বই পর্যালোচনা : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস : বাংলা উপন্যাস পূর্ণ যৌবনশক্তি ও সৌন্দর্যের অধিকারী হয় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য আদর্শের সমন্বয়ে উপন্যাস লিখলেও একান্ত স্বতন্ত্র একটি ধারা তিনি নির্মাণ করতে সক্ষম হন।

সামাজিক সমস্যার আলোকে রচিত “কৃষ্ণকান্তের উইল” তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সমকালীন বিতর্কিত উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিধবা নারী রোহিনীকে অবলম্বন করে বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই শিল্পবোধ এবং নৈতিক আদর্শের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ঔপন্যাসিকের জীবদ্দশায় এই উপন্যাসের চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

উপন্যাস পাঠকালে আমরা জানতে পারি এটি যেন একটি ত্রিভুজ প্রেমের জটিল সমীকরণ। শ্যামবর্ণ গুণবতী সহধর্মিণী ভ্রমরের উথালপাথাল প্রেমকে উপেক্ষা করে গোবিন্দলাল প্রেমে পড়ে বিধবা রোহিনীর মোহনীয় রূপের।

উপন্যাসে ভ্রমর নিস্ক্রিয়ভাবে তার ভাগ্যের রূপান্তর লক্ষ্য করে ; অপমান কিংবা লাঞ্ছনায় কেঁদে ওঠেনি তার উপেক্ষিত চিত্ত যা তার চরিত্রের তুলনামূলক শ্রেষ্ঠতর দিক।

উপন্যাসের বয়ে যাওয়া ঘটনা-প্রবাহকে নিজস্ব কর্ম দ্বারা প্রভাবিত করেছে সে। স্বামীর প্রতি তার অকারণ অভিমান ও ভিত্তিহীন সন্দেহ কাহিনিকে অদ্ভুতভাবে তরঙ্গায়িত করেছে।

ঘটনার নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ধাপ পেরিয়ে গোবিন্দলাল বুঝতে পারে ; সংসারে সুখের জন্য গুণ-ই আবশ্যক ,ক্ষণিকের রূপের মোহ মুখ্য নয়। দুই নায়িকার অকাল মৃত্যু এবং নায়কের সন্ন্যাস জীবন সামাজিক প্রেমের এই উপন্যাসকে ট্রাজেডির আখ্যানে পৌঁছে দেয়।

উপন্যাসটি পাঠকালে পাঠকের মনে কিছু প্রশ্নের উদয় হতে পারে এর নামকরণের স্বার্থকতা প্রসঙ্গে ! স্রোতস্বিনী নদীর মত বয়ে চলা প্রেম ব্যতীত উইল সংক্রান্ত কোন বিষয় খুব প্রগাঢ় রূপে চোখে ধরা দেয় না এটা সত্য। কিনতু পুরো উপন্যাস অনুসরণ করলেই জানা যাবে উইল কেন্দ্রিক সূক্ষ্ম কলাকৌশল।

মূলত: কৃষ্ণকান্ত তার উইলে বখে যাওয়া নিজের ছেলেকে পাশ কাটিয়ে ভাতিজা গোবিন্দলালকে সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে যাবার পরই উপন্যাসের নামকরণের স্বার্থকতা আমাদের মনোলোকে প্রকট হয়ে ধরা দেয়।

কেন্দ্রীয় চরিত্র “রোহিনী” বিষয়ে কিছু না বললেই নয়। রোহিনীর আকস্মিক মৃত্যু এই উপন্যাসের জটিল সমস্যার এক সহজ সমাধান। মূলত বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একজন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ,সমাজের রক্ষণশীলতা রক্ষা করা ছিল তাঁর অন্যতম ধর্ম। তাই তিনি সমাজের যাবতীয় কুসংস্কার তুলে ধরলেও সমাধান দিয়েছেন রক্ষণশীলতার পক্ষে।

রোহিনী সত্যিকার অর্থেই গোবিন্দলালকে ভালোবেসেছিল। তার পক্ষে স্বাভাবিক নিয়মে গোবিন্দলালকে পাওয়া সম্ভব ছিল না , কাজেই সে অনৈতিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। সে ভ্রমরকে কিছু নকল গয়না দেখিয়ে বলেছিল এগুলো গোবিন্দলাল তাকে দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঔপন্যাসিক বলেন “রোহিনী না পারে এমন কাজ নাই !” এটি মূলত ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি বিরোধী। রোহিনী হত্যার পিছনে কোন আত্মসমর্থন ছিল না।

মূলত রোহিনীকে ঔপন্যাসিক সরলা-অবলা বঞ্চিতা বিধবারূপে অঙ্কন করতে চান নি।দ্রুত কাহিনির শেষ টানার জন্যই তিনি রোহিনীকে পিস্তলের মুখে সঁপে দিয়েছিলেন। ফলে তার দ্বৈত-সত্তার সহাবস্থান ঘটেছে এই উপন্যাসে।

আমি আর অধিক বিশ্লেষণে যাব না , কারণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে আমি সংক্ষিপ্ত ভাব ব্যক্ত করতে পারি না। সুখ-পাঠ্য উপন্যাসটি সবাইকে পড়ে দেখার আমন্ত্রণ রইলো। বাকি যা কিছু বিশ্লেষণ নতুন পাঠকরা ব্যক্ত করুন।

ঢা/এমএম

(Visited 309 times, 10 visits today)