রক্ত গোলাপের হাসি (পর্ব ০২)

রক্ত গোলাপের হাসি (শেষ পর্ব)
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রথম পর্বের পর থেকে….

রহিম মিয়া আমেনা কে দেখে বলল , ” কেমন আছস রে মা , মেলা দিন পরে দেখলাম “। ” ভালো আছি খালু । মাস্টারের বাড়িতে কেন গেছিলা ? আনোয়ারের কি কোন খবর পাইলা “।

রহিম মিয়া : হ রে মা , পাইলাম। ফুন করছিল।

জমিলা : কি খবর আমার পোলার। কেমন আছে?

রহিম মিয়া : আনোয়ার ভালো আছে। গার্মেন্টসে চাকরি লইছে।

জমিলা : ময়নার আর আমেনার কথা জিগায় নাই ?

রহিম মিয়া : জিগাইছিলো। ময়নার লেইগা জামা কিনছে , খেলনা কিনছে।

জমিলা : আমেনার কথা জিগায় নাই ?

রহিম মিয়া : জিগাইছে , কিন্তু ‌,,,, বলেই আমেনার দিকে তাকালো রহিম মিয়া।

আমেনা : কি হইছে খালু , অমন কইরা চুপ কইরা গেলা কেন ?

জমিলা : কি হইছে , কিছু কওনা কেন ?

রহিম মিয়া : আমারে তুই মাফ কইরা দেইশ রে মা। আমি আনোয়ারের লগে তরে বিয়া দিতে চাইছিলাম। কিন্তু আনোয়ার বিয়া কইরা ফেলসে রে মা। তুই ভাবিস না মা , তোরে ভালো জায়গায় বিয়া দিমু আমি।

আমেনা : আমি এহন যাই খালু। অনেকক্ষণ আইছি। মামী বকবো।

বলেই চলে যায় আমেনা। বাইরে খেলছিল ময়না। ঘরে এসে তার মাকে বলল , ” আমেনা বুবুর কি হইছে গো মা কানতে কানতে চইলা গেল”। ” তোর ভাইয়ে বিয়া কইরা ফেলসে রে মা। আমেনা রে কি বুঝামু। তুই যা স্কুলে যাইতে হইবো”। বিকেলে মাঠে ছেলেমেয়েদের সাথে খেলছে ময়না। হঠাৎ দেখে আমেনা মাঠের কোণার আম গাছটার নিচে বইসা আছে।

“এই খানে বইসা আছো কেন আমেনা বুবু”.। ” এমনেই রে ময়না “। ” তুমি ভাইবো‌ না বুবু । তোমারে অনেক ভালো পোলার লগে বিয়া দিমু “। ” তুই অনেক ভালো রে ময়না । কাউরে ভালোবাসিস না রে ময়না । অনেক কষ্ট পাইতে হয় “। ময়না কিছুই বুঝতে পারে না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

” যাইরে ময়না , ভালো থাকিস “. । ” আমেনা বুবু চল না আইজ আমার লগে থাকবা”। ” না রে ময়না , মামী বকবো। বাপ মা মরার পরে তো কষ্ট ছাড়া কিছুই পাই নাই। আনোয়ারের ভালোবাসায় সব ভুইলা আছিলাম। এহন তো ওইটাও নাই। ভাবছিলাম তদের বাড়িতে সুখেই থাকমু। কপালে নাই রে। এই চুড়ি টা রাখ, তোর ভাইয়ে দিসিলো। কাউরে ভালোবাসিস না ময়না ” । আমি তুমারে কথা দিতাছি বুবু । আমি কোনদিন কাউরে ভালোবাসুম না ”

রাতে ঘুমাতে পারে না আমেনা। অনেক প্রশ্ন মনের ভিতরে। সে ভাবে , ” আনোয়ার কেন এমনটা করল। কি দোষ করছিলাম আমি। কত স্বপ্ন দেখাইছিল। কইছিল ঢাকা গেলে অনেক টাকা কামানো যাইবো। পরে আমারে বিয়া কইরা লইয়া যাবো। সব কি মিথ্যা আছিলো “। ভাবতে ভাবতে কান্না চলে আসে তার।

পরের দিন সকালে একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙ্গে ময়নার। ঘুম ভাঙ্গে মানুষ এর চেঁচামেচি তে। কি হয়েছে বুঝতে পারে না ময়না। বাইরে গিয়া বাবারে জিগাইলো ,” কি হইছে আব্বা , কান্দ ক্যান তুমি? এত মানুষ ক্যান ? ” মা রে, আমেনা কাইল মাঠের আম গাছের লগে গলায় ফাঁস দিছে ।

আনোয়ার এইডা তুই কি করলি রে ” , বলেই কান্নায় ভেংগে পরে রহিম মিয়া। দৌড়ে যায় ময়না। গিয়ে দেখে আমেনার লাশ নামানো হয়েছে। কাঁদতে পারে না ময়না। স্তব্ধ হয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে শুধু। আর ভাবে , ” এমন ক্যান করলা আমেনা বুবু। আমিও তো তোমারে কত্ত ভালোবাসতাম। তূমিও তো ভাইয়ের মতো ভালোবাসা বুঝলা না”।‌‌

বিকেলে আমেনাদের বাড়িতে যায় ময়না। গিয়ে দেখে আমেনার মামা দোয়ারে বসে কাঁদছে। ” কাইন্দ না মামাবাবু। আমি আছি তো তোমাগো দেখার লেইগা”। ময়নার কথা শুনে আমেনার মামী বলে , ” কাইন্দা এতো আদিখ্যেতার কি আছে বুঝি না বাপু। ভালোই হইছে , আপদ দূর হইছে। খরচপাতি তো কমলো। খালি খাইতো আর ঘুমিইতো। তোর ভাইয়েও ঠিক কাম করছে। এমন মাইয়ার লগে সংসার করা যায় না”।

কিছু বলতে পারে না ময়না। ছোট যে , প্রতিবাদ করার মতো বয়স যে তার হয়নি। চলে যায় ময়না। রাতে মা বাবার সাথেই ঘুমায় ময়না। কিছুদিন হয় স্কুলে ও যায় না ময়না , পাড়ার ছেলেমেয়ের সাথে খেলতেও যায় না। সব সময় ভাবে, ” আমেনা বুবু ক্যান এমন করল, আমিও তো তারে কত্ত ভালোবাসতাম “।

“ময়না, ও ময়না।” ” কি কও আব্বা ?”
“আইজ মঙ্গলবার, হাটের দিন। চল মা তোরে হাটে নিয়া যাই। অনেক দিন হয় তরে কোথাও লইয়া যাই না”।

“তুমি যাও আব্বা, আমি যামু না __” ।
“চল রে মা , পুতুল কিইনা দিমু _ “।

হাটে যাওয়ার পথে ময়না তার আব্বারে জিগায়, ” আমেনা বুবু ক্যান এমন করল আব্বা?”

রহিম মিয়া উত্তর খুঁজে পায় না।
“ছোড মাইনষের এগুলা ভাবতে হয় না রে মা “।

হাট থেকে ফেরার পথে হুট করে পিছন থেকে ডাক আসে, “ও রহিম মিয়া, দাঁড়াও দাঁড়াও”।
রহিম মিয়া: মাস্টার সাব আপনে ।
মাস্টার: তোমার বাড়ির দিকেই যাইতাছিলাম। ভালোই হইছে রাস্তায় দেখা হইছে।
রহিম মিয়া: কি হইছে মাস্টার সাব।
মাস্টার: তার আগে বল, ময়না স্কুলে যায় না ক্যান ?

রহিম মিয়া: আমেনার লেইগা খালি কান্দে। ঘর থেইকা বাইর হয় না।

মাস্টার: আচ্ছা, শুন রহিম মিয়া, আনোয়ার কাইল ফোন করছিল। দুই দিন পর তোমাগো নিতে আসবো ।

ময়না: ভাই রে আইতে না করেন মাস্টার চাচা। ওর লেইগা আমেনা বুবু আমারে ছাইড়া চইলা গেছে। ওরে আইতে না করেন।

মাস্টার: এমন কথা বলতে নাই ময়না। শুন রহিম মিয়া অনেক দিন পর তোমার পোলা আইতাছে, রাগ কইর না।

রহিম মিয়া: আইচ্ছা মাস্টার সাব। এহন যাই।

দুই দিন পর আনোয়ার আসে গ্রামে।

জমিলা: আনোয়ার তুই আইছস বাজান। এতদিন পরে আইলি রে।

আনোয়ার: ঢাকায় কামের অনেক চাপ মা। মেলা কষ্টে দুই দিনের ছুটি নিয়া আইছি। তুমরা কেমন আছো মা, আব্বা আর ময়না কই?

জমিলা: তোর আব্বা বাজারে গেছে , ময়না কই ঘুরতাছে কে জানে। তুই ঘরে যা। আমি তোরে খাইতে দেই।

“অনেক দিন পর তুমার হাতের রান্না খাইতাছি মা। কত শান্তি লাগতাছে”। সব শুনে আর পাখা দিয়ে বাতাস করে জমিলা। এমন সময় ময়না আসে।

আনোয়ার: আরে ময়না কই ছিলি রে তুই। দেখ তোর লাইগা কি আনছি। খাড়া, খাইয়া নেই। মন খারাপ হয়ে যায় ময়নার।” তুই কেন আইছস ভাই। তর লাইগা আমেনা বুবু আমারে ছাইড়া চইলা গেছে। তুই যা। চইলা যা”। কিছু বুঝতে পারে না আনোয়ার। ” কি হইছে মা। আমেনার কি হইছে _”।” তোর বিয়ার কথা শুইনা আমেনা গলায় ফাঁস দিছে রে বাজান “, বলেই আঁচলে মুখ ঢাকে জমিলা।

” তুই যা চইলা যা ” , বলেই বাইরে চলে যায় ময়না। আনোয়ার কিছু বলে না, চুপচাপ খেয়ে , শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বিকেলে আনোয়ার ময়না রে ডাকে,” চল রে ময়না আমেনার বাড়িতে যাই”। ” তুই যা আমি যামু না। “চল রে বইন”। আনোয়ার এর সাথে আমেনার বাড়িতে যায় ময়না।

“কেমন আছেন মামা ?” ” তুমি আইছ আনোয়ার, তোমার লাইগা মাইয়া আমার মইরা গেল। মেলা ভালোবাসতো তুমারে”।

আমেনার মামী বলে,” আইছে মহারাজ ঢাকা থেইকা বড়লোক হইয়া। বলি কত বড়লোক হইছ তুমি যে আমার আদরের মাইয়া আমেনা রে ভুইলা গেলা”, বলেই আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে আমেনার মামী।

সেদিন আর আজকের মামীর মধ্যে কোন মিল খুঁজে পায় না ময়না। সে ভাবে,” আইজ মামীমা কাদতাছে, অথচ সেদিন আমেনা বুবু রে গাইলমন্দ করল। কি দরকার আইজকা এমন নাটক কইরা সবার কাছে ভালো সাজার” । উত্তর খুঁজে পায় না ময়না। মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন। “আমারে মাফ কইরা দিয়েন মামা __”।

লেখক: সাবিকুন নাহার সিফা
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরো পড়ুন: রক্ত গোলাপের হাসি (পর্ব ০১)

ঢা/আরকেএস

আগস্ট ২৯, ২০২০ ৪:৩৭

(Visited 23 times, 1 visits today)