প্রসঙ্গ করোনাভাইরাস: যা করবেন, যা করবেন না

অনিন্দিতা সেঁজুতি: কোভিড-19, ভাইরাসদের মধ্যে করোনা গোত্রের একটি সুনির্দিষ্ট ভাইরাস থেকে ছড়ায়। এই করোনাগোত্রের ভাইরাস সাধারণত প্রাণীদের আক্রান্ত করে। এই ভাইরাস গোত্রের বর্তমান মহামারী Cov-19সহ আরো সাতটি ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করতে পেরেছে- বার্ড ফ্লু, সার্স, মার্স এই করোনাগোত্রেরই ভাইরাস সৃষ্ট অসুখ। সাধারণ ঠান্ডা-সর্দিকাশিও এদের বহু পুরাতন দূর্বল গোত্রের অবদান।

প্রতিকার: করোনাগোত্রের অন্যান্য ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করা গেলেও নতুন আমদানি কোভিড-19 এর এই মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক নেই। কোভিড-19 এর মিউটেশন ক্ষমতা অত্যাধিক সুতরাং এর প্রতিষেধক সহজে তৈরি করা সম্ভবও না।

প্রতিরোধ: যেহেতু এই ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট কোনো ঔষুধ নেই। প্রতিরোধই একমাত্র পথ। আর আমাদের দেশে একবার এই ভাইরাসসৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে আপনি যদিবা সুস্থ হন আক্রান্ত হবে প্রথমে আপনার পরিবার, তারপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে আপনার সংস্পর্শে আসা লোকজন, তারপর আপনার পাড়া/আপনার গ্রাম তারপর আপনার গোটা এলাকা এবং এই আক্রান্ত হওয়াটা থামাতে পারবেন না শুধু চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে সুতরাং প্রতিরোধ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।

করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকবার জন্য যা যা করবেন:

১. সাবান দিয়ে হাত ধোবার অভ্যাস করুন। বাইরে থেকে আসার পর কুনুই পর্যন্ত ধুয়ে ফেলুন কমপক্ষে 20 সেকেন্ড সময় নিয়ে। কমপক্ষে দশ-পনেরো বার কিংবা প্রয়োজন হলে এরচেয়েও বেশি বার হাত ধোবেন। দুই মাস সাবান বেশি খরচের বিনিময়ে অন্তত বেঁচে থাকবেন।

২. সব ধরনের Close-contact এড়িয়ে চলুন। কারো সাথে কথা বলার সময়ও অন্তত ছয়ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন।

৩. বাইরে গেলে সঠিক প্রতিরক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করুন। চোখে চশমা পরিধান করুন।

৪. হাঁচি-কাশি দেবার শিষ্টাচার মেনে চলুন। হাঁচি-কাশি দেবার সময় টিস্যু ব্যবহার করুন বা কুনুইয়ের ভাঁজে হাঁচি-কাশি দিন।

৫. বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে গোসল করুন কোনোভাবেই সম্ভব নাহলে পোশাক পরিবর্তন করুন। পরপর দুইদিনের বেশি একই কাপড় পরিধান করবেন না। বাইরের কাপড় জমিয়ে না রেখে সাবান-পানিতে আধঘণ্টা রেখে কাপড় পরিষ্কার করুন।

৬. পানির কলের হাতল, সুইচ বোর্ড, দরজার হাতল, চাবির রিং, মোবাইল ফোন, টিভির রিমোট সবকিছুতে দিনে চার-পাঁচবার হেক্সাসল বা ডেটল/স্যাভলন মিশ্রিত পানি এক ফুট দূর থেকে স্প্রে করুন।

৭. স্যাভলন/ডেটল মিশ্রিত পানি
ক। প্রতি লিটার পানিতে দুই টেবিল চামচ স্যাভলন/ডেটল মিশিয়ে ঝাঁকিয়ে নিন।
খ। ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানি।
গ। এক টেবিল চামচ ব্লিচিং পাউডার দুইলিটার পানিতে মিশিয়ে আধঘন্টা রেখে দিন, আধঘণ্টা পর পাত্রের            ভেতরের অংশে নিচে জমে থাকা তলানি থেকে উপরের স্বচ্ছ পানি আলাদা করে নিন। এই স্বচ্ছ পানিই            জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করবে।
ঘ। স্যাভলন/ডেটল মিশ্রিত পানি অথবা ব্লিচিং পানি দরজার হাতল, গেট কিংবা যেখানে যেখানে হাত দিয়ে            স্পর্শ করতে হয় সেখানে স্প্রে করুন। ছাদ থেকে বাসার চারদিকে স্প্রে করুন প্রতিদিন অন্তত একবার।

৮. দিনে-রাতে দুইবার গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গড়গড়া করুন।

৯. বেশি করে পানি খান।

১০. যেকোনো ধরনের গণজমায়েত, সমাবেশ সম্পূর্ণ পরিহার করুন।

১১. প্রতিদিন ভিটামিন সি খান। ভিটামিন সি শরীরে জমা থাকে না। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। দৈনিক একটা লেবু খান। পেয়ারা, বড়ই যে কোনো টক ফল খান। ফল ভালভাবে ধুয়ে খান। পাখি ঠোকর দিয়েছে এমন ফল খাবেন না।

১২. শিশু ও বয়স্কদের প্রতি যত্নশীল হোন। পরিবারের কোনো সদস্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যার জন্য নিয়মিত নির্দিষ্ট অষুধ গ্রহণ করে থাকলে নিয়মিত এবং সময়মতো তার অষুধ গ্রহণের বিষয়টি সুনিশ্চিত করুন।

এসময় যা যা করবেন না:

১৩. অহেতুক ঘরের বাইরে যাবেন না। এখন ঘরের বাইরে যাওয়া মানেই ভাইরাসকে পোষক দেহ দেওয়া সুতরাং যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকুন। আপনি-আমি যত বেশি ঘরের ভেতর থাকবো তত দ্রুত এই বন্দীদশা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাবো।

১৪. বারবার নাক-চোখ-মুখে হাত দেবেন না। খুব বেশি প্রয়োজন হলে প্রতিবার নাক-চোখ-মুখে হাত দেবার আগে ভালভাবে হাত পরিষ্কার করুন।

১৫. খোলা জায়গায় কফ-থুতু ফেলবেন না। এজন্য ওয়াশরুম ব্যবহার করুন। খোলা জায়গায় কফ-থুতু ফেলা ভাইরাস বিস্তারের অন্যতম কারণ।

১৬. বাইরে থেকে আনা শাকসবজি-ফলসহ কোনো খাদ্যসামগ্রী সাবান বা ডিটারজেন্ট পানিতে না ধুয়ে ঘরে নেওয়া যাবে না।। এজন্য বড় বালতি বা গামলায় দুই চা চামচ ডিটারজেন্ট/ভিম লিকুইড দিয়ে ফেনা তৈরি করুন বাইরে থেকে আনা সব ফল ও শাকসবজি এই ফেনাসহ সাবান পানিতে দশ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন তারপর ভালভাবে ধুয়ে ঘরে নিয়ে শুকিয়ে নিন। রান্নার আগে আগে আরেকবার ভালভাবে ধুয়ে নিলেই এতে আর কোনো সাবান/ডিটারজেন্টের গন্ধ থাকবে না। প্যাকেটজাত খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেটও সাবান পানিতে ডুবিয়ে নিন। কারণ বাজারে এগুলো অনেক হাত ঘুরেই তারপর বাড়িতে আসে।

১৮. ফ্রিজ অপরিষ্কার রাখবেন না। পরিষ্কার করে ফ্রিজে আধা কাপ ভিনেগার রাখুন। এই ভিনেগার ফ্রিজের ভেতর দুর্গন্ধ হওয়া এবং ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া জন্মানো রোধ করবে। পনেরোদিন পরপর এই ভিনেগার বদলে দিন।

১৯. শিশু, বয়স্ক, যারা কোনো শারীরিক সমস্যার জন্য অষুধ গ্রহণ করছেন, শ্বাসকষ্ট- হাঁপানি-এজমা কিংবা রেসপিরেটরি রোগ আগে থেকেই আছে যাদের এবং যাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে কম অর্থাৎ দ্রুতই অসুস্থ হন যারা তারা কোনোভাবেই ঘর থেকে বের হবেন না। সম্পূর্ণভাবে পরিহার করুন।

সবাই সচেতন হোন, সুস্থ থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন, করোনাভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধ করুন।

অনিন্দিতা সেঁজুতি,
শিক্ষার্থী, ফোকলোর বিভাগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢা/এফএইচপি

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )