়তো ছিলো না।

তবে পেশাদারিত্ব যে এ পেশায় আসছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের ক্লাসমেটদের বেশির ভাগই গণমাধ্যমে ভাল অবস্থান করে নিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকে বিশেষ প্রতিনিধি, বার্তা সম্পাদক, প্রধান বার্তা সম্পাদক রয়েছেন।

বর্তমান সময়ে টিভি চ্যানেল, ওয়েব ভিত্তিক নিউজ পোট্রাল/সংবাদপত্র ও ছাপানো সংবাদপত্র/প্রিন্ট মিডিয়া’সহ কয়েক হাজার গণমাধ্যম রয়েছে।

তবে দেশের সব গণমাধ্যমে যে পেশা দারিত্বের ছাপ আছে তা নয়। মূল ধারার কয়েকটি গণমাধ্যম ছাড়া বাকী সবগুলো চলে, চলতে হয় তাই। তবে সেল ও টেল এটি আগামী দিনে আরো সম্ভাবনা তৈরী করবে।

সাংবাদিকতা আসলে পেশার চেয়ে নেশাটাই বেশি। অনেকে এ নেশার ঘোরে জীবন পার করছেন সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে। তবে এ কথা সত্যি যে সাংবাদিকতায় রিপোর্টার এর বয়স বেশি হলে তখন তার জোর কমে আসে ও পেশাতে টিকতে পারেন না।

আবার বয়সের সাথে সাথে অনেকেই সম্পাদকীয়তে কাজ শুরু করেন। তখন সম্পাদকীয় বিভাগটিও সমৃদ্ধ হয়। অনেক সহ সম্পাদকই রিপোর্টারের সমস্যাগুলো বুঝতে চান না।

তারা যে মাঠে ময়দানে কতোটা পরিশ্রম করেন। প্রতিদিন যে বাইরে কতটা পরিশ্রম করেন। আজকের সময় সত্যিই ভাল লাগে যখন একজন রিপোর্টার থেকে সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পর্যায়ের পদ সম্পাদক হচ্ছেন।

আশার কথা সাংবাদিকতায় এখন অনেক অনেক আধুনিক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। (চলবে)

বিল্লাল বিন কাশেম,
কবি, গল্পকার ও সাবেক কূটনীতিক প্রতিবেদক।

ঢা/তাশা

মার্চ ১৯, ২০২০ ৫:২৫

(Visited 62 times, 1 visits today)