শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অনন্য প্রকাশ

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অনন্য প্রকাশ
  •  
  •  
  •  
  •  

মো. শফিকুল আলম: ১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী ছাত্রলীগের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এক প্যানেলে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিলো শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অনন্য প্রকাশ।

১৯৮৯ সালের সম্ভবত: ০৮ ফেব্রুয়ারী ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় এবং হল সংসদসমুহের নির্বাচন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলসমুহ অনেকটা চর দখলের মতো জাতীয়তাবাদী স্বশস্ত্র ক্যাডারদের দখলে ছিলো। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দলনে শক্তি সংযোজনে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর ঐক্য ছিলো একটি সময়ের দাবী।

জাতীয় রাজনীতিবিদগণ DUCSU নির্বাচনে প্রগতিশীল ছাত্রসংঠনগুলোর এক প্যানেলে নির্বাচনের ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছান।

অনেক বৈঠক এবং আলোচনার পর ঐ সময়ের ছাত্র-নেতৃত্ব এক প্যানেলে নির্বাচন করার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপনিত হলেন। এই সিদ্ধান্ত জানার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিকামী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো। আনন্দ-মিছিলে পুরো ক্যাম্পাস যেনো দুলছিলো।

ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত সেই প্যানেলে কেন্দ্রীয় সংসদে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সংগ্রামী সভাপতি সেই সময়ে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ জনাব সুলতান মোহাম্মাদ মনসুর আহম্মেদ ভিপি হিসেবে মনোনয়ন পেলেন এবং জিএস হিসেবে জাসদ ছাত্রলীগের জনাব ডা: মোস্তাক হোসেন। আমাদের ছাত্রলীগ থেকে জনাব মোল্লা আবু কায়সার সমাজসেবা সম্পাদক এবং জনাব মাহবুবুল হক লিটু সদস্য পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। জাতীয় ছাত্রলীগ থেকে জনাব অহিদুজ্জামান চান ( বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক) পরিবহন সম্পাদক পদে এবং আব্দুর রাজ্জাক সদস্য পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। বিভিন্ন হল সংসদ সমুহে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে যাঁরা ( যাঁদের নাম আমার মনে পড়ছেনা ) মনোনীত এবং নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে যথাক্রমে জনাব সহিদুল ইসলাম চুন্নু ভিপি এবং জনাব মোশাররফ হোসেন রাজা জিএস , এফ রহমান হলে জিএস হিসেবে লনির নাম মনে পড়ছে , সূর্যসেন হলে জনাব আফজাল হোসেন ভিপি , বঙ্গবন্ধু হলে জনাব মজ্ঞুরুল আলম লাভলু ভিপি , রোকেয়া হলে জনাবা নাজমা আক্তার ভিপি , শামসুন্নাহার হলে জনাবা বাধন (প্রয়াত) ভিপি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি পরিবহন সম্পাদক পদে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী ছিলাম। সংগত কারণে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী ছাত্রসংগঠনসমূহের accommodation জরুরী ছিলো ঐক্যের কারণে। আমি যেহেতু non-resident students-দের যাতায়াতকারী বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী পরিবহনগুলোর সংগঠন কেন্দ্রীয় পরিবহন পরিষদের সভাপতি ছিলাম তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশাল অংশের কাছে সুপরিচিত ছিলাম। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং হলসমূহেও সমানভাবে পরিচিত ছিলাম। আমার মনে হয়েছিলো স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জিততে পারবো। তাই পরিবহন সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলাম।
যেহেতু ছাত্রলীগের একজন সদস্য সেহেতু সুলতান ভাইসহ সুহৃদদের পরামর্শে আপার (জননেত্রী শেখ হাসিনা) সাথে consultation করার প্রয়োজন হলো বা অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হলো।

