মহামারীতে অস্ট্রেলিয়ার মানবসম্পদ রক্ষার অনন্য উদাহরন

অস্ট্রেলিয়ার মহামারী ঠেকিয়ে মানবসম্পদ রক্ষার উদাহরন সৃষ্টি
  •  
  •  
  •  
  •  

মোঃ শফিকুল আলমঃ উৎকৃষ্ট এবং দ্রুত রাজনীতির উভয়পক্ষের (সরকার এবং বিরোধী দল) সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহন এবং পারষ্পরিক গভীর বিশ্বাস (দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে) করোনাভাইরাসের মতো বৈশ্বিক মহামারী ঠেকিয়ে মানবসম্পদ রক্ষা করে দেশের অর্থনীতিকে সঠিক ধারায় আনায়নে অস্ট্রেলিয়া একটি অনন্য উদাহরন সৃষ্টি করেছে।

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় অস্ট্রেলিয়ার মধ্যপন্থী কর্ম-কৌশল গ্রহন অসাধারন ফলাফল তৈরী করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং অর্থনীতি একিভূত করে দৃঢ়কায় এবং সংহত সিদ্ধান্ত গ্রহনের অভাবনীয় দৃশ্য এই প্রথম।

এই সপ্তাহান্তে (আজকে পর্যন্ত) আমেরিকায় মৃত্যুর সংখ্যা ৬৭,০৪৬। আক্রান্তের সংখ্যা ১১,৬০,০০০। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৫৮,২২০ জন সৈন্য মৃত্যুবরন করেছিলো যে সংখ্যা করোনা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। যদি সময় মতো এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া না হতো অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক ভিত্তিক মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হতো।

পারষ্পরিক বিশ্বস্ততা, সরকার এবং বিরোধীদল রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহনে সক্ষম হওয়া এবং সুশাসন এই জরুরী অবস্থার ব্যবস্থাপনা অনেকাংশেই সহজ করেছে।

নেতৃত্বের এই অসাধারন ঐক্য ইনস্টিউশন হিসেবে সরকার এবং সংসদ, ফেডারেল এবং স্টেট লেভেলে এক গভীর বিশ্বাস এবং বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। সরকার প্রধান স্কট মরিসনের এ্যাপরুভাল রেট যেমন বেড়ে ৬৮% এ পৌঁছেছে, তেমনি স্টেট লেভেলে প্রিমিয়ারদেরও অ্যাপরুভাল রেট বেড়েছে।

উল্লেখ্য যে ফেডারেল সরকারে লিবারেল এবং ন্যাশনাল পার্টির কোয়ালিশন ক্ষমতায় থাকলেও দেশের ৬ টি স্টেট এবং ২ টি টেরিটরির মধ্যে ৫ টি তে লেবার পার্টি সরকারে রয়েছে। করোনা মোকাবেলায় যে ন্যাশনাল কেবিনেট রয়েছে সেখানে ফেডারেল প্রাইমমিনিস্টার, ৬টি স্টেটের প্রিমিয়ারস এবং ২টি টেরিটরির চীপ মিনিস্টারস রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মহামারী ঠেকিয়ে মানবসম্পদ রক্ষার উদাহরন সৃষ্টি; Photo source: Australian Government, Department of Health
অস্ট্রেলিয়ার মহামারী ঠেকিয়ে মানবসম্পদ রক্ষার উদাহরন সৃষ্টি; Photo source: Australian Government, Department of Health

সেক্ষেত্রে এই কেবিনেটে লেবার পার্টির মেজরটি রয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষমতার একটি চমৎকার ব্যালেন্স রয়েছে। করোনা মোকাবেলায় সফলতার মূল কারন কারন এটি। সিদ্ধান্ত গ্রহনে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে মধ্যপন্থী কৌশল গ্রহন। এবং এই কৌশল গ্রহনে প্রধান ব্যক্তিগন হলেন প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী গ্রেগ হান্ট, চীফ মেডিকেল অফিসার ব্রেন্ডন মারফি এবং ডেপুটি চীফ মেডিকেল অফিসার পল কেলি।

আদর্শবাদী বামপন্থী গ্রুপ সব দেশে সব সময় একই চরিত্রের হয়ে থাকে। এদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। এই গ্রুপটি অধিকতর কঠিন লকডাউনের পক্ষে। অপরদিকে আরেক গ্রুপ সম্পূর্ণ বিপরীত সবকিছুতেই অবাধ। কোনো কিছুতে সীমা টানতে চাননা। তারা আবার প্রো-ইকোনোমি সেটিংস এ বিশ্বাসী। সবকিছুতেই তারা রিলাক্সড থাকতে চান। অনেক সময় তা’ ঔদাসিন্যে পরিনত হয়।

কিন্তু করোনাভাইরাস মোকাবেলায় উল্লেখিত প্রধান ব্যক্তিবর্গের সব সময় ঐকমত এবং মধ্যপন্থী কৌশল অবলম্বন অস্ট্রেলিয়ায় যেমন সফলতা দিয়েছে তেমনি অস্ট্রেলিয়ার জনগনকে নিরাপত্তা এবং সঠিক অর্থনৈতিক গতি নির্দেশিত করতে সহায়তা করেছে।

