বেঁচে থাকলে জীবনে বহু পহেলা বৈশাখ আসবে

  •  
  •  
  •  
  •  

ফজলুল হক পাভেল: আজ পহেলা বৈশাখ। বৈশাখের প্রথম দিন। আজকের সূর্যোদয় কিন্তু প্রতিদিনের মতো নয়, আজকের ভোরের প্রথম আলো বছরের অন্যান্য দিনের থেকে একেবারেই আলাদা। লাল আভায় ভেসে ওঠা নতুন আলোয় শুরু হল ১৪২৭ সনের প্রথম দিন। আবার শুরু হলো বাঙালির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর।

আজকের এই বৈশাখের রুপ ভিন্নতর। বৈশাখের প্রথম দিন হিসেবে আজকের দিনটি আলাদা হলেও করোনাকালের এই সময়ে এই বৈশাখ দারুণ একটি বার্তাও বহন করছে। এ বছর বৈশাখ সবাইকে তাগিদ দিচ্ছে ঘরে থেকে উৎসব উদযাপনের, পরিবারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের।

তবে প্রতিবার মহাসমারোহে এই দিনটিকে বাঙালি মন উদযাপন করলেও এবার কিন্তু করোনা কালো থাবা বসিয়েছে বৈশাখের আনন্দে। চাইলেও কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। চাইলেও প্রতি বছরের ন্যায় মঙ্গলশোভাযাত্রায় গিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারছে না। পারছে না পান্তা ইলিশে পেট ভরতে আর নাগরদোলায় চড়তে।

গত বছরের বৈশাখে অনন্ত আকাশে মস্তক তুলে দেবার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল সেই সময় আমাদের কছে এলেও এবার করতে হচ্ছে বাঁচার লড়াই। গ্লানি মুছে দেবার এই লড়াইয়ে এবার আমাদের শত্রুরুপে অবতীর্ণ হয়েছে এক ভয়ানক দানব।

দানবাকৃতির না হলেও এই শত্রু অদৃশ্য। অদৃশ্য এই দানব দোর্দণ্ড প্রতাপে গ্রাস করে চলেছে পুরো পৃথিবীকে। দানবের এই কালো থাবা আজ বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান।

দানবের দানবীয় কর্মকাণ্ডের শেষ কোথায়, তা না জানলেও এর সাথে যুদ্ধ করার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আমাদের জানা আছে। যুদ্ধটা এবার করতে হবে ঘরে থেকে। পরিচ্ছন্ন থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। নববর্ষও তাই পালন করতেই হবে ঘরে বসেই। এবারের বৈশাখে বাঙালির চিরাচরিত উপাদান উদযাপনে না থাকলেও ঘরে বসেই যে কাটাতে হবে তেমনটি নয়। এই বৈশাখ কিন্তু আমাদের পারিবারিক বন্ধন আরো দৃঢ় করার কথাই বলছে। করোনাকালে এই বৈশাখ বলছে ঘরে থাকার।

কবি গুরু অবশ্য বর্ষা নিয়ে ‘ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’ যে চরণ লিখেছিলেন তা আজ আমাদের জীবন বাঁচাবার এক মহৌষধরুপে আবিষ্কৃত হয়েছে। বৈশাখেও তাই বর্ষা এসে আহ্বান করছে ঘরে থাকার।

বৈশাখের মূল আনন্দ বৈশাখী মেলা, মঙ্গলশোভাযাত্রা হলেও জাতীয় পর্যায়ে এবার দেশকে বাঁচাবার তাগিদে রমনার বটমূলে ছায়ানটের হাজারো কণ্ঠে বৈশাখী গান কিংবা আমাদের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলশোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও আমাদের মন কিন্তু একেবারেই অনুজ্জ্বল হয়ে যায়নি। কেননা এই যুদ্ধটা বাঁচার জন্য।
মন আনচান করলেও আজ কিন্তু স্বাধীনতা প্রমাণেরও দিন। স্বাধীনতা তো সেটাই যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এই স্বাধীনতা শুধুই বাঁচার জন্য।

দেশকে বাঁচাবার জন্য বিশাল জনসমাগম বন্ধ করতে স্থগিত করা হয়েছে বৈশাখের সব আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গলশোভাযাত্রা এবার না থাকলেও রীতি অনুসারে প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলা বর্ষবরণের পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে অনলাইনে।

কেননা এবারের আনন্দ উদযাপন হবে ঘরে ঘরে। সেই সাথে ঘরের বাইরে না গিয়ে পরিবার পরিজনদের নিয়ে মৌসুমি ফলমূল খেয়েই বৈশাখের আনন্দ উপভোগ করতে দেশবাসীকে একযোগে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বাঙালিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে করোনাকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য অনুরোধ করেন। বৈশাখের রাখাল হয়ে তিনিও বলেছেন, যে আঁধার আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরেছে, তা একদিন কেটে যাবেই। বৈশাখের রুদ্ররূপ আমাদের সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করে। মাতিয়ে তোলে ধ্বংসের মধ্য থেকে নতুন সৃষ্টির নেশায়।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তাই এ বছর ডিজিটাল পদ্ধতিতে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হচ্ছে। বৈশাখী সকল আয়োজন তাই আজ সরকারি ও বেসরকারি সব টেলিভিশনে একযোগে সম্প্রচার করা হবে।

বিশ্বব্যাপী যত বাঙালি আছেন সবাই এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলা নববর্ষকে পেয়েছেন, যখন বিশ্বে আনন্দ উৎসবের পরিস্থিতি নেই। আজ অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলা বছরের এই প্রথম দিনটি উদযাপন করছেন বাঙ্গালিরা।

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের আগে সরকার থেকে পান্তা-ইলিশে নিরুৎসাহিত করা হলেও আমরা গা ছাড়া ভাব নিয়ে যে হুড়োহুড়ি শুরু করি ইলিশ নিয়ে এবার সেটি কিন্তু হচ্ছে না। তবে এবারই প্রথম আমরাও বুঝে গেছি বেঁচে থাকাটা কতটা জরুরি। আমরা এও জেনে গেছি, ‘বেঁচে থাকলে জীবনে বহু পহেলা বৈশাখ আসবে’। বহু পহেলা বৈশাখ আমরা উদযাপন করতে পারব। তার জন্য আগে বাচতে হবে। আর বাঁচার জন্য চাই ঘরে থাকা।

ফজলুল হক পাভেল
চিত্রশিল্পী ও সাংবাদিক

ঢা/এফএইচপি

(Visited 5 times, 1 visits today)