বিমানে বিজনেস ক্লাস

আশরাফ আলম : বিমানে বিজনেস ক্লাস বলে একটা ব্যাপার আছে।

আমার বিজনেস ক্লাসের প্রথম অভিজ্ঞতা গত বছর সিল্ক এয়ারে সিঙ্গাপুর থেকে চীনে যাওয়ার সময়।

সত্যি বলতে কি আমার কাছে আহামরি কিছুই মনে হয়নি। ইকোনমি ক্লাসের তুলনায় সীটের আকার কিছুটা বড় এই যা। এই কারণে পাঁচগুণ দামে টিকেট কেনা উন্মাদনার পর্যায়ে পড়ে।

সম্ভবত এই কারণেই মাইক্রোসফটের প্রথম দিকে স্বয়ং বিল গেটসও ইকোনমি ক্লাসে করে বিভিন্ন মিটিং এ যেতেন।

বিমানে বিজনেস ক্লাসে যাবার পেছনে দু’টো ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে।

এক, অবশ্যই নিজের টাকায় টিকেট কাটা যাবে না।

বিমান ভ্রমণ এমনিতেই খুব ব্যয়বহুল। বড় চেয়ারের জন্য পাঁচগুন দাম? কাভি নেহি! ইকোনমি ক্লাসের অর্ধেক দামে স্ট্যান্ডিং সার্ভিস আছে কিনা কন।

বিজনেস ক্লাস অফিস স্পন্সর করলে আলাদা কথা।

যাই হোক, এ সংক্রান্ত দ্বিতীয় নিয়ম হলো, এয়ার পোর্টের ক্লাব লাউঞ্জ মিস করা যাবে না।

গতবার ব্যস্ততার কারণে ক্লাব লাউঞ্জ মিস করেছি।

এবার ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে করে লন্ডন যাচ্ছি। ইমেগ্রেশন পার হয়ে হাতে বেশী সময় ছিলনা।

তবু ভাবলাম, ক্লাব লাউন্ডটা ঢুঁ মেরে যাই। কি আর হাতি ঘোড়া হবে, বড়জোর কফিকে চুমুক দেয়া যাবে।

ঢোকার পর একটা ছোট খাটো ধাক্কা খেলাম।

মোটামুটি এলাহী ব্যাপার।

আরামদায়ক বসা ও ঘুমানোর জায়গা, খাওয়া দাওয়া, এমনকি গোসল করার সুব্যবস্থাও আছে।

সবাই খুব আয়েশী ভঙ্গিতে ঘোরাঘুরি করছে।

ডিনার বুফেটে খাবার নিতে গিয়ে দেখি অফিসের সহকর্মী ডেভিড। আমাকে দেখে উৎফল্লিত হয়ে বললেন, বাহ, তুমি এসেছ ভালো হয়েছে।

ডেভিডকে আমার বেশ ভালোই লাগে। খুব হাসিখুশী, পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। বয়স হয়েছে, তবু স্ত্রীর প্রতি প্রেম কমেনি। বেশীদিন বাইরে থাকতে পারেন না।

খাবার নিয়ে বসতেই ডেভিড গল্প শুরু করে দিলেন।

লাউঞ্জে আসার সময় একজন মহিলা এক হাতে ব্যাগ, আরেক হাতে তার কয়েক বছরের মেয়েটিকে নিয়ে খাবি খাচ্ছিলেন।

মহিলা সে অবস্থায় তাঁকে অনুরোধ করলেন, তার মেয়েটিকে একটু ধরতে পারবে কিনা।

ডেভিড খানিকটা আবেক্রান্ত হয়ে বললেন, জানো আশরাফ, অনেকদিক পর ছোট একটি হাত আমার হাতের আঙ্গুল ধরলো।

দু’টো মেয়ে আছে ডেভিডের, মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়েছে, দু’জনেই আলাদা থাকতে শুরু করেছে।

এয়ারপোর্টে সম্পূর্ণ অচেনা একটি শিশু ডেভিডকে নিয়ে গিয়েছে তার সবচাইতে প্রিয় একটি স্মৃতিতে।

এর মধ্যেই অনবোর্ডিয়ের ডাক পড়ে গেছে। ডেভিডের মধ্যে তাড়াহুড়ো নেই।

সে গল্প করছে তার দীর্ঘতম ফ্লাইটের কথা, হিথ্রোতে তুষার ঝড়ের কারণে নিউইয়র্ক দিয়ে ঘুরে এসেছে সেই গল্প, তার কোন এক বন্ধু এতো বেশী ট্রিপ দিয়েছে যে একবার সরাসরি প্রথম শ্রেণীতে আপগ্রেড হয়ে গেছে সেই গল্প।

বয়স হলে মানুষ সম্ভবত গল্প করতে পছন্দ করে। একজীবনের অনেক গল্প থাকে, সেই গল্প বলতে ইচ্ছে করে কাউকে।

ডেভিডের গল্পগুলি শুনতে ভালোই লাগে।

তার মতে বিজনেস ক্লাসের মধ্যে সেরা হলো, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ টেনে টুনে পাশ করতে পারে। এ কারণে, একজন ব্রিটিশ হিসেবে ক্ষমা প্রার্থণাও করলেন।

একারণেই প্লেনে ওঠার সময় খুব অল্প এক্সপেকটেশন নিয়ে উঠলাম।

সমস্যা একটাই সিঙ্গাপুর থেকে লন্ডন দীর্ঘ ফ্লাইট।

এর আগে হল্যান্ড থেকে সিয়াটলে ১০ ঘন্টার ফ্লাইট ছিল। চরম বিরক্তিকর অবস্থা।

এবারের যাত্রা ১৪ ঘন্টার।

সময় কাটানোর জন্য নেটফ্লিক্সে অনেককিছু ডাউনলোড করে নিয়েছি, তাতেও খুব বেশী ভরসা নেই।

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিজনেস ক্লাস নিয়ে ডেভিড যেভাবে বলেছিলেন, সেরকম কিছুই দেখলাম না।

এয়ারহোস্টেসদের ব্যবহার খুব ভালো। বয়স একটু বেশী, এ জন্য মাতৃভাব প্রবল। সমস্যা কি।

সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সের এয়ার হোস্টেসরা তরুণী, বিজ্ঞাপনের মডেলদের মতো দেখতে। ডেভিড এদিকটা ভেবে ক্ষমা চেয়েছিলেন কিনা জানি।

এটা অবশ্য গুরুতর সমস্যা না। ইন ফ্যাক্ট আমার স্ত্রী জানলে খুশী হয়ে ভবিষ্যতের যাবতীয় ট্রিপ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজেই করাবে। ডাইরেক্ট ফ্লাইট না থাকলে দরকার হলে, পপুয়া নিউ গিনি দিয়ে ট্রাঞ্জিট করাবে।

সিল্ক এয়ারের তুলনায় ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজের বিজনেস ক্লাসে অনেক বেশী জায়গা। সত্যি বলতে কি সামনে পেছনে সাধারণ দু’টো সীটের পরিমাণ। খুব সহজে হাত পা ছড়িয়ে বসা যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করলাম, একটা বাটন টিপে পাশে একজন সীটটাকে বিছানা বানিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে সটান শুয়ে পড়লেন।

রাতের ফ্লাইট। বিমান আকাশে ওঠার পর, খাওয়া দাওয়া, কিছুক্ষণ মুভি দেখে আমিও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

ঘুম আসতে আসতে মনে হলো, দীর্ঘ আকাশ ভ্রমণে বিজনেস ক্লাস ব্যাপারটা আসলে খারাপ না!

(লেখাটি বিমানে বসেই লেখা।)

ঢা/এমএম

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )