বাংলাদেশে রাজনীতির বর্তমান অবস্থা এবং উত্তরণের পথ

বাংলাদেশে রাজনীতি
  •  
  •  
  •  
  •  

মুক্তমত ডেস্ক : বাংলাদেশে বর্তমানে অনেকগুলো টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। প্রায় প্রতিদিন প্রতিটি চ্যানেলে এই শিরোনামে টকশোগুলোতে সম্মানিত আলোচকবৃন্দ অংশগ্রহন করে তাঁদের মূল্যবান মতামত রাখছেন।

আলোচোকবৃন্দের বক্তব্য বেশিরভাগ সময় দু’টি বিপরীত ধারায় বিভক্ত থাকে। একটি পক্ষের মতে, “আওয়ামীলীগ এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্তাধীন সরকার দেশকে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সঠিক পথে পরিচালনা করে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনে জনগনের অনুমোদন নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য শেষ করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রায় কার্যকর করতে সমর্থ্য হয়েছেন।”

“যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সোপর্দ করে বিচারকার্য সম্পাদন করেছে। প্রধান আসামীদের অনেকের ক্ষেত্রে রায় কার্যকর করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতা এবং জংগী দমনে সরকারের দৃশ্যমান সাফল্য রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি ।”

গনতন্ত্রের ক্ষেত্রে সরকার সমর্থক এ গ্রুপটি সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত গনতন্ত্রের পক্ষে।তাঁদের মতানুযায়ী জনগন বর্তমান সময়ে গনতন্ত্র নিয়ে যতোটা না ভাবছেন তার চেয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফল বেশি ভোগ করছেন এবং নিজেদেরকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ব্যাপৃত রাখছেন ।

এঁদের ভাষ্যানুযায়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি লাভ করবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বি এন পি’র শক্তি প্রায় নি:শেষিত বলে এ গ্রুপটি মনে করেন। রাজনীতিতে আওয়ামীলীগ এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে না থাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে আওয়ামীলীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে পারবে বলেও এ গ্রুপটি মনে করেন। অনেকে মনে করেন অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকবেন।

বিপরীত পক্ষের মতে, দেশে এখন গনতন্ত্র নেই। সাধারন মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনা। দিনের ভোট রাতে সম্পন্ন হয়েছে। দেশে গনতন্ত্রের অবর্তমানে উন্নয়নের নামে জনগনের অর্থের যথেচ্ছা লুটপাট হচ্ছে। গনতন্ত্রের অবর্তমানে ক্ষমতার অপব্যবহারে কিংবা অসম প্রতিযোগিতায় এক শ্রেনীর লুটেরা তৈরী হচ্ছে যাদের লুটের অর্থ দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। কারন লুটকৃত অর্থের ওপর ট্যাক্স দিচ্ছেনা বা অবৈধ আয়ের উৎস declare করতে পারছেনা।

তাঁদের মতে GDP বা Gross Domestic Production – এর উন্নয়নের হিসেব সঠিক নয়। কারন, পাচারকৃত অর্থের হিসেব এর মধ্যে নাই । সুতরাং , উন্নয়ন দেশের নয় সরকার সমর্থক কিছুসংখক লোকের হচ্ছে। তাঁদের মতে দেশে গনতন্ত্র থাকলে এভাবে যথেচ্ছা লুটপাট হতে পারতোনা। তাই অবাধ গনতন্ত্র ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় । শুধুমাত্র ব্যক্তির উন্নয়ন সম্ভব। গনতন্ত্র এবং উন্নয়ন দু’টি সমার্থক শব্দ । একটি ব্যতিরিকে অন্যটি অসম্ভব।

তাঁরা আরো ভাবেন যে, এভাবে দীর্ঘদিন বৈষম্য চলতে থাকলে যোগ্য ব্যক্তিবর্গের সামনে সরকার সমর্থক অযোগ্য লোকগুলো অর্থ-বিত্তের মালিক হলে সমাজে অসহিষ্নুতা তৈরী হবে। সমাজে অস্থিরতা তৈরী হবে। সৃস্ট অস্থিরতা তখন নিয়ন্ত্রিত গনতন্ত্র দিয়ে সামাল দেয়া সম্ভব হবেনা । আজকের সরকার সমর্থক অবৈধ বিত্তের মালিকদের গনরোষ সামলাতে সেদিন সরকারের সাথে পাওয়া যাবেনা । বা যে বুদ্ধিজীবি শ্রেনী আজ নিয়ন্ত্রিত গনতন্ত্রের পক্ষে ওকলাতি করছেন তাঁরা পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বোল পাল্টাবেন।

করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি এতোটা নগ্ন হয়েছে যে মাত্র কিছুদিন পূর্বের ক্যাসিনোকান্ড অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে এবং বালিশ কান্ডতো বটেই। মানুষ প্রতিদিন অধিকতর ভয়াবহ কান্ড দেখার জন্য, আবার কেউ ভাগ্যবরনের জন্য যেনো অপেক্ষমান থাকে। কোনো কান্ডেরই শেষ পর্যন্ত আর কিনারা পাওয়া যায়না। কান্ডগুলো যতোক্ষণ পর্যন্ত মারাত্মক এবং ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ না করে ততোক্ষণ পর্যন্ত নাশকতা এবং ষড়যন্ত্রের ধুম্রজালে আটকে থাকে।

এই কান্ডগুলোর মধ্যে টকশোতে অংশগ্রহনকারী সেই সামান্য সংখ্যক সাহসী সমালোচক বেশ ভালোভাবেই কিছুদিন ফ্লোর দখলে রাখতে সক্ষম হন। অপর পক্ষে কান্ডের পক্ষে তেমন জোড়ালো যুক্তি উপস্থাপনের কিছু না থাকায় সরকার পক্ষ কিছুটা বিড়াল কন্ঠে কিছু চুনোপুটিদের বিরুদ্ধে এ্যাকশন গ্রহন করা হয়েছে মর্মে বাঘের কন্ঠে বলতে গিয়ে বিড়ালের মিউ মিউ ধ্বনিতে শেষ করেন। আর এক যুগ আগের সরকারের সময় হয়েছে তাই তাদের সময়ে হওয়ায় দোষ কি এরকম বলতে চান। এক যুগ আগের সরকারের সাথে তাদের পার্থক্য যে তারা চুনোপুটিদের বিচারে সোপর্দ করেছেন!

সর্ব শেষ স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রকের পদত্যাগ করতে হয়নি। সচিব বা অধিদপ্তরের ডিজির বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা হয়নি। এর মধ্যেই আবার চান্চল্যকর হত্যাকান্ড! মেজর রাশেদ হত্যা! কথা ছিলো সরকার মাদক কারবারীদের দমন করবেন। কিন্তু মাদক সম্রাট বদি বহাল তবিয়তে মাদক সাম্রাজ্যে তার বিরোধীদের দমন করতে শুরু করলো।

এবারেও তার সহযোগী সরকারের সব প্রশাসন। হত্যাকান্ড পরিচালিত করা যদি পুলিশ প্রশাসন প্রমোশন এবং পুরষ্কার যোগায় সেখানে অসি প্রদীপরা থামবে কি করে? লিয়াকতরা ঝানু শুটার বনে গেলো। কোনো জবাবদিহিতা যেখানে নেই সেখানে কে মেজর আর কে মাইনর? Just keep shooting. ফলত: যে কান্ড ঘটার সে কান্ডই ঘটলো। এবং তা’হলো জঘন্য হত্যাকাণ্ড! না, এসপি, ডিসিরা এর কোনো দায় বা দায়িত্বের মধ্যেই নেই। কারন, তারাতো সরকারে আসার বা থাকার ত্রানকর্তা!

আওয়ামীলীগ একটি জনগনের দল। দলের সাথে জনগনের বা জনগনের সাথে সরকারের এখন আর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়না। সরকারের পক্ষে কথা বলার জন্যও এখন আর কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে টকশোতে দেখা যায়না। দু’য়েকজন প্রসঙ্গের সাথে অমিল রেখে সাহিত্য কপচিয়ে সময় নষ্ট করে বিধায় উপস্থাপক অন্যত্র চলে যান। এদের থেকে বরং চতুর অশিক্ষিত শাহেদ ভালো বলতো। একজন আঁতেলতো তার লেখাপড়ার জানান দিতে গিয়ে পুরোপুরি প্রসঙ্গের বাইরে চলে যান।

সবকিছু দেখছি আর ভাবছি জনগন কতোটা অসহায়! তথা কথিত এই কুলাঙ্গার রাজনীতিক যারা ১৯৭৫ পরবর্তী পরিস্থিতি বেমালুম ভুলে গিয়ে আরেকটি ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা অনুমানই করতে পারছেনা; পক্ষান্তরে একটি ভয়াবহ কান্ডের সম্মুখীন করছেন সাধারন বঙ্গবন্ধু অনুসারীদের। সাধারন বঙ্গবন্ধু অনুসারীদের উচিত এই কুলাঙ্গারদের সাহচর্জ ত্যাগ করা বা তাদের প্রতিহত করা।

আমার মতে, এই রাজনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ অবাধ গনতন্ত্রের চর্চা। অথর্ব এবং অযোগ্য লোকগুলো তখন চামচামি বন্ধ করবে। এক সময়ে ঝড়ে পড়বে। এক্ষেত্রে দলকে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করতে এখনই একজন দপ্তরবিহীন মন্ত্রীকে সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া উচিত।

নির্বাচনে জয়ী হলে ভালো। পরাজিত হলেও যেকোনো খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এবং তখন রাজনীতির স্বাভাবিক অনুশীলন শুরু হবে। রাজনীতির সকল পক্ষের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে পারে এমন একজন যোগ্য রাজনীতিকের এখন আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হওয়া প্রয়োজন এবং তা’ এখনই।

মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতি: মোঃ শফিকুল আলম
অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

ঢা/আরকেএস

(Visited 18 times, 1 visits today)