পার্কিং

  •  
  •  
  •  
  •  

শাহিদা আরবি ছুটিঃ আমার আর ভালো লাগেনা বাসায় বসে থাকতে। শুধু ঘরের কাজ করে, টিভি দেখে আর কোলের উপর ল্যাপটপ নিয়ে ফেসবুকিং করে যে জীবন কাটানো যায়না, এই ছাতার করোনা ভাইরাস না আসলে জানা হতোনা।

অতএব আমি দীর্ঘ নয় মাস পর রেগুলার অফিসে আসা শুরু করেছি এই সপ্তাহ থেকে। আমাদের অফিস থেকে কাজ করা এখনো বাধ্যতামূলক না। সেজন্যই অনেকে অফিসে আসেনা। তারপরও যেই দুই তিনজন আসে তারা তাদের ডেস্কে ভুতের মতোন নিঃশব্দে বসে কাজ করে।

আমার অফিস যে কোর্ট বিল্ডিঙে সেটাতো বলেছিলাম একবার। তো এই অফিস থেকে আমার জন্য একটি নির্ধারিত পার্কিং স্পট আছে। বিদেশে যারা থাকেন তারা নিশ্চই জানেন, অফিসে নিজের একটা পার্কিং স্পট থাকা হলো বিরাট আশীর্বাদ। স্পেসিয়ালি অফিস যদি হয় মেট্রোপলিটন টাইপ সিটিতে, তাহলে শুধু মোটা অংকের পার্কিং-ফি না, আসা যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে, এনার্জি ইত্যাদি বেঁচে যায় এবং জীবন খুবই সহজ থেকে সহজতর হয়ে যায়।

যাইহোক, আমি সোমবার অফিসে এসে দেখলাম কে যেনো আমার পার্কিংয়ে তার নীল রঙের লেক্সাস গাড়িটা পার্ক করে রেখেছে। প্রথমদিন তাই মেজাজ ফুরফুরা ছিল। সকাল সকাল পার্কিংএর মতন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কোনো মচ্ছব বসাতে চাইনি। তাই আমি চুপচাপ আমার গাড়ি গেস্ট পার্কিংয়ে পার্ক করলাম।

গতকাল অফিসে এসেও দেখি সেম কাহিনী। নীলরং এর লেক্সাস আমার পার্কিংয়ে পার্ক করা। কিছু বললাম না, আবারো গেস্ট পার্কিংয়ে পার্ক করে অফিস শুরু করলাম।

হাতে অনেক কাজ ছিল, তাই পার্কিং নিয়ে কি করবো সেই চিন্তা করার সময় পাইনি। আজকেও একই ঘটনা। লেক্সাস আমার পার্কিংয়ে পার্ক করা। আমি চাইলে এখন গাড়ি ‘টো’ করাতে পারি, অথরিটিকে বলে ওয়ার্নিং, এমনকি কোর্ট বিল্ডিঙে আনঅথোরাইস পার্কিংয়ের জন্য তার এক্সসেস পাস্ ডিএকটিভেটও করতে পারি। কিন্তু আমি কি করলাম?

আমি একটি এ’ফোর সাদা কাগজে মেসেজ টাইপ করে ফেললাম। আমার উদ্দেশ্য হলো তাকে কঠিন ভাবে ধমক দিবো। ধমক কঠিন হলো কিনা জানিনা, তবে পুরো মেসেজ লিখলাম লাল রঙের ফন্টে। শেষের লাইনে লিখলাম ‘আই ডোন্ট লাইক ইট ‘!!
এই মেসেজ লিখে তার গাড়ির সামনের কাঁচের উপর রেখে আসলাম।

তারপর অফিসে এসেই আমার মন খচখচ করতে লাগলো। লাল ফন্ট ব্যবহার করা ঠিক হলো কিনা বুঝতে পারছিনা। লাল কালী দিয়ে লিখে আমি তাকে আসলে কি বুঝাতে চাইলাম? আমি তার উপর রেগে আছি? তাকে আমি চিনিনা জানিনা তার উপর রাগ করবো কেন? নিজের উপর তখন নিজেরই বিরক্ত লাগছে।

সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগছে ‘আই ডোন্ট লাইক ইট’ বাক্যটিতে। এতো অর্থহীন বাক্য কেন ব্যবহার করলাম আমি নিজেই বুঝতে পারছিনা।

সামান্য একটা মেসেজ, সেটাও গুছিয়ে লিখতে পারলাম না? অনেক্ষন চিন্তা করে, আবার পুরোনো মেসেজটি লাল ফন্ট থেকে কালো ফন্টে পাল্টালাম, আর শেষের ‘আই ডোন্ট লাইক ইট’, এই ফালতু বাক্যটি ফেলে দিয়ে আরেকটা প্রিন্