রাজনীতি ও গণতন্ত্র চর্চার অনুপস্থিতিই সমাজে অস্থিরতা

রাজনীতি ও গণতন্ত্র চর্চার অনুপস্থিতিই সমাজে অস্থিরতা
  •  
  •  
  •  
  •  

শফিকুল আলম: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সুযোগে সমাজে ভয়ানক অপরাধী(হত্যা, ধর্ষণ, নারী এবং শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে), দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত, কালোবাজারী, লুটেরা গোস্ঠী তৈরী হয়। তথাকথিত সিভিল সোসাইটি(মধ্যবিত্ত শ্রেনী তথা শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবি, সংস্কৃতি কর্মী) নির্লজ্জ দলদাসে পরিনত হয় এবং ক্ষমতার অন্ধ সমর্থক হয়ে অবিরাম সুবিধাভোগী হওয়ায় মত্ত থাকে। এই গোস্ঠী কোনোক্রমেই সুবিধা লাভের জন্য বা সুবিধা বন্চিত হওয়ার ভয়ে ক্ষমতাসীনদের সকল অন্যায় কাজের সাফাই গাওয়া থেকে বিরত থাকেন না।

সামরিক সরকারগুলোর সময় সবচাইতে বেশী নৈতিক স্খলন ঘটে তথাকথিত সিভিল সোসাইটির প্রবক্তাগনের। সর্বশেষ সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষক ফকরুদ্দিনের তত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিভিল সোসাইটির বিরাজনীতিকরনের প্রানান্তর চেষ্টা সকল সময়ের রেকর্ড লঙ্ঘন করেছিলো। এদের সহযোগী হিসেবে সব সময়ই বেশ কিছু সুযোগ সন্ধানী রাজনীতিক থাকেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রাজনীতিকদের বড় অংশটি তথাকথিত বিপ্লবী এবং বামপন্থী হয়ে থাকেন।

নব্বই পরবর্তী তিনটি গনতান্ত্রিক সরকার যা-ই করে থাকুন (ভালো এবং মন্দ) অন্তত: জনগন অবহিত ছিলো। সামরিক সরকারগুলো ক্ষমতায় থাকাকালীন মূলত: কি পরিমান অনিয়ম/দুর্নীতি হয়ে থাকে তা’ জনগন জানতে পারেনা। রাজনীতিকদের ব্যর্থতার কারনে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ওয়ান ইলেভেনের ইন্টারভেনশন গনতান্ত্রিক ধারাকে ভিষনভাবে স্থবির করে দিয়েছিলো।

যাহোক আর্মিব্যাক্ড এই সরকারটি বিরাজনীতিকরনের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করে কোনো রকম দেশান্তরী হয়ে নিজেদের রক্ষা করেন। তবে জনগনের সামনে চরিত্রহীন রাজনীতিক এবং সিভিল সোসাইটির বা সুশীল সমাজের চেহারাটি নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়। সেই থেকে সিভিল সোসাইটি সমাজের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নিয়ে কথা বলার নৈতিক সাহস হারিয়েছেন। ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত ধীরে ধীরে দানবাকার রূপ ধারন করেছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনপূর্ব এবং নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দানবদের বেড়ে ওঠা শুরু। আবার একই ভাবে ২০১৮ সালের নির্বাচনপূর্বাবস্থায় একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরী হয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই দু’টো মেয়াদে (১২ বছর) আওয়ামীলীগ সরকার কেনো এই দানবদের বেড়ে উঠতে দিলো বা নিয়ন্ত্রণে আনায়ন করতে পারলোনা।

না, সরকার ইচ্ছে করে এদের বেড়ে উঠতে প্রনোদনা দেয়নি। সরকার প্রধানের কাছে এদের ব্যাপারে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রারম্ভেই তথ্য ছিলো। প্রথম মেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্ তৈরীর কাজ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য জঙ্গী দমন এবং নিয়ন্ত্রনে রাখার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি বিএনপি এবং তাদের সহযোগী মৌলবাদীগোস্ঠীর তৈরী করা রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা ফেইস করে ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আওয়ামীলীগ প্রধানকে এই দানবদের ব্যাপারটি সচেতনভাবে ইগনোর করতে হয়েছে। ২০১৮-তে এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন মৌলবাদী গোস্ঠীর সাথে কামাল হোসেন গংদের গাঁটছড়া রাজনীতিতে আরো অধিক মাত্রায় অনিশ্চয়তা তৈরী করে। ফলে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-এমপি, নেতাদের একটি বড় অংশ বাদ দিয়ে যে নোমিনেশন তালিকা করেছিলেন তা’ শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল করেন। ফলে গণহারে আগের মেয়াদের প্রায় শতভাগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে আবার নোমিনেশন পেয়ে যান।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রায় সকল সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন করা হয়নি একই বিবেচনায়। ফলে সকল অংগ এবং সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতৃত্ব দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়নে দানবীয় রূপ পরিগ্রহ করে। তৃতীয় মেয়াদের সরকার প্রধান যখন ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হলেন তখন তাঁর চোখ ছানাবড়া। ইতোমধ্যে দুর্নীতির ক্যানসার তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরে পৌঁছে গেছে। লোম বাছতে গিয়ে তিনি দেখছেন কম্বলই উজাড় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইতোমধ্যে জনগন এবং প্রধানমন্ত্রী’র মধ্যে আস্থার যায়গাটি অত্যন্ত গভীরে গ্রথিতো হয়েছে। জনগন একমাত্র প্রধানমন্ত্রীকে তাদের আপনজন মনে করে। ফলে দেরীতে শুরু হলেও এই অভিযানে পুরো বাংলাদেশ শেখ হাসিনার পেছনে দাঁড়িয়েছে। জনগন এ-ও বিশ্বাস করে যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রনে সক্ষম হবে।

শেখ হাসিনা ওয়ান ইলেভেনে কিছু সিনিয়র রাজনীতিক তাঁর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করার পর কিছু জুনিয়র নেতৃত্বের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। একেবারেই স্বল্প সংখ্যক তাঁর বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন। তিনি কখনোই চিন্তা করেননি ওমর ফারুক চৌধুরী, মোল্লা আবু কায়সার, পঙ্কজ দেবনাথ, তাঁরই নির্বাচিত শোভন-রাব্বানীরা দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হবে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় অসংখ্য শম্ভুনাথদের সন্তানরা যে দানবে পরিনত হয়েছে সে চিত্র দেখে শেখ হাসিনা শুধু অবাক বা বিস্মিত হননি; চরমভাবে হতাশ হয়েছেন।

তবে এই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী সকল পর্যায়ে এই দুর্নীতি বিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখছেন। কোনো পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ আইনের বাইরে থাকতে পারবেনা। পুরো মেয়াদে ক্রমান্বয়ে অসংখ্য অসংখ্য আইনের আওতায় আসবে। অনেকের রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। সৎ, যোগ্য এবং দক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত উন্নয়ন এবং গনতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে।

চারিদিকে চাটুকরের দল! স্তুতিকরনের মাত্রা বহু পূর্বেই ছাড়িয়েছে।সাংবাদিকরা (জাতির বিবেক!) চাটুকরিতা করছেন।রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাটুকরিতা করছেন। সকলে স্তরে চাটুকরিতা চলছে। এমতাবস্থায় যেকোনো মানুষ ভুল করতে পারেন।মানুষ এমনিতেই ভুল করবে এটা স্বত:সিদ্ধ। কিন্তু চাটুকরিতা না থাকলে সংশোধনের সুযোগ থাকে।চাটুকরিতা এমন পর্যায়ে পৌঁচেছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুল করতেই পারেননা। তিনি মানুষ নন। তিনি অতি মানব। ফেরেস্তা জাতীয় কিছু।

এখানেই প্রধানমন্ত্রী কখনো কখনো কনফিউজড্ হয়ে যান। ব্যবস্থা গ্রহনে সময় নিতে হয়। সত্যাসত্য নির্ধারনে তাঁকে বেগ পেতে হয়। সম্প্রতি যখন ধর্ষণের উল্লাস চলছে এবং এই জঘন্য অপরাধের সাথে যখন স্থানীয় আওয়ামীলীগ এবং ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতা ব্যাপক হারে দেখা যাচ্ছে তখন তিনি বুঝতে পারছেন এরা কারা। দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতার বলায়ে এরা যে এখন প্রকৃত আওয়ামীলীগারদের সংখ্যালঘুতে পরিনত করে কোনঠাসা করে জানোয়ারের ক্ষমতার্জন করেছে তা’ আর বুঝতে বাকী নেই। এরা যারাই হোক এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে এবং হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ছাড়া যারা কথা বলছেন তারা কোনো ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা না করে সত্য স্বীকার করে নিয়ে দলীয়ভাবে এই জানোয়ারদের বিরুদ্ধে অন্যেরা কথা বলার পূর্বে নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। আইনে প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে সময় লাগবে। দলীয় প্রতিরোধ দ্রুত সমস্যার সমাধান করবে। অন্যদেরকে রাস্তায় আন্দলোন করার ইস্যু তৈরী করতে না দিয়ে নিজেরাই এদের বিরুদ্ধে আন্দলোন করুন। প্রধানমন্ত্রীও এই জানোয়ারদের বিরুদ্ধে তখন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সমর্থ্য হবেন।

প্রধানমন্ত্রীকে মানুষ রাখুন। অতিমানব বানানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর হবে।

লেখক পরিচিতি: প্রবাসী লেখক, (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

ঢা/কেএম

অক্টোবর ২৬, ২০২০ ৫:৫৭

(Visited 21 times, 1 visits today)