মেলবোর্ন ডোহার্টি ইনস্টিউটের এপিমেডিওলোজির পরিচালক এবং ন্যাশনাল কেবিনেটকে পরামর্শ দেয়া মেডিকেল এক্সপার্ট টীমের মেম্বার জোডি ম্যাকবার্নন বলেন, “আমরা ভয়াবহ বিপর্যায় এড়িয়েছি।

এই পর্যায়ে এসে যারা বলছেন আমাদের রেসট্রিকশন প্রয়োগের প্রয়োজন ছিলোনা তাদেরকে নিউইয়র্ক, লন্ডন, স্পেনের দিকে তাকাতে হবে। কি হতে পারতো তা’ সহজেই অনুমানযোগ্য।” এই সমস্ত ডানপন্থীরাও আসলে আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছেন।

এই বামপন্থী বা ডানপন্থীদের কেহই বুঝতে পারছেননা অস্ট্রেলিয়া কি ভয়াবহ দৃশ্য এড়িয়েছে। আমাদের দেখতে হয়নি হসপিটালগুলোর সামনে শত শত রেফ্রিজারেটেড ট্রাক লাশ নিতে অপেক্ষা করছে। লাশ রাখার জন্য বিভিন্ন আইচ স্কেটিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেইকশিফট মর্গ বানাতে হয়নি। উচ্চ আয়ের অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোতে তা’ দেখা গেছে কিংবা দেখছি।

ধরনীতে অস্ট্রেলিয়া বিশেষ কোনো দেশ নয়। নিউইয়র্ক, লন্ডন বা ইটালীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার কোনো পার্থক্য নেই। তবে এখনও অস্ট্রেলিয়া কম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমরা সব দেশে মানুষই বাস করি। ভাইরাস মানুষকেই সংক্রমিত করছে। শুধু পার্থক্য এতোটুকুন যে অস্ট্রেলিয়া অনুমান করতে পেরেছিলো সময় মতো প্রতিরোধে সক্ষম না হলে কি হতে পারতো। এবং সে কারনেই ভয়াবহতা এড়ানো গেছে।

স্বাস্থ্যখাতের এই অভূতপূর্ব সফলতা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের দ্বারও খুলে দিয়েছে। তবে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রনে রেখেই করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলোতে যেখানে সফিস্টিকেটেড স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া অন্যতম।

অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, বৃটেন এবং ফ্রান্সের তুলনামূলক আলোচনা করলেই বোঝা যায় অস্ট্রেলিয়া কতো কুইকার রেসপন্স করে এই সমস্ত ধনী এবং উদার গণতান্ত্রিক দেশসমূহের থেকে কতো কতো গুন বেটার ম্যানেইজ করেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় এই লেখার সময় পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬,৮০১ এবং মৃতের সংখ্যা ৯৫। সুস্থ হয়েছে ৫,৮১৭। ৬৩৩,০০০ টেস্ট করা হয়েছে। সুস্থ হওয়ার হার ৮৫.৫%। আমেরিকার জনসংখ্যার সাথে সমন্বয় করে অনুপাত করলে এই মৃত্যুহার আমেরিকায় ৪৬ গুন বেশি।

এই লেখা পর্যন্ত আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা ৬৭,০৬৭। বৃটেনের জনসংখ্যার সাথে সমন্বয় করে এই মৃত্যুহার অস্ট্রেলিয়ার থেকে ৯৬ গুন বেশি। বৃটেনে মোট মৃতের সংখ্যা ২৮,১৩১। ফ্রান্সে ৯২ গুন বেশি এবং কানাডায় ২০ গুন বেশি। এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে মৃত্যুর সংখ্যা ২৪,৭৬০ এবং কানাডায় ৩,৫৬৬।

ওপরের তুলনামূলক ফিগার বলে দেয় বা দেখিয়ে দেয় দেশগুলোর নেতৃত্বের ইনএ্যাপ্রোপ্রিয়েট রেসপন্স বা স্লো রেসপন্স টু ভাইরাস তাদের মানব সম্পদের কতোটা ক্ষতি করেছে। তাদের টু লেইট রেসপন্স টু ইকোনোমি তাদের এতো বেশি বিপর্যায়ে ফেলেছে যে ভাইরাসের সংক্রমন রোধ না করেই ইকোনোমি ওপেন করতে হচ্ছে। একই ঘটনা ঘটতে পারতো অস্ট্রেলিয়ায় যদি যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহন না করা হতো।
অস্ট্রেলিয়ার মহামারী ঠেকিয়ে মানবসম্পদ রক্ষার উদাহরন সৃষ্টি; Photo source: World Economic Forum
অস্ট্রেলিয়ার মহামারী ঠেকিয়ে মানবসম্পদ রক্ষার উদাহরন সৃষ্টি; Photo source: World Economic Forum

