বিজ্ঞানীরা ব্যবসায়ী হয় না

আজাদুল হকঃ আমার প্রয়াত খালাত ভাই প্রখ্যাত জীন বিজ্ঞানী ডঃ মাকসুদুল আলম পাটের জীন নিয়ে গবেষণা করার আগে তখনকার কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে শর্ত দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর কাজে সফল এবং শেষ না করার আগে মাত্র তিনজন ব্যক্তি জানতে পারবে এর কথা।

কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, যিনি প্রথম থেকেই তাঁর কাজের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, মাকসুদ ভাই আর মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর বাইরে কেউ জানতে পারবে না।

তিনি তাঁর কাজ শেষ করে, এর আনুষ্ঠানিকতা সফলভাবে সমাপ্ত করে যখন জানতে পারলেন যে এটা এখন প্রকাশিত হবে, তখন তিনি জানান এবং মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে তা সবার সামনে ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনা এই বিরল কৃতিত্বের এভাবেই সঠিক সম্মান জানানো হয়..

গবেষনাগারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের গবেষণা করা এক জিনিস, আর বাস্তবে তা মানুষের কল্যানের জন্যই হোক আর ব্যবসা করা জন্যই হোক, তা বাণিজ্যিকভাবে শিল্পে রূপান্তরিত করা খুব কঠিন। এই গবেষণার ক্ষেত্র ভীষণ প্রতিযোগীতামূলক। মাকসুদ ভাই হিউস্টনে গেলে তাঁর সাথে আমার দেখা হত। উনি বলতেন, কেউ জানে না উনি কোথায় কার সাথে দেখা করছেন।

কারণ উনি যে হিউস্টনে যাচ্ছেন এটাও তাঁর প্রতিদন্ধীদের জন্য অনেক বড় খবর। উনি যে ধরনের গবেষণা করতেন, তা একদিন আগে প্রকাশ করা আর একদিন পরে প্রকাশ করা মাঝে বিস্তর ফারাক। একটা কোম্পানীর স্টক যেমন বেড়ে যেতে পারে, ঠিক তেমনি আরেকটি কোম্পানী পথে বসে যেতে পারে এই ঘোষনায়। এজন্য চরম গোপনীয়তা রক্ষা করতে হয় এইসব ব্যাপারে।

বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম; 'পাটের জীন রহস্য' আবিস্কারক
বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম; ‘পাটের জীন রহস্য’ আবিস্কারক
এবার সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটা বাস্তব উদাহরণ দেই – কিছুদিন আগে মিডিয়াতে এসকায়েফ ফলাও করে বলল যে বাংলাদেশে তাঁরাই প্রথম করোনাভাইরাসের ওষুধ রেমডিসিভার বানিয়ে ফেলেছে..

তাঁরা এটা ছয় হাজার টাকা করে বিক্রী করবে। মিডিয়াতে তাদের প্রশংসা করে আকাশে তুলে ফেলল। আসলে তাঁরা তখন পরীক্ষামূলকভাবে কয়েক ব্যাচ বানিয়ে ওষুধ প্রশাষনের কাছে অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছে।

এর ঠিক কিছুদিন পর দেখা গেল বেক্সিমকো অনুমোদন পেয়ে শুধু যে বাণিজ্যিকভাবে রেমডিসিভার বানিয়ে ফেলেছে তা নয়, তা তাঁরা বিদেশে রফতানীও শুরু করেছে। আরেকটা ব্যাপার, তাঁরা ঘোষণা দিল যে সরকারী সব হাসাপাতালে তাঁরা বিনামূল্যে এই ওষুধ সরবরাহ করবে। তাঁরা তাদের প্রতিদন্ধীকে মাটিকে শুইয়ে দিল এই একটা ঘোষণা দিয়ে।

এরপর কিন্তু এসকায়েফের আর কোন খবর মিডিয়াতে আসেনি। তাঁরা কি অনুমোদন পেয়েছেন কিনা, বাণিজ্যিকভাবে বানাচ্ছেন কিনা এর কিছুই আর ফলাও করে তাঁরা বলেননি। ডঃ আসিফ মাহমুদ করোনাভিরাসের ভ্যাকসিন আবিস্কারের কথা মিডিয়াতে বলে তিনটা মারাত্বক ভুল করেছেন। তিনি বিজ্ঞানী মানুষ। তিনি হয়ত ব্যবসার মারপ্যাচ বোঝেননি। বুঝে থাকলে হয়ত এই ভুলগুলো করতেন না..

প্রথমত, গবেষণাগারে অন্য প্রানীর অপর প্রয়োগ এক ব্যাপার আর মানুষের ওপর প্রয়োগ করার অনুমোদন এবং তা সফল ভাবে করে এটা বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত করার অনুমোদন পাওয়া আরেক ব্যাপার। বিশ্বে অনেকগুলো কোম্পানী এই কাজ করছে। এটা মৌলিক কোন আবিস্কার নয়।

তবে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটিতেও যে এমন গবেষণা হয় তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের ব্যাপার। সেজন্য তাঁর বাহবা প্রাপ্য। কিন্তু তিনি এখন তাঁর পিঠে গোল লাল রঙের টার্গেট একে দিলেন তাঁর প্রতিদন্ধীদের জন্য। অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এটা গোপনে রাখলে তাঁর মঙ্গল হত।

দ্বিতীয়তঃ তিনি পুরো ব্যাপারটি অত্যন্ত গোপনে রেখে, প্রশাসনের সাথে হাত মিলিয়ে এক সাথে কাজ করে এর অনুমোদনের ব্যবস্থা করে, বাংলাদেশে এটা বানিজ্যিকভাবে প্রস্তুত, বিদেশে রফতানী করার অনুমতি, কোটি কোটি মানুষকে কিভাবে সরবরাহ করা যায় তাঁর একটা নীল নকশা প্রস্তুত এবং সম্মতি নিয়ে নিতে পারতেন। আশা করি এটা তিনি নিয়েছেন। কারণ তা নয়ত তাঁর প্রতিদন্ধীরা তাঁর আগেই এটা করে ফেলতে পারে।
ডঃ আসিফ মাহমুদ
ডঃ আসিফ মাহমুদ

তৃতীয়তঃ তিনি গবেষণা, ব্যবসা, দেশপ্রেম সব কিছুর সাথে ব্যক্তিগত অনুভুতি জড়িয়ে ফেলেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর চোখের পানি দেখে আমাদের সবার মন ভিজে উঠেছে ঠিকই। কিন্তু একজন বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি পুরো ব্যাপারটাকে ব্যক্তিগত করে ফেলেছেন।

এর সুফল যেমন আছে, ঠিক তেমনি এটা তাকে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে কিনা তাতে সন্দেহ আছে। জিলিয়াড যখন রেমডিভিসার আবিস্কারের কথা বলে বা জিএসকে যখন ভ্যাকসিন আবিস্কারের কথা বলে তখন সেটা সম্পূর্ন পেশাদারভাবে বলে এবং সেখানে অন্য কোন কিছু চিন্তা করার সুযোগ নেই।

এই ভ্যাকসিন আবিস্কার আসলেই একটা বিশাল ব্যাপার। আশা করি তাঁর সরল সহজ অভিব্যক্তি তাঁর এই অসাধারণ কাজকে ছায়ায় ফেলে দেবে না। ডঃ আসিফ মাহমুদ বাংলাদেশের গৌরব। তাদের মতন মানুষকে নিয়ে বই লেখা যায়। কিন্তু আমার খুব ভয় হয় যে তাকে কি আমরা অতি প্রশংসা করা বাক্সবন্দী করে ফেলছি কিনা।

এই ভ্যাকসিন তিনি আবিস্কার করেছেন এবং আশা করি মানুষের ওপর ক্লিনিকাল ট্রায়ালও সফল হবে, যা এক বছর বা বেশী লাগতে পারে। কিন্তু তিনি একা এটা প্রস্তুত করতে পারবেন কিনা বা বিনামূল্যে দেবার ব্যবস্থা করতে পারবেন কিনা তাতে আমার খুবই সন্দেহ আছে।

তাঁর মতন একজন বিজ্ঞানীর মন যেন না ভেঙে যায়। তাকে যেন দুঃখ করে এই কথা না বলতে হয়, “আমি এটা আবিস্কার করলাম ঠিকই কিন্তু মানুষের কাছে পৌছে দিতে পারলাম না”। আজ থেকে ছয়মাস বা এক বছর পর আবার আমরা ডঃ আসিফ মাহমুদকে দেখতে চাই। তখনও যেন তাঁর চোখে অশ্রু, তবে সেটা হোক আনন্দাশ্রু।

ডঃ আসিফ মাহমুদ, আপনাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

আজাদুল হক
আজাদুল হক

লেখক পরিচিতিঃ আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী তড়িৎ প্রকৌশলী; সাবেক কর্মী জনসন স্পেস সেন্টার – নাসা, হিউষ্টন, টেক্সাস।
[ঢা-এফ/এ]

(Visited 3 times, 1 visits today)