বিগত ছয় মাসে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমরা কি জানতে পেরেছি?

বিগত ছয় মাসে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমরা কি জানতে পেরেছি?

মুক্তমত ডেস্ক: ছয় মাস বিশ্ব করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। বিশেষজ্ঞগন মাত্র একটি বিষয়ে ঐকমতে আসতে পেরেছেন। আর তা হলো কিভাবে মানুষ সংক্রমিত হয়ে থাকে।

বিজ্ঞানীগন মনে করেন যে কোভিড-১৯ সব সময় দূষিত মেঝে থেকে সংক্রমিত হয়না। তবে সংক্রমিতজন সমাজ থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাইরের জগতে না আসলে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা নাই বললেই চলে।

এক্ষেত্রে বর্ধিত সময়ের জন্য সংক্রমিতজন অন্যদের কাছাকাছি আসা এবং অন্যদের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করা বড় অপরাধ বলে গন্য হওয়া উচিত। অবশ্যই জনস্বাস্থ্য আইন পরিপন্থী হবে। জনসমাগমে অনুষ্ঠান, আবদ্ধ (poor ventilation) আবাস বা যে সমস্ত যায়গায় মানুষ হৈচৈ বা উচ্চস্বরে গান পরিবেশন করে সে সমস্ত যায়গায় সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

এসব জানায় সরকার এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহ কৌশল অবলম্বন করতে সক্ষম হচ্ছে কি করে জীবন বাঁচানো যায় এবং জীবনের জন্য ঝুঁকিবিহীন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে স্বাভাবিক গতি আনায়ন করা যায়।

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহে এখন প্লেক্সিগ্লাস কাউন্টার স্থাপন করা হয়েছে। কারও সাথে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক পরিধান করে কথপোকথন হচ্ছে। যেখানে মানুষের আধিক্য রয়েছে সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কর্মস্থলে ঢুকতে প্রতিদিন স্ক্রীনিং হচ্ছে এবং তারপরেই প্রতিদিনের জন্য আলাদা করে কর্মস্থলে উপস্থিত সবাইকে একটি কালারের ডট পরিধান করতে হচ্ছে। তাতে সহজেই কো-ওয়ার্কার জানতে পারছে কর্মস্থল তার জন্য নিরাপদ কি-না।

কর্মস্থল, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ভিজিবল জায়গায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার রয়েছে। আমরা কোনো জায়গায় টাচ্ করলেই এখন হাত এ্যালকাহল রাব দিয়ে স্যানিটাইজ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাসায় ঢুকতে এবং বেরুতে নিজের পকেটে থাকা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছি।

পাবলিক ট্রান্সপোর্ট স্যানিটাইজেশনে অধিক হারে নতুন এম্পলয়মেন্ট হয়েছে। ট্রেইন, বাস এবং ফেরিতে কোন আসনে বসা যাবে তা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে নির্দেশিত করা রয়েছে। এসকল নির্দেশনা না মানলে জনস্বস্থ্য বিধি লংঘনের দায়ে বড় ধরনের জরিমানা এবং জেলও হতে পারে। শপিং সন্টারের কাউন্টারে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়াতে স্থান চিহ্নিত রয়েছে।

মোট কথা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রনে এখন পর্যন্ত যেহেতু এই বিধি মানার ব্যাপারেই বিশেষজ্ঞগন ঐকমতে পৌঁছতে পেরেছেন এবং আর কোনো রিমেডি যেহেতু এখনও পর্যন্ত জানা নেই; সেহেতু পৃথিবীতে স্বাভাবিক জীবন-যাপন অব্যাহত রাখতে এর বাইরে যাওয়ার আপাতত কোনো উপায় নেই। আবার এই ভাইরাস কখন সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হবে তা’ও আমাদের জানা নেই।

সম্প্রতি পরিচালিত দু’টি বড় ধরনের গবেষনায় এটাই প্রমানিত হয়েছে একমাত্র লকডাউনই লক্ষ লক্ষ মানুষকে যেমন সংক্রমিত না হতে সাহায্য করেছে তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। এবং আরও যতো অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে তার সবই একই কথা বলছে সংক্রমিত দেশ বা নগরী সংক্রমণ ঠেকাতে টার্গেটেড লকডাউন পদ্ধতি এবং একমাত্র লকডাউন পদ্ধতি ব্যবহার করে সংক্রমণ রোধ করতে সক্ষম হবে।

দীর্ঘ সময় আমরা হয়তো লকডাউনে থাকতে পারবোনা। তা’হলে আমরা অনাহারে কিংবা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে মারা যাবো। তাই নতুন জীবনাচারে অভ্যস্ত হতে হবে। সর্বত্র আমাদেরকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। আমাদের আবাসস্থল এবং মিলিত হওয়ার জায়গাগুলো ভাইরাসমুক্ত রাখতে হবে। অফিস-আদালতে যেতে এখন অপেক্ষাকৃত যুবক-যুবতীগন হাটতে পারেন বা সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে পারেন।

তাতে সবাই ফিজিকাললি একে অপরের থেকে ডিসট্যান্ট থাকা যাবে। গ্রোসারি স্টোরগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় দ্রব্য পিক আপ করা যেতে পারে। অথবা আরও কোনো নিরাপদ পদ্ধতির আবিষ্কার করা যেতে পারে।

তবে যেকোনো নির্দিষ্ট জায়গায় হতে পারে আবাসিক এলাকা, অফিস পাড়া, ব্যবসায় কেন্দ্রে যেহেতু গ্রুপ অপ পিপল থাকবে সেহেতু তাদের মধ্যে একজন সংক্রমিত হলে যাতে সবাইকে টেস্টিং এর আওতায় আনায়ন করা যায় তার জন্য কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং সংক্রমিত ব্যক্তিকে গ্রুপ থেকে পৃথকিকরনও অত্যাবশ্যক। এর কোনোটাই আমরা এখনই বন্ধ করতে পারছিনা। এবং কখন বন্ধ করা সম্ভব হবে তা-ও জানিনা।

আমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইতোমধ্যেই অবগত রয়েছি যে কোনো ব্যাপারে যখন আমাদের বেশি কথা বলতে হয় তখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে একটা স্রোত তৈরী হয়। তখন কাছাকাছি অবস্থান করলে পারষ্পরিক শ্বাস-প্রশ্বাস বিনিময় ঘটে। সুতরাং অন্তত একটি পক্ষকে মাস্ক পরিধান করতেই হবে। অন্যথায় সংক্রমন অনিবার্য।

আমরা এ-ও জেনেছি রেসপাইরেটরি-ড্রপলেট সংক্রমনের অন্যতম বড় মাধ্যম। সুতরাং হাঁচি-কাঁশির সময় রুমাল বা পেপার টাওয়েল ব্যবহার করতে হবে। সর্দি বা কাঁশি মেঝেতে পড়ার পূর্বে যদি কারও নাকে বা শরীরে লেগে থাকে সেখান থেকে আরও দ্রুত সংক্রমন ঘটে।

কিছু বিশেষজ্ঞগনের মতে হাঁচি-কাঁশি বাতাসে ছেড়ে দিলে অনেক সময় তা বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে যা অন্যেরা তাদের নিশ্বাসের সাথে গ্রহন করে সংক্রমিত হতে পারেন।

সুতরাং ভেন্টিলেশন, স্পেস, ব্রিদিং এবং পারষ্পরিক দূরত্ব বজায় রেখে আপাতত করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রনে রাখায় সফলতার কথাই গত ছয় মাসে আমরা স্বয়ং করোনাভাইরাসের কাছ থেকে শিখতে পেরেছি। বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকগন যারা সেই বহুল কথিত ‘ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহন করেনা বরং ইতিহাসের পরিনতি ভোগ করে’ এই নীতিতে থাকতে চান তারা নিজেদের জন্য এবং পুরো দেশের জন্য ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনবেন।

সরকার প্রধানগন যদি তথাকথিত ওয়েজিনদের ভাষায়, এমনকি মুফতি-মাওলানাগনের থেকেও এক ধাপ এগিয়ে ওয়াজ করেন তাতে পরিনতি ভোগ করা থেকে বিরত থাকতে পারবেননা। যেমনি করোনাভাইরাস রেহাই দিচ্ছেনা কোনো সরকার প্রধান, মন্ত্রী, এমপি, মাওলানা, মুফতি কিংবা কোনো ইমামকে। কিংবা পূন্যভূমি মক্কা-মদিনায় বসবাসরতদেরকেও রেহাই দিচ্ছেনা।

আসুন করোনা যা’ শিখিয়েছে তা’ অনুসরন করেই করোনা মোকাবেলা করে প্রকৃতির প্রতি আমরা প্রতিনিয়ত যে নির্মমতা প্রদর্শন করে থাকি তার কিছুটা ঋণ পরিশোধ করি। আমাদের মধ্যে আত্মশুদ্ধি এবং আত্বোপলব্ধি জাগরুক করি। মহান স্রস্টা আমাদের মঙ্গল করুন, আমিন।

মোঃ শফিকুল আলম
লেখকঃ মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতি: অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

ঢা/আরকেএস

(Visited 4 times, 1 visits today)