মুন্সীগঞ্জে গাইডের দৌরাত্ম্য, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ বিঘ্নিত

কেকে স্কুলে গাইডের দৌরাত্ম্য
কেকে স্কুলে গাইডের দৌরাত্ম্য

মুন্সীগঞ্জ প্র‌তিনি‌ধি: মুন্সীগঞ্জ শহরের এভিজেএম ও কেকে স্কুলে গাইডের দৌরাত্ম্য চোখে পড়ার মত। শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বই না পড়ে গাইড পড়ায় ব্যস্ত। শিক্ষার্থীদের ব্যাগে মূল বইয়ের বিপরীতে এখন গাইড বই পাওয়া যায়।

কিছু কিছু শিক্ষক গাইডের প্রশ্ন বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় দেন এবং শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস করান যে গাইড থেকেই সব প্রশ্ন কমন পড়ে। এজন্য শিক্ষার্থীদের গাইড নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। ফলে পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয় হচ্ছে।

খোজ নিয়ে জানা যায়, এভিজেএম স্কুলের গণিত শিক্ষকরা পাঞ্জেরী গাইড পড়ান এবং স্কুলের প্রশ্নও করেন। ইংরেজি শিক্ষকরা এডভান্সড থেকে প্রশ্ন করেন। বিভিন্ন প্রকাশনীর সূত্রে জানা যায়, পাঞ্জেরী ৪ কোটি, লেকচার ২.৫-৩ কোটি টাকার বাজার এই মুন্সীগঞ্জে।

আইন করে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গাইড ও নোট বই বারবার নিষিদ্ধ করা হলেও মুন্সীগঞ্জ বাজার সয়লাব গাইড বইয়ে।

বিক্রেতাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের চাহিদার জন্যই নামে বেনামে এসব প্রকাশনির বই বিক্রি করছেন তারা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকদের পরামর্শে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বই কিনতে হচ্ছে তাদের। সহায়ক বই নামে নিম্নমানের এসব বই বন্ধ না করা গেলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশেও কোন উদ্যোগ কাজে আসবে না বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

এভিজেএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চৌধুরী এন্ড হোসইনের এ্যাডভান্স গাইড কিনতে বাধ্য করছে স্কুলের কতিপয় শিক্ষক। মোটা অংকের মুনাফা নিয়ে সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে বিতরণকৃত ইংরেজী গ্রামার বই না পড়িয়ে এ্যাডভান্স গাইড দিয়ে ক্লাসে পাঠদান হচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনেই এই সকল বই দিয়ে পাঠ করে আসলেও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানা যায়নি।

কেকেগভ. ইনিস্টিটিউশন ৫ লাখ ৫০ হাজার। কাজল ব্রাদার্স প্রকাশনীর অনুপম ৪ লাখ, প্রোগ্রেসিভ পুথিনিলয় থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার। রয়েল পাবলিকেশনস্ সৌজন্য সংখ্যা নিয়ে স্কুলে প্রবেশ করলে অপমান অপদস্ত করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে সৌজন্য কপিগুলো গেটের বাইরে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে দেয়। লেনদেনের চুক্তি স্কুলে বসে করেন প্রধান শিক্ষক মনছুর আহমেদ। পরবর্তীতে সাড়ে ৫ লাখ টাকার লেনদেন করেন ঢাকায়। আগের দুই বছরও তিনি একইভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে কে. কে গভ: ইনিস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক মনছুর আহমেদ জানান, কোন গাইড কোম্পানীর সাথে আমার কোন ধরনের চুক্তি হয় নাই। কাজল ব্রাদার্স, পুথিনিলয় কেন কোন কোম্পানী থেকে আমি অর্থ নেইনি। আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

মুন্সীগঞ্জে নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কিছু অসাধু শিক্ষকের নির্দেশে শিক্ষার্থীরা এসব বই কিনতে বাধ্য হচ্ছে। মোটা অংকের টাকা ডোনেশন নিয়ে স্কুলগুলোতে গাইড বই কিনতে বাধ্য করছেন স্কুল ও মাদ্রাসার প্রধানগণ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নোট বই মুদ্রণ, বাঁধাই, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ এবং আইন অমান্যকারীদের সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা কিছু বইয়ের দোকানে দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণীর নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ে সয়লাব হয়ে গেছে। এসব দোকানে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বিক্রি হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক বলেন, ‘সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের জন্য স্কুলের স্যারের কথা মতো গাইড বই কিনতে হয়েছে। দাম নিয়েছে ৭৫০ টাকা।

সৃজনশীল ও অনুশীলনমূলক বইয়ের নামে নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বই কিনতে অভিভাবকদের বাধ্য করে মুনাফা লুটছে একটি অসাধু চক্র।

কয়েকজন বইয়ের দোকানী বলেন, শিক্ষকরা বাধ্য করছে বলেই আমরা বিক্রি করছি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করছে শিক্ষকরা। তারা বলছে কোন শিক্ষার্থীকে বাধ্য করে দেওয়া হয়নি। অ

ভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি কোম্পানীর লোকজন স্কুল চলাকালীন সময়ে স্কুলে গিয়ে পড়ালেখার বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। গাইডগুলোর মধ্য রয়েছে, জননী প্রকাশনী, লেকচার প্রকাশনী, পাঞ্জেরী, অনুপম, দারসুন, আল বারাকা, ও আল ফাতাহ প্রকাশনা রয়েছে। তবে পাঞ্জেরী, কাজল ব্রদার্স, অনুপম সকলকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

মুন্সীগঞ্জ কাচারী চত্বর সকল লাইব্রেরী, স্টেডিয়াম মার্কেটের সকল লাইব্রেরী, টংগীবাড়ি, গজারিয়া, সিরাজদিখান, শ্রীনগর, লৌহজং উপজেলার ছোট বড় সকল বাজারের বই লাইব্রেরী গুলোতে নিষিদ্ধ গাইড বই বিক্রি চলছে দেদারছে।  প্রতিটি দোকানেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বই। এসব বই প্রকাশে, মুদ্রণে এবং বিক্রিতে বারবার নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও সহায়ক বইয়ের নামে বাজারে চলছে গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সৃজনশীল প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা পেতে শিক্ষকদের পরামর্শেই গাইড বই কিনছে তারা। এ জন্য একজন শিক্ষার্থীর একাধিক প্রকাশনীর গাইড বই কেনার নজিরও কম নয়।

শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে প্রশ্নের কাঠামোতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হলেও তা অনেকটাই আটকে আছে এই গাইড বইয়ে। যা কিনা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এ সংক্রান্ত আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা গাইড নির্ভর বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদরা।

তাই এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে শিক্ষার্থীদের জন্য মূল পাঠ্য পুস্তককে সহজ বোধ্য করার পরামর্শ তাদের।

ঢা/এলএম/আরকেএস

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )