ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা

আসিফ ইকবাল আরিফ
  •  
  •  
  •  
  •  

ব্যস্ত নগরীর লাল হলুদ ঝকমকে আলোতে
স্বপ্ন ছোঁয়ার পসরা সাজিয়ে লোকালয় ভেঙে।
ক্লান্ত মরুশান্ত নদী আর বটের ছায়া ছেড়ে
আসমান ভরা তারা চোখের কোণে বুনে,
এসেছিলাম কাঙাল হয়ে ইট-পাথরের প্রান্তরে।
চোখের তারার সব স্বপ্নই হয়েছে পূরণ।
আমার সে লিকলিকে চিকন পাতলা দেহ
আরাম আয়েশে বেশ ফুলে ফেঁপে গেছে।
মোটা মোটা স্বপ্ন যত হয়েছে পরিপুষ্ট
একেবারে লাল ফিতা জড়ানো ষাঁড়ের মত।
আকাশ ছুঁয়েছে স্বপ্ন তবু হারিয়েছি সুখের ঘুম।
আমার ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা যে আর!
কত! ডাক্তার বেটে খাই ছাতু ছাতু করে
কত! যন্ত্র আর তন্ত্রে চেক-আপ হয় রোজ।
আমার ঘুম আসেনা। আচ্ছা! কেন এমন হয়?
আমার উত্তর মেলেনা, কারন থাকে অজানা।
এমন অসুখে ভুগে বেশ ক’মাস বাদে
হঠাৎ ভাবনায় উদাস মনে পেছনে ভেবে,
ভোরের রক্তজবা শিউলি আর বর্ষার কদমফুল
এখন আমার ঘুম কাড়ে যে দিবা- নিশি ভোর।
মেঠো পথের সেই গরুর গাড়ীর সারি
রাখালের ঐ মন ভোলানো পাগল বাঁশি,
কত দিন যে হলো তা আর দেখা হয়না
আমার বাঁশির সুর শেখা যে হলো না।
বাতাবী লেবুর সাদা রঙ চোখে তো আর পড়েনা,
ফুলের উপর মৌমাছি এখন যে আর মেলেনা।
বাঁশ বাগানের গহীন ভেঙে, হঠাৎ ভোরের সূর্য এসে
ছেলে বেলার সে-ই অলস ঘুম যে আর ভাঙেনা।
নিছক খেয়ালে খেলার ছলে ঘুরে যে পথে পথে
সন্ধ্যে বেলায় বেশ ভয়ে! ঘরেতে আর ফেরা হয়না।
নবগঙ্গা নদীর পাড়ে হয়নি বসা অনেক দিন
নদীর বুকে চিৎ সাঁতার শরীর মোছা কত ঋণ।
সাঁজ সকালে মা-চাচীদের ঝগড়াটা যে আজ নেই আর
সকাল বেলায় ঝগড়া যাদের দুপুরেতে মিটমাট।
মুহুর্তে যারা উঠোন চষে, ষোলোয়ানা হিসেব কষে
ভাগাভাগি কাটাকাটি আর সীমানাতে লম্বা খুটি
সন্ধ্যে বেলায় রাতের মায়ায় তা আর থাকেনা।
বিথীকাকে লেখা সেই প্রথম প্রেম পত্র
কতদিন যে গেলো আর হয়নি লেখা।
প্রথম চিঠি লিখতে যাকে কলম ভাঙি,
চাঁদনী রাতের ঝাপসা আলোয় নিথর পেয়ে
বিথীকার ঠোঁটে-মুখে সুখে আমি চুম্বন আঁকি।
বিথীকার সেই কৈশরের চুল চোখ মুখ নাক
কত বছর যে পেরিয়ে গেলো হয়নি ছোঁয়া।
মোড়ল চাচার সেই খুনখুনে বুড়ি মা
শেফালীকে সে আর দেয়না পাহারা।
অথচ আমার আর শেফালীর প্রেম তখন
তার কারনেই হলো না যে বেশ মাখামাখা।
ঘরের কোণের সেই লম্বা খেজুর গাছে
শীত সকালে রসের আশায় এখন আর ওঠা হয়না,
কলসেতে মুখ লাগিয়ে দস্যি চুমুক দিয়ে দিয়ে
এখন যে গালের কাছে চুইয়ে চুইয়ে আর আসেনা।
প্রায়ই চাষে লোকসান খাওয়া লোকমান চাচার
আহাজারি এখন শোনা হয়না যে আর।
শুনেছি নাকি দেনার দায়ে মাথার উপর আকাশ ভেঙে,
বিষ পানে এক ভোর সকালে সে নাকি মরেই গেছে।
গরু মরে পড়লে পরে বটেরতলার সেই ভাগাড়ে
এখন কেউ আর ফেলে রাখেনা, এখন আর শকুন থাকেনা।
গ্রাম থেকে নাকি সব শকুন ধীরে ধীরে পালিয়ে গেছে
মানুষই নাকি এখন শকুন হয়েছে ভিন্ন বেশে,
মানুষ মানুষের নোনা রক্ত খায় যে চুষে চুষে।
এই যেমন আমি নিরবধি কত নিরীহের রক্ত চুষি
মুখ লাগিয়ে চুষে চুষে পেট ঢোলটা বেশ ফুলিয়েছি।
ভেন্নাতলার সেই বিল অনেকদিন হয়নি দেখা!
সেই সবুজ তাজা প্রান্তর আর রোগাটে অবুঝ মানুষগুলো।
তাদের সেই সন্তানেরা খেয়ে না খেয়ে সারাবেলা
হয়তো এখনোও ঘুমোয় বউ নিয়ে সেই-ই সন্ধ্যে বেলা।
আমার সেই তালপাতার ছনের ঘর
সেটা বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছি তো অনেক আগে।
সেইখানে এক বিল্ডিং আছে মাঝে মাঝে ড্রাইভার
বছর বছরে গাড়ি চেপে গিয়ে সে যে খাজনা দেয়।
যে গাঁ’কে আমি বর্বর, প্রাগৈতিহাসিক আশিক্ষিত
আর মুর্খদের পয়দাখানা বলে বলে মুখে ফেনা তুলে,
অভিমান আর ঘেন্নায় গোবরের গন্ধে এসেছি চলে,
এখন সে-ই পচা ফুলের গন্ধ আমাকে যে টানে।
ফিরে যাওয়া সেই পচা ফুলের গন্ধে এখন এই সন্ধ্যে
আবার কি এই এত পথ চলে যাওয়া কী সম্ভব!
শুনেছি নাকি নদীর বয়ে চলা যেখান থেকে
সেইখানে নদী আর যে ফিরে যেতে পারেনা।
আমার অন্তরাত্মা ভেঙে যায়, বুকেতে তুফান বয়,
সেই ফেলে আসা ধুলিমাখা সেই অসভ্য
বর্বর প্রাচীন সে-ই ফুলের গন্ধ আমি আবার চাই।
সে-ই পথে কী যাবো আবার! সে সময়-ই আর মেলেনা
অতৃপ্ত আঁখি কান্নাকরে দিনরাত তাই আমার ঘুম আসেনা,
সেই ফুলের গন্ধে, সে-ই ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা।

লেখক: আসিফ ইকবাল আরিফ
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ ৯:১৬

(Visited 42 times, 1 visits today)