সত্য যতো কঠিন হোক সেটা বলুন

সত্য যতো কঠিন হোক
  •  
  •  
  •  
  •  

মোঃ শফিকুল আলম: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নি:সন্দেহে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সবচাইতে নৃশংস ঘটনা।

এই হামলা মূলত: একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে প্রতিপক্ষকে নি:শেষ করে দেয়ার পরিকল্পনা থেকে করা। এ নিয়ে বহু জ্ঞানী-গুনীজন অনেক জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ করেছেন এবং করছেন।

এ বিষয়ে আমি কোনো বিশ্লেষণে যাচ্ছিনা। আমার বিশ্লেষণ অন্যত্র। সেদিন জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা বেগম জিয়া কি বলেছিলেন? যা’ বলেছিলেন তা’ কি আইনের দৃষ্টিতে সিদ্ধ ছিলো?

তিনি বলেছিলেন সেই জনসভায় বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড বহন করে নিয়ে এসে তাঁর সমর্থক নেতা-কর্মীদেরকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঐ গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছিলেন? সরকার দলীয় সকল মন্ত্রী, সাংসদ, উকিল, ব্যারিস্টার হাততালি দিয়ে, বগল বাজিয়ে বেগম জিয়াকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

বড় বড় ব্যারিস্টার, অভিজ্ঞ রাজনীতিক একবারও তাঁকে বলেননি যে দেশের প্রধানমন্ত্রী আইন বিরোধী কোনো কথা সংসদে বা সংসদের বাইরে বলতে পারেননা। বেগম জিয়া নিশ্চয়ই দেখেননি কে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছিলো।

তাছাড়া দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, হত্যাকান্ড ইত্যাদি উদঘাটনের দায়িত্ব হচ্ছে পুলিশ বিভাগের এবং অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। সাংসদগন আইন প্রনয়ন করতে পারেন; কিন্তু আইন প্রয়োগ করতে পারেননা।

তাঁরা কে অপরাধ সংঘটন করেছে বা করেনি তা’ বলারও অধিকার রাখেননা। কারন, একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন সবার আগে বলে দিলেন যে বিরোধী দলীয় নেতা গ্রেনেড হামলা করে ২৪ জন মানুষ খুন করেছেন।

তখন এই স্টেটমেন্টের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করার ক্ষমতা দেশের কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির থাকেনা। তা’হলে পুলিশ বিভাগের আর করনীয় কি থাকতে পারে? প্রধানমন্ত্রী যা’ বলেছেন সে অনুযায়ী অভিযোগপত্র তৈরী করা। যা’ হবার তাই হয়েছিলো।

পুলিশ বাধ্য হয়ে জজ মিয়া নাটক তৈরী করেছিলো। মন্ত্রী-সাংসদগন বেগম জিয়ার সেই ভাষনের চর্বিত চর্বণ করেছিলেন ক্ষমতার পুরোটা সময়।

দীর্ঘ সময় পর সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দু’জন নাগরিকের ফোন কথপোকথনের টেপ বাজিয়ে বলে দিলেন সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বাসে আগুন দিয়েছে বিএনপি নেতা-কর্মীরা। ধরে নিলাম শতভাগ সত্য।

কিন্তু এই কাজটি কি প্রধানমন্ত্রী’র? একই চিত্র দেখা গেলো। মন্ত্রী, সাংসদ, বড় বড় উকিল, ব্যারিস্টার বগল বাজিয়ে আইন বিরোধী কাজটিকে সমর্থন যোগালেন। দেশের নাগরিকদের ফোন-কথপোকথন কি তাদের অজান্তে রেকর্ড করা আইন সংগত? কখন করা যায়?

কে করতে পারে? কোথায় বাজিয়ে শোনানো যায়? কনফিডেনশিয়াল এ্যাক্ট অনুযায়ী কোনো নাগরিকের ফোন কলভার্সেসন রেকর্ড করা যায়না। যদি দেশবিরোধী কথপোকথন হচ্ছে এমন নির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে থাকে তখন পুলিশ বিভাগ গোপনে বিশেষ আদালতের অনুমতি নিবেন এবং আদালতের প্রয়োজনে এবং অনুমতি সাপেক্ষে এভিডেন্স হিসেবে সেই রেকর্ড শুধুমাত্র আদালতকে শোনানো যাবে।

অন্য কোথাও ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো যাবেনা। কনফিডেন্সিয়াল এ্যাক্ট দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন চলাচলের, কথপোকথনের স্বাধীনতা এভাবেই সুনিশ্চিত করেছে।

আইনের লংঘন যখন দেশের সরকার প্রধান করেন তখন একটি দেশের পুলিশ এবং বিচার বিভাগের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। গত পঁন্চাশ বছর গবুচন্দ্র মন্ত্রীদের কাজ একটিই ছিলো। আর তা’ হচ্ছে বগল বাজানো এবং প্রধানমন্ত্রী যা’ বলেন তাতেই ‘আহা বেশ বেশ!’ বলা।

মওদুদ সাহেবরা যেমন বলেননি, “ম্যাডাম কে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে তা’ নির্দিষ্ট করে বলা আপনার কাজ নয়।” তেমনি জনাব সম রেজাউল সাহেবরা বলেননি, “আপা, সংসদে টেপ রেকর্ড বাজিয়ে কে বাসে আগুন দিয়েছে তা’ আইডেন্টিফাই করা আপনার কাজ নয়।”

শেখ হাসিনা জাতির জনকের কন্যা। দেশের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রয়েছেন। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। শেখ হাসিনা ছাত্ররাজনীতি করেছেন।

রাজনৈতিক পরিবেশে, পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। দেশের জনগন শেখ হাসিনার কাছ থেকে ভিন্নতর রাজনীতির প্রাকটিস আশা করেছিলেন। বেগম জিয়ার কাছে মানুষের এধরনের প্রত্যাশা নেই। বেগম জিয়ার ভুল ক্ষমার চোখে দেখেন।

কিন্তু একই ধরনের ভুলের জন্য মানুষ শেখ হাসিনাকে বা আওয়ামীলীগকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজী নয়। বিএনপি সকল আদর্শের সংমিশ্রনে একটি রাজনৈতিক দল।

বিএনপিতে মুক্তিযাদ্ধারা রয়েছেন, জাতীয়তাবাদী, ইসলামিক ভাবধারার, মুসলিম লীগ, জামায়াত ইসলামী, নেযামে ইসলামী নানান বিশ্বাসের মানুষদের সম্মিলন রয়েছে। তাদের এই আদর্শের কোনো পরিবর্ত ঘটেনি।

কিন্তু, পরিবর্তন ঘটেছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামীলীগে। আওয়ামীলীগ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ এটি এখন বাগাড়াম্বরে সীমাবদ্ধ। আওয়ামীলীগের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও তথৈবচ।

ক্ষমতায় যেতে এবং ক্ষমতা আঁকরে থাকার কারনে গনতন্ত্রকে জলান্জলী দিয়ে প্রতিপক্ষকে বল প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ করছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির লালন করছে। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে ধর্মান্ধদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করে আসছে।

তাতে কি আওয়ামী লীগের শেষ রক্ষা হবে? না, তা’ মনে হয়না। ধর্মান্ধ গোস্ঠী ইমাম হিসেবে বেগম জিয়ার নারী নেতৃত্বেও বিশ্বাস করে। শেখ হাসিনার বা আওয়ামীলীগের কোনো পুরুষ নেতৃত্বকেও তারা ইমাম হিসেবে কখনও মানবেনা।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাংগার হুমকি রয়েছে। কদ্দিন পরে তারা তা’ করবে। সুযোগ পেলে দেশের সকল শহীদ মিনার এবং ভাস্কর্য ধুলায় মিশিয়ে দিবে।

আইনবিদ সাংসদ, মন্ত্রীগনকে বলছি মওদুদ সাহেবদের অবস্থা আপনারা দেখেছেন। বগল দাবানোর শাস্তি কিন্তু শুধু বেগম জিয়া একা ভোগ করছেননা; তারাও ভোগ করছেন।

প্রধানমন্ত্রী সব জানেন বলে বগল বাজাচ্ছেন। একজন মানুষের পক্ষে সব জানা সম্ভব নয়। এটাই সত্য। সত্য যতো কঠিন হোক সেটা বলুন। আপনারা বাঁচবেন। দেশ বাঁচবে।

মোঃ শফিকুল আলম
মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।
[ঢা/এফএ]

নভেম্বর ৩০, ২০২০ ৫:৫৩

(Visited 34 times, 1 visits today)