২১ জানুয়ারী থেকে অনবরত স্কট মরিসন ৪টি ন্যাশনাল বডির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সেগুলো হচ্ছে ন্যাশনাল কেবিনেট, দি ফেডারেল ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটি অব কেবিনেট, দি ইকোনোমি কমিটি অব কেবিনেট এবং দি ফেডারেল কেবিনেট। প্রত্যেকটি বডি জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনে ইউনিক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত এবং বিরতিহীনভাবে পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে চলছে।

এই বডিগুলো ভাইরাস প্রতিরোধ এবং সংক্রমন রোধে যেসমস্ত ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে তা’ হচ্ছে চায়নার সাথে বর্ডার ক্লোজ করে দেয়া, এরপরই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে বর্ডার ক্লোজ করে দেয়া, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সীমিত করা এবং অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফিসকেল প্যাকেজ ঘোষনা (২১৪ বিলিয়ন ডলার)।

অর্থনৈতিক প্রোনোদনা তাৎক্ষণিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ ডিপ্রেশন থামিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত সংক্রমন রোধ প্রত্যাশিত সময়ের পূর্বেই অর্থনীতি চালু করে এস্টিমেটেড ক্ষতির পরিমান কমিয়ে আনতে সাহায্য করছে। অবশ্য সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে ভবিষ্যতে রাজনীতিকদের মধ্যে কতোটা একতা থাকবে তার ওপর।

এই জরুরী অবস্থায় রাজনীতিকদের মধ্যে যে জাতীয় ঐক্য পরিলক্ষিত হয়েছে দেশকে রিপেয়ার করতে সামনে দুয়েক টার্ম একই ধরনের ঐক্য থাকা বান্চনীয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং উৎপাদনে যেতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার জন্য চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনটি পিলারের ওপর অস্ট্রেলিয়া কোভিড-১৯ রেসপন্স গড়ে তুলে। প্রথমত: চীফ মেডিকেল অফিসার মারফি বায়োসিকিউরিটি এ্যাক্টের ক্ষমতাবলে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে করোনাভাইরাসকে প্যানডেমিক ঘোষনা করা এবং প্রধানমন্ত্রীকে এ্যালার্ট করা যাতে সরকার ন্যাশনাল ইনসিডেন্ট রেসপন্স সেন্টার (NIRC-National Incident Response Center) এ্যাকটিভেট করে।

ন্যাশনাল কেবিনেট গঠনের পূর্বেই NIRC বেশ কয়েকবার সভায় মিলিত হয়। NIRC প্রথমেই চায়না বংশোদভূত অস্ট্রেলিয়ানদেরকে দেশে ফেরত আনায়ন এবং কোয়ারেনটাইনের ব্যবস্থা গ্রহন করে। প্রধানমন্ত্রী বললেন চীফ মেডিকেল অফিসার সঠিক বলেছেন এবং আমাদের তাঁর উপদেশ অনুসরন করতে হবে।

দ্বিতীয় পিলারটি হচ্ছে ০১ ফেব্রয়ারী চায়না ট্রাভেল ব্যান করার সিদ্ধান্ত গ্রহন। এই সিগ্ধান্ত গ্রহন বেশ সমালোচিত হয়েছিলো। অনেকে এটাকে ওভাররিএ্যাকশন বলেছিলেন। তৃতীয় পিলারটি হচ্ছে ন্যাশনাল কেবিনেট গঠন এবং মার্চের ১৫ তারিখে প্রথম এর সভা অনুষ্ঠিত হয়। মরিসন এই কেবিনেট গঠনকে ঐকিহাসিক বলে দাবী করেন।

মিডলপাথ স্ট্রাটেজী ঘোষনা করতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হান্ট যেভাবে ব্যাখ্যা করছিলেন, “আমাদের কেহই বিশ্বাস করতে পারছিলামনা যে ভাইরাস স্কোয়াশ করতে অর্থনীতি স্কোয়াশ করতে হবে। বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলো। (১) জীবনকে অর্থনীতির ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে, (২) অর্থনীতিকে জীবনের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের দু’টোকেই বাঁচাতে হবে। একটি না থাকলে আরেকটির এমনিতেই মৃত্যু ঘটবে।”

বিভিন্ন সময় ইউএস এবং ইউকের সাথে অস্ট্রেলিয়ার তুলনা করা হয়। তুলনা করা হয় ট্রাম্প বা বোরিসের সাথে। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় উভয় দেশ নির্বুদ্ধিতা এবং ভুল পদক্ষেপে আক্রান্ত।

যেকোনো বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়ার রেসপন্স ছিলো ফার সুপিরিয়র। যেকোনো বিবেচনায় ট্রাম্পের নেতৃত্ব অনুসরন করা অস্ট্রেলিয়ার জন্য হবে হাস্যকর।

মোঃ শফিকুল আলম
মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

[ঢা/এফএ]

(Visited 7 times, 1 visits today)