বিয়ে নিয়ে যত কথা

  •  
  •  
  •  
  •  

ইমরান রাইহান :


একজন পরামর্শ দিলেন, বিয়ে করবেন ভেবেচিন্তে। যোগ্য একজন মেয়ে খুঁজে নিবেন। যিনি আপনার কথা বুঝতে পারবেন। পরামর্শ যিনি দিয়েছেন তিনি আমার প্রতি আন্তরিক। পরামর্শটাও দিয়েছেন আমার ভালোর জন্যই। সমস্যা হলো, তিনি ধরে নিয়েছেন বিয়ের পর আমি বউয়ের সাথে হিব্রু ভাষায় কথা বলবো। যে কথা বউ বুঝবে না সেই কথা বউকে বলারই বা কী দরকার। আর বউ কিছু বুঝবে না এটাই বা কেমন কথা? বউরা তো সবই বুঝে। চেহারা দেখেই বলে দিতে পারে সব। আরেকজন পরামর্শ দিলেন, ভাই একটু শান্ত মেয়ে দেখে নিবেন। অনেক মেয়ে আছে খুব রাগী। স্বামীকে একেবারে করায়ত্ত করে রাখে। এইটাও তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ না। একটু-আধটু করায়ত্ত থাকলে কী এমন অসুবিধে। আলাউদ্দিন কাসানির মতো জগদ্বিখ্যাত ফকিহও তো স্ত্রীর কথার এদিক-সেদিক করতেন না। আলাউদ্দিন কাসানি। হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ বাদায়িউস সানায়ে’র লেখক। মূলত এই গ্রন্থটি হলো তার উস্তাদ ও শ্বশুর মুহাম্মদ সমরকন্দীর লেখা তুহফাতুল ফুকাহা গ্রন্থের ব্যখ্যাগ্রন্থ। তার বিয়ের মোহরই ছিল এই গ্রন্থটি। স্ত্রী ফাতেমা ছিলেন ফিকাহশাস্ত্রে দক্ষ। আলাউদ্দিন কাসানিও স্ত্রীকে সম্মান করতেন। আলাউদ্দিন কাসানি বসবাস করছিলেন হালাবে। স্ত্রী বললেন, চলুন, আমরা কাসান ফিরে যাই। আলাউদ্দিন কাসানি মেনে নিলেন এই আবদার। সংবাদ পেয়ে চমকে গেলে সুলতান নুরুদ্দিন জেংগি। ডেকে নিলেন আলাউদ্দিনকে। বললেন , এ হতে পারে না। আপনি এখানেই থাকুন। আলাউদ্দিন কাসানি বললেন, আমার স্ত্রী এখানে থাকতে চাচ্ছেন না। তিনি আমার উস্তাদের মেয়ে। আমি তার ইচ্ছার বিরোধিতা করব না। সুলতান একজন মহিলাকে পাঠালেন ফাতেমা বিনতু মুহাম্মদ সমরকন্দীর কাছে। শেষে ফাতেমা রাজি হলেন হালাবে থাকতে। আলাউদ্দিনও আর নড়লেন না। হালাবেই থেকে গেলেন মৃত্যু পর্যন্ত। (১)

আলাউদ্দিন কাসানির ঘটনা থেকে বুকে বল পাচ্ছি। মানে একটু-আধটু বউয়ের ন্যাওটা হওয়া মন্দ কিছু নয়। এখন কথা হলো বউ স্বামীর ন্যাওটা হবে কিনা তা বুঝা যাচ্ছে না। উস্তাদ তানভীর আহমেদকে এ প্রশ্ন করে সদুত্তর পাইনি। কিন্তু বেশি ন্যাওটা হলেও সমস্যা। পড়াশোনা লাটে উঠবে। এমনিতেই বিশরে হাফি বলে গেছেন, ذُبِحَ العلم على أفخاذ النساء । কী কঠিন আরবীরে বাবা। তরজমা করলে আইডি থাকবে না। কাছাকাছি ধরণের কথাই বলেছেন ইমাম সুফিয়ান সাওরিও। তিনি বলেছেন, مَنْ أَحَبَّ أَفْخَاذَ النِّسَاءِ، لَمْ يُفْلِحْ. । (২) এটাও তরজমা করার সাহস পাচ্ছি না। এর চেয়ে আবু নসর সিযযির কথাটাই বলা যাক। তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এক মহিলা। জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমি সিজিস্তান থেকে বের হয়েছি ইলমের জন্য। এখন বিয়ে করলে তালিবুল ইলমের খাতা থেকে আমার নাম বাদ পড়বে। (৩)

এটুকু শুনেই যারা ভয়ে কেঁপে উঠেছেন তাদের বলছি, ভয়ের কিছু নেই। বিয়ের পরেও ব্যাপক পড়াশোনা করেছেন এমন উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। বিদায়াতুল মুজতাহিদ গ্রন্থের লেখক ইবনে রুশদের কথাই ধরা যাক। তার জীবনিতে এসেছে, জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর শুধু দুইটি রাতে তিনি পড়াশোনা বাদ দিয়েছিলেন। একটি তার পিতার মৃত্যুর রাত। অপরটি তার বাসর রাত। (৪)

কিন্তু কথা হলো বউ আপনাকে পড়তে দিবে কিনা কে জানে। এমনিতেই মাহমুদুদ্দৌলা ইবনে ফাতিকের বউ ছিল তার উপর ক্ষেপা। ইবনে ফাতিক সারাদিন বই পড়তেন, বউকে সময় দিতেন কম। স্বামী জীবিত থাকতে কিছু বলতে পারেননি। স্বামী মারা গেলে সব বই ফেলে দিয়েছেন হাউজের পানিতে। (৫) দেখা যাচ্ছে ‘পড়ুয়া মেয়েটিকে বধুয়া করো’ শ্লোগান যারা দিচ্ছেন তারা আমাদের কাছে কিছু কিছু বিষয় আড়াল করছেন। বধুয়া আর পড়ুয়ার আলাপ বাদ। মুজতবা আলী যে পয়লা রাতে বিড়াল মারতে বললেন, সেটার কী হবে? সম্ভবত এটা কোনো কাজের কথা নয়। কারণ, প্রতিদিন এত মানুষ বিয়ে করার পরেও রাস্তাঘাটে এখনো এত বিড়াল দেখা যাচ্ছে কীভাবে?

আধুনিক গবেষকদের অনেকের মতে, জীবনের সবচেয়ে চ্যাতা সময় হলো যখন বিয়ের জন্য কথাবার্তা শুরু হয়। সেটা নাকি অন্য এক জগত। পরে একদিন সেই জগত থেকেও আমরা ঘুরে আসবো।


বিয়ে করতে কমবেশি সবাইই আগ্রহী। এমনকি যারা করে ফেলেছেন তারাও বিয়ে নিয়ে লেখা পড়তে আগ্রহী। কিন্তু বিয়ে করা কি এতই সহজ? আমাদের সমাজে বিয়ে মানে কাড়ি-কাড়ি টাকার খেলা। এজন্য তরুণ তুর্কীরা এক কদম আগায় তো দশ কদম পেছায়। তবে সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের মত শ্বশুর পেলে বিয়ে করা সহজই হয়ে যায়। সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, আলি ইবনুল মাদিনী যার সম্পর্কে বলেছেন, তাবেয়ীদের মধ্যে এত প্রশস্ত ইলমের অধিকারী আর কাউকে চিনি না। কাতাদাহ বলেছেন, আমি তার চেয়ে বড় কোনো আলেম দেখিনি। সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, অসামান্য সাহসিকতার অধিকারী এই তাবেয়ী কখনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। জাবির বিন আসওয়াদ যখন আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইরের পক্ষে বাধ্যতামূলক বায়াত নেয়া শুরু করেন, তখন সাইদ কঠোরতার নিন্দা জানান। পরিনামে জাবির তাকে বেত্রাঘাত করেন। তখনো তিনি হকের পক্ষে অনড় ছিলেন। জাবিরের ছিল চার স্ত্রী, পরে এক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ইদ্দত চলাকালীন পঞ্চম স্ত্রী গ্রহণ করেন, যা ছিল স্পষ্ট হারাম। সাইদ নির্যাতিত অবস্থাতেও এই অনাচারের প্রতিবাদ করেন। এই সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব তার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন তার ছাত্র আবু ওয়াদাআর কাছে। আবু ওয়াদাআর প্রথম স্ত্রী ইন্তেকাল করেন। এই কারনে তিনি কয়েকদিন দরসে অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি দরসে উপস্থিত হলে সাইদ নিজের মেয়ের সাথে তার বিয়ে দেন। আবু ওয়াদাআ আর্থিকভাবে দুর্বল ছিলেন। কিন্তু সাইদ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের মেয়েকে তুলে দেন তার হাতে। মেয়েও যেমন তেমন মেয়ে নয়। আবু ওয়াদাআ নিজের স্ত্রী সম্পর্কে বলেছেন, আমার সৌভাগ্য আমি এমন স্ত্রী পেয়েছি যিনি হাফেজা এবং হাদীস শাস্ত্রেও পারদর্শী। সৌন্দর্যেও অতুলনীয়া। সাইদের এই মেয়ের জন্য উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের ছেলে ওয়ালিদের বিবাহের প্রস্তাব এসেছিল। সাইদ তা ফিরিয়ে দেন। (৬)