আপা তখন আনবিক শক্তি কমিশনের মহাখালিস্থ বাসায় থাকেন। দিন/তারিখ স্বরণে আসছে না। তবে ১৯৮৯ সালের জানুয়ারীর শেষ দিকে অথবা ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিকের শুরুতে আমাদের জুরাইনের কাজী মঈনুদ্দিন মুনির ভাইসহ আপার কাছে গেলাম। নজীব ভাই সেখানে ছিলেন। মুনির ভাইকে দেখে জুরাইন মাজারে ( মুনির ভাই-এর নানার মাজার) আপাকে ঊষ্ম অভ্যর্থনা দেয়ার কথা স্মরণ করে ধন্যবাদ জানালেন। উল্লেখ্য আপা ঐ পথে কোথাও গেলে জুরাইন মাজার জিয়ারত করতেন। কাজী মুনির ভাই জীবিত নেই। কিন্তু স্বৈরাচার বিরোধী সকল আন্দোলনে মনির ভাইকে সাথে নিয়ে কতো পরিকল্পনা এঁটেছি। হরতাল সফল করার জন্য আগের দিন রাতে সকল রিক্সা গ্যারেজ মালিকদের সাথে বৈঠক করতাম। সকল ট্রাক স্টান্ডে সভা করতে হতো। আপা মনির ভাইকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ইতোমধ্যে আপা আসলেন এবং আমাদেরকে চা দিতে বলে আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন।

আমি আপাকে আমার credentials বর্ণনা করে পরিবহন সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার অনুমতি চাইলাম। আপা মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনে যা’ বললেন ,” তুমি যদি মনে করো তুমি জিততে পারবে সেক্ষেত্রে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মনে রাখবে ‘৬৯-এ তোফায়েল ভাই’র পর অদ্যাবধি DUCSU’র ঐ শীর্ষ পদে ছাত্রলীগের প্রতিনিধিত্ব নেই। আমার দৃঢ বিশ্বাস যেভাবে সুলতান ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে focused হয়েছে তাতে সুলতান ভিপি হবে। এই মুহূর্তে আন্দোলনের প্রয়োজনে DUCSU’র ঐ পদটিতে ছাত্রলীগের জয়লাভ জরুরী। পুরো প্যানেলে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। নাজমা এবং বাধনের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন। ছাত্রীদের কাছে ওরা প্রিয় মুখ।” আপা আরও যে বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিলেন তা’ হচ্ছে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে ডাকসু না থাকলে একই প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং শিবির আন্দোলনকে কিন্তু বাধাগ্রস্ত করবে। তারপরও আমি নিশ্চিত জিততে পারলে স্বতন্ত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি আমাকে দিলেন বলে আপা পূনরায় ব্যক্ত করলেন।

আমি আপার অনুমতি পেয়ে ব্যানার এবং লিফলেট দিয়ে প্রচার শুরু করলাম। কিন্তু নির্বাচনের সময় যতো ঘনাতে থাকলো ছাত্রসমাজ একচেটিয়া ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের প্রতি তাঁদের সমর্থন স্পষ্ট করতে লাগলো। ছাত্রলীগ এবং বন্ধুদের কাছ থেকে আমাকে withdrawal-এর চাপ আসছিলো এবং শেষ পর্যন্ত তা’ই হলো। আমাকে সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে সর্বশেষ প্যানেল পরিচিতি সভায় withdrawal -এর ঘোষণা দিতে হলো। আমি হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের সেই সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখে withdrawal এর ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে চারিদিক থেকে পুষ্প বর্ষণে সিক্ত হলাম। শ্লোগানে শ্লোগানে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত হলো। আমার নিজেকে তখন সত্যিই এতো সম্মানিত মনে হলো যেনো ভিপি নির্বাচিত হওয়ার থেকেও বেশি পেলাম। এতোটা সম্মানিত আর আমি কখনও বোধ করিনি। এদিনটি’ই ছিলো এবং আছে আমার জীবনের সব থেকে স্মরনীয় দিন হয়ে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

ঢা/কেএম

(Visited 23 times, 1 visits today)