মা’কে কাঁদতে দেখেছি

মা'কে কাঁদতে দেখেছি
  •  
  •  
  •  
  •  

মা’কে কাঁদতে দেখেছি

আসিফ ইকবাল আরিফ

আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার থেকে একটু বেশি বয়সী
এক গর্ভধারিণীকে কাঁদতে দেখেছি।
আমি তার ভ্রুযুগলে দু:খের নদী দেখেছি
দেখেছি তার মুখের ভাঁজে হাজার হাজার হতাশার ছাপ।
আমি তার রুগ্ন চোখের কোণে দেখেছি শত হাহাকার
দেখেছি তার আধপাকা সব চুলে কত ছবি শূন্যতার।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার থেকে একটু বেশি বয়সের
এক গর্ভধারিণীকে কাঁদতে দেখেছি।

আমি সেই গর্ভধারিণীর কণ্ঠস্বরে শুনেছি
নিজের পুত্রের বিকলাঙ্গ কামনায় নিজ কন্যার
ধর্ষণের এক বিকট আর আকণ্ঠ চিৎকার।
আমি দেখেছি সেই জননীর এক সন্তানের হাতে
আরেক সন্তানের হত্যার দাগ; রক্তের গন্ধ।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি বয়সী
এক জননীকে চিৎকার করে কাঁদতে দেখেছি।

আমি দেখেছি সে মা’য়ের কোলের শিশু
কিশোর তরুণ আর যুবকদের পথ ভুলে যেতে।
আমি মা’য়ের বুড়ো বুড়ো সন্তানদের দেখেছি
মায়ের সেবা ভুলে মা’কে কুরে কুরে খেতে।
আমি সেই মা’কে দেখেছি আঁচলভরে
ব্যথার জল বইতে, আর দীর্ঘ নি:শ্বাস ছাড়তে।
ঊনপঞ্চাশ বছর ধরে চোরেরা লুটেরা আর ডাকাতেরা
আমি দেখেছি মা’কে লুটেপুটে খাচ্ছে আর খাচ্ছে।
মা নিরূপায় হয়ে কাঁদছে তার নিরীহ সব সন্তানদের জড়িয়ে ধরে।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি বয়সী
এক মা’কে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে দেখেছি।

আমি দেখেছি মা’য়ের বাহু আর কোমর থেকে
অর্ধশত কিংবা তার চেয়েও বেশি চেতনা
ব্যবসায়ীদের উদয় হতে, তারা কখনো
মূল হয়ে শাখা হয়ে ডগা হয়ে আর পাতা হয়ে
মাকে কুরে কুরে খাচ্ছে দিন রাত ভরে।
আমি দেখেছি চেতনাবাজীর নামে
টগবগে এক রক্তিম ভোরে জন্ম নেওয়া মা’কে
দিনকে দিন নর্দমার কাদাজলে ছুড়ে ফেলতে।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার চেয়েও একটু বেশি
এক দু:খিনি মা’য়ের চোখের কোণে কষ্টের
একফোঁটা অশ্রুজল জমে থাকতে দেখেছি।

আমি দেখেছি মা’য়ের বিশ লক্ষ কিংবা তার একটু বেশি
সন্তানদের এক আরাম আয়েশের জীবন।
মা’কে মা’য়ের নিরীহ সন্তানদের সেবার নামে
অলিভ অয়েলে চকচকে করছে নিজেদের গতর
আর তাদের অনাগত চৌদ্দ পুরুষের জন্যে
অলিভ অয়েল স্টক করে যাচ্ছে আর যাচ্ছে।
ঘুষ দূর্নীতি আর লুটপাটের এক মহাযোজ্ঞ করে
এমন নানা অভিনবভাবে স্টক করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে
যেন তাদের ছেলে-মেয়ে, তাদের ছেলে-মেয়ের
ছেলে-মেয়েদের – এভাবে তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের
সন্তানদের পাছা তুলতুলে নরম করতে আর করাতে পারে
অলিভ অয়েলের অভাব যেন না আসে তাদের ঘরে।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়সী
এক মা’কে তার বোবা সন্তানদের বুকে নিয়ে
জল সমুদ্র হয়ে অনর্গল কাঁদতে দেখেছি।

আমি দেখেছি মা’য়ের উচ্চাভিলাষী একদল সন্তানেরা
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মা’কে ভিখারি বানাতে।
মা গরীব মা মিসকিন মা’য়ের ধন নেই ভাত নেই রুটি নেই
মা’য়ের জৌলুস নেই মা’য়ের জ্ঞান নেই মা’য়ের সন্তানদের
কোনো বুদ্ধি নেই; নিজেদের জ্ঞানে চলার ক্ষমতা নেই।
মা’য়ের স্তনে দুগ্ধ নেই; মা’য়ের কাছে সুখ নেই শান্তি নেই
সারাদিন নেই নেই বলে মা’কে পদতলে পিষেছে
আর বিদেশী বনিয়াদের কাছে মা’য়ের নিরীহ সন্তানদের
ভাগ্য গড়ার ভাগ্য নিয়ে খেলার; ভাগ্য বিক্রির
দালালীতে মেতে উঠেছে আর নিজেদের রুগ্ন
পেট ঢোলটাকে ফুলাতে মোটা করছে।
অথচ মা’য়ের সে-ই পথভ্রষ্ট আর মতিভ্রমে আক্রান্ত
আহাম্মুক আর বিদেশী ভাতারের পা চাটা
কুকুরের দল জানেনা যে মা’য়ের বটতলে কত শান্তি
মায়ের ধানক্ষেতে কত স্নিগ্ধতা মায়ের নদী নালা
খাল বিলে পাহাড়ে সমতলের মাটিতে কত প্রাচুর্যের জৌলুস
যুগ যুগ ধরে মায়ের নিরীহ কৃষকেরা জীবন পার করে যাচ্ছে
আর অলিভ অয়েলের মোলায়েম নরম পাছাওয়ালার
জন্যেও খাবারের যোগান দিয়ে যাচ্ছে খুব সস্তা দামে।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়সী এক
মা’কে তার আহম্মুক সন্তানদের জন্যে কাঁদতে দেখেছি।

আমি দেখেছি মা’য়ের জরাজীর্ণ বুকের উপর
মায়ের তরুণ তরুণী আর যুবক যুবতীদের
শুধু বীর্যস্খলনে এক চরম তৃপ্তিতে মাতামাতি করতে।
অথচ এই তরুণ যুবকের আগুনের মশালেই
মা’ হাজার বছরের গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে
নতুন এক জীবন পেয়েছিলো, মা’য়ের আলো বাতাস
মা’য়ের নদী সমুদ্র বন বনানী বিহঙ্গ কুজন স্বস্তি পেয়েছলো।
ওরে তরুণ ওরে যুবক বীর্যস্খলনেই জীবন নয়
ভাইয়ের রক্তের কথা কি ভুলে গেছো?
বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠনের কথা কি ভুলে গেছো? ভুলে গেছো কি পিতার
দেহ থেকে ঝরে পড়া রক্তের সেই কালো দাগ?
আবার জেগে ওঠো, মা’য়ের চোখের জল মোছো,
সংবাদপত্রের বানানো খবরে, টিভির পর্দার সাজানো কথা
মিথ্যেতে সাজানো ঠকবাজদের উন্নয়নের শ্লোক বয়ানে
তৃপ্ত থেকো না, ঘুমিয়ে থেকো না, মিথ্যে স্বপ্নে বিভোর থেকো না
মুক্ত করো মা’কে, আর মায়ের নিরীহ সন্তানদের।
আমি ঊনপঞ্চাশ কিংবা তার থেকে একটু বেশি বয়সী
এক গর্ভধারিণী মা’কে কাঁদতে দেখেছি।

লেখক পরিচিতি: শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢা/এফবিএস/কেএম

সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ ১:৪১

(Visited 128 times, 1 visits today)