এই সুযোগে আমরা একটু সিরিয়াস আলাপ করে ফেলি। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের ছেলের প্রস্তাব সাইদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে ওয়ালিদের বিশেষ যোগ্যতা ছিল দুটি। প্রথমত, তিনি মুসলিম বিশ্বের যুবরাজ। দ্বিতীয়ত, তিনি ‘বড় আলেমের ছেলে’ (সহজ ভাষায় বলতে গেলে সাহেবজাদা)। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা কথা থাকতে পারে কিন্তু ইলমি দুনিয়ায় তিনি যে শাহেনশাহ ছিলেন তাতে কারো দ্বিমত নেই। তার সম্পর্কে ইবনু উমর বলেছেন, মারওয়ানের ছেলে একজন ফকিহ। তোমরা তাকে প্রশ্ন করো (অর্থাৎ মাসআলা জিজ্ঞেস করো) (৭)। তো এমন একজন পিতার সন্তান হিসেবে ওয়ালিদ বাড়তি সুবিধা পাবেন এটাই স্বাভাবিক ছিল। সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব যেহেতু দুনিয়াদার নন, তাই হয়তো যুবরাজের প্রতি আগ্রহ দেখাননি এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ‘বড় আলেমের ছেলে’ হিসেবে তো ওয়ালিদ এগিয়ে ছিল। কিন্তু সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব এটাকেও গুরুত্ব দেননি। আমাদের সমস্যা দুইটাই। পয়সাওয়ালা দেখলেই আমরা চমকে যাই। আমাদের অবস্থান হলো, টাকা-পয়সা আছে? ওকে বিয়ে দাও। পরে দোয়া করবো যেন দ্বীনদার হয়ে যায়। অনেকে এই পয়েন্টে বেঁচে যান কিন্তু তারা ধরা খান শেষে এসে। বড় আলেমের ছেলে এই কারণে মেয়ে তুলে দেন ‘বড় আলেমের অযোগ্য ছেলে’র হাতে।

একজন অবিবাহিত হয়ে এতসব ভারী ভারী আলাপ করছি, কাজটা বেমানান। আমি নিজেই লজ্জিত। তবু সামান্য কয়টা লাইক-কমেন্টের লোভে এসব লেখতে হচ্ছে। চলুন এবার হালকা আলাপে যাই। হালকা আলাপের সারকথা হলো বিয়ে করে ফেলুন। অশান্তি লাগছে? বিয়ে করুন। অর্থাভাবে আছেন? বিয়ে করুন। ফেসবুকে বেশি সময় নষ্ট করছেন? বিয়ে করুন। এই লেখাটা ভালো লাগছে? বিয়ে করুন। বিয়ে করা মানে আরেকজনের দায়িত্ব নেয়া (এটা অবশ্য আমি বলার আগ থেকেই আপনারা জানেন। আমি বললাম ফরমালিটি রক্ষা করার জন্য)। আসল কাহিনী কিন্তু বিয়ের পরেই। সব কাজ করতে হবে উনাকে খুশি করে। উনি বেজার হলেই সব শেষ। আবার উনি খুশি হবেন কী করে তা বোঝাও কঠিন। আপনি যেটাকে উত্তম ভাবছেন, তিনিও সেটাকে উত্তম ভাববেন এমন কোনো কথা নেই। মাইসুন বিনতু বাহদালের কথাই ধরা যাক। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন শামের মুক্ত প্রকৃতিতে। হযরত মুয়াবিয়া (রা) শামে এলে মাইসুনকে বিবাহ করেন। তার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। কিন্তু মাইসুন বিনতু বাহদাল এই প্রাসাদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তার মনে হত দম বন্ধ হয়ে আসছে। (৮)
সুতরাং, হে যুবক, তোমাকে (এবং আমাকেও) হতে হবে সতর্ক। বুঝতে হবে অপরজনের মনস্তত্ব। অপরজনের মনস্তত্ব না বুঝে অযথাই অভিযোগ করা যাবে না। মনস্তত্ব না বুঝলে অযথাই কষ্ট পেতে হবে। কষ্ট পেয়েছিলেন খলিফা মুতাযিদ বিল্লাহও। বাসররাতে নববধু কতরুন নাদা তাকে রেখে চলে আসেন কামরার বাইরে। মাঝরাতে খলিফার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাশে স্ত্রীকে না পেয়ে অবাক হন তিনি। উঠে দেখেন স্ত্রী পাশের কামরায়। প্রশ্ন করতেই স্ত্রী জানালেন, আমি পাশে থাকলে যদি আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, এই জন্য উঠে এসেছি (৯)। খলিফা শান্ত হলেন।

কিন্তু আমাদের অশান্ত মনে ঠিকই ঘুরঘুর করছে একটা প্রশ্ন। খলিফা কেনো বাসর রাতে ঘুমাতে গেলেন? আমরা হলে তো ইমরাউল কায়েসের কবিতা পড়তাম, ইয়া লাইলু তুল, ইয়া নাউমু যুল (রাত লম্বা হ, ঘুমের বাচ্চা ঘুম ভাগ)। খলিফাকে বাসরঘরে রেখে আমরা একটু ভিন্ন আলাপে যাই। বাসরঘর শুনলেই যারা শিহরিত হয় সেইসব তরুণদের বলছি, সেখানে কিন্তু বিপদের আশংকাও আছে। বহুবার এই ভূমিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, আরবী বইয়ের উপর বাংলা বই রাখা জায়েজ আছে কিনা?


কলেজে পড়ার সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। একরাতে স্বপ্নে দেখলাম আমার বিয়ে হচ্ছে। গাড়িতে করে নববধু সহ কোথাও যাচ্ছি। ঘুম থেকে উঠার পর মেয়েটার চেহারা চোখে ভেসে রইলো। এই মেয়েকে কখনো দেখিনি, পরিচিত কেউও নয়, কিন্তু স্বপ্নে দেখা মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলাম। কয়েকদিন খুব বিষন্ন ছিলাম। ক্লাস বাদ দিয়ে আটি আর ওয়াশপুর গিয়ে একা একা হাটাহাটি করলাম। খুবই অদ্ভুত ব্যাপার। যাকে দেখিনি কখনো, যার অস্তিত্বই নেই, তার প্রেমে পড়ে গেলাম। ব্যাপারটা কখনো কারো সাথে শেয়ার করিনি। লোকে পাগল ভাববে, এই ভয়ে। তখন জানা ছিল না, ইবনু হাযম আন্দালুসি প্রায় এক হাজার বছর আগে এ বিষয়ে লিখে গেছেন। তিনি প্রেম-ভালোবাসার নানা প্রকারের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, প্রত্যেক ভালোবাসার জন্য একটি যৌক্তিক কারণ আবশ্যক। কিন্তু কখনো এর ব্যতিক্রমও ঘটে। আমি নিজে এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ না করলে তা উল্লেখ করতাম না। এরপর তিনি আবুস সারা আম্মার বিন যিয়াদের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একদিন ইবনু হাযম গেলেন আবুস সারা আম্মার বিন যিয়াদের সাথে দেখা করতে। তিনি দেখলেন আবুস সারা খুব চিন্তিত ও বিষণ্ণ। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, কিছুদিন আগে এক মেয়েকে স্বপ্নে দেখেছি। ঘুম থেকে উঠার পর দেখি তার ভালোবাসা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অথচ আমি তাকে চিনিও না। ইবনু হাযম বললেন, আপনি নিজেকে এমন বিষয়ে জড়িয়ে ফেলছেন যার কোনো বাস্তবতাই নেই।(১০)

স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরে আসা যাক। স্বপ্ন তো নানারকমের হয়। একটা হলো ঘুমের স্বপ্ন। আরেকটা হলো জেগে থেকে দেখা স্বপ্ন। বিয়ে নিয়েও মানুষের মনে থাকে নানা স্বপ্ন। বউ কেমন হবে না হবে, এসব আর কী। বিয়ে সংক্রান্ত সব স্বপ্নের মূলকথা কিন্তু একটাই, মনের মত বউ চাই। মনের মত বউ পেয়েছিলেন তাবেয়ী শুরাইহ বিন হারেস বিন কাইস আল কিন্দি। বিয়ে করেছিলেন বনু তামিমের মেয়ে যয়নবকে। বিশ বছর সংসার করে তিনি বলেছেন, যয়নবের সাথে সংসার করে প্রতিদিন আমি আগেরদিনের চেয়ে বেশি আনন্দিত ছিলাম। বিশ বছরে কখনো আমি তার উপর রাগ করিনি (অর্থাৎ সে এমন কোনো কাজ করেনি যাতে আমি ক্রোধান্বিত হব)। একবার তার উপর রাগ করেছিলাম, কিন্তু সেদিনও তার কোনো দোষ ছিল না। এরপর শুরাইহ কবিতা আবৃত্তি করেছেন, আমি দেখি লোকেরা তাদের স্ত্রীকে প্রহার করে। আমি যদি যয়নবের গায়ে হাত তুলি তাহলে আমার ডান হাত অবশ হয়ে যাক। (১১)

শুরাইহ’র কথা শুনে কারা কারা বিয়ের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, দাঁড়িয়ে যান, দু’হাত তুলে দেখান।

বিয়ে আসলে মজার জিনিস। ঠিক কতটা মজার সেটা তো বিয়ে না করে বোঝানোর উপায় নেই। বাকি বিয়ে করেছেন এমন একজনের কথা শোনা যাক। আহমদ বিন তৈয়ব সারাখসি নামে এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দুনিয়ার মজা কিসে? তিনি সরাসরি বলে বসেছেন,

لذات الدنيا ثلاث: أكل اللحم، وركوب اللحم، وإدخال اللحم في اللحم

উফ কী ভয়ংকর কথাবার্তা। মোবাইল পর্যন্ত গরম হয়ে গেছে। এই কথা শুনে এক কবি আবার কবিতাও বানিয়ে ফেলেছে।(১২)

ألم تر لذّة الدّنيا ثلاثاً … إليها مال كلٌّ بالطّباع
فذلك كلّها في اللّحم توجد … بأكلٍ أو ركوبٍ أو جماع

যাক, আমরা নীরস মানুষ। এইসব কবিতার সাথে আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই। আমরা বরং আগের আলোচনাতেই ফিরে যাই। মনের মত বউ। মনের মত বউ পাবেন কিনা, আর পেলে আপনি তার মনের মত স্বামী হতে পারবেন কিনা এ বিষয়ে বিজ্ঞজনরা নীরব। এ প্রশ্ন উঠলেই তারা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসেন। ‘আরো কত দরকারি কাজ আছে সে সব বাদ দিয়ে এই আলোচনা কেন?’ বলে তারা সবকিছু উড়িয়ে দিতে চান। তাদের নীরবতা আমাদের আতংকিত করে , কিন্তু একইসাথে আমরা সবাইই দিল্লির লাড্ডু খেয়ে পস্তাতে আগ্রহী, না খেয়ে সান্ত্বনা নিতে আমাদের কোনো আগ্রহই নেই।

মনের মত বউ পেয়ে তাকে রানী করবেন বলে যারা ভাবছেন তারা হয়তো নুরজাহানের কথা ভুলে গেছেন। ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের এক কর্মকর্তার মেয়ে। যৌবনের শুরুতে কাবুলে শাহজাদা জাহাংগিরের সাথে দেখা। এরপর তো ইরাবতি আর যমুনায় অনেক জল গড়ালো। নুরজাহানের বিয়ে হলো। স্বামীর সাথে বাংলায় এলেন। স্বামী নিহত হলেন, এতে জাহাংগিরের হাত থাকুক বা না থাকুক, ফলাফল হিসেবে হিসেবে নুরজাহান উপস্থিত হলেন মুঘল হেরেমে। বিয়ে হলো জাহাংগিরের সাথে। ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের কতৃত্ব বুঝে নিলেন নুরজাহান। দেখা গেল সম্রাটের আড়ালে থেকে সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন তিনিই। যুবরাজ খুররম বিদ্রোহী হয়ে উঠলে তাকে দমনের জন্য সম্রাটের সাথে থাকলেন নুরজাহান। খুররমের সাথেও ছিলেন আরেক নারী। যিনি সারাজীবন স্বামীর সাথে প্রতিটি সফরে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি, ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে, খুররম ততদিনে সম্রাট শাহাজাহান, স্বামীর সাথে তিনি চলে গেলেন বোরহানপুর। লড়াই হচ্ছিল সেখানে আর তিনি ছিলেন গর্ভবতী। গ্রীষ্মের প্রখর রোদ, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, শারিরিক দূর্বলতা সবকিছু ভুলে গিয়ে জেদ করেই তিনি স্বামীর সাথে ছিলেন এই সফরে। এই সফরেই তিনি মারা যান, চৌদ্দতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে। তিনি মমতাজ মহল। বাল্যকালে মিনাবাজারে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন শাহজাহান। (১৩)

মেলা কথা হচ্ছে। সব কথা একদিনে বলার দরকার কী? বাকি কথা আরেকদিন।

সূত্র
—————
১। সাল্লাবি, আলি মুহাম্মদ, আদ দাওলাতুয যিংকিয়্যাহ, পৃ-৩২, (কায়রো, দার ইবনিল জাওযি)
২। যাহাবী, শামসুদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমাদ বিন উসমান (মৃত্যু ৭৪৮ হিজরী), সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/২৫৮, (বৈরুত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৭ হিজরী)
৩। শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (মৃত্যু ১৪১৭ হিজরী), আল উলামাউল উযযাব, পৃ- ৬৩, (হালাব, মাকতাবাতুল মাতবুয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, ১৪০২ হিজরী)
৪। যাহাবী, শামসুদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমাদ বিন উসমান (মৃত্যু ৭৪৮ হিজরী), সিয়ারু আলামিন নুবালা,২১/৩০৮, (বৈরুত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৭ হিজরী)
৫। ড. ইয়াহইয়া ওহাইব জুবুরি, আল কিতাব ফিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ-২৯৫ পৃষ্ঠা, (বৈরুত, দারুল গরবিল ইসলামি, ১৪১৮ হিজরী)
৬। যাহাবী, শামসুদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমাদ বিন উসমান (মৃত্যু ৭৪৮ হিজরী), সিয়ারু আলামিন নুবালা,৪/২৩৪, (বৈরুত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৭ হিজরী)
৭। প্রাগুক্ত ৪/২৪৭
৮। আহমদ খলিল জুমআ, নিসাউন ফি কুসুরিল উমারা, পৃ-৫৪৩ পৃষ্ঠা, (দিমাশক, দারুল ইয়ামামা, ১৪২১ হিজরী)
৯। প্রাগুক্ত, পৃ-৪৫১
১০। আন্দালুসি, আবু মুহাম্মদ আলি বিন আহমাদ বিন সাইদ বিন হাযম (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরী), তওকুল হামামাহ, পৃ-১৯, (মিতবাআহ হিজাজি, ১৩৬৯ হিজরী)
১১। ইবনু আসাকির, আবুল কাসেম আলি বিন হাসান ইবনু হিবাতিল্লাহ বিন আবদিল্লাহ শাফেয়ী (মৃত্যু ৫৭১ হিজরী), তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ২৩/৫৩, (বৈরুত, দারুল ফিকর, ১৪১৫ হিজরী)
১২। কাযভিনি, যাকারিয়া বিন মুহাম্মদ বিন মাহমুদ (মৃত্যু ৬৮২ হিজরী), আসারুল বিলাদ ওয়া আখবারুল ইবাদ, পৃ-৩৯০, (বৈরুত, দার সাদের)
১৩। দেহলভী, শামসুল উলামা মৌলভী মুহাম্মদ যাকাউল্লাহ, তারীখে হিন্দুস্তান, ৭ম খন্ড, (দিল্লি, শামসুল মাতাবি, ১৮৯৭)

এপ্রিল ৫, ২০১৯ ২:১৯

(Visited 18 times, 1 visits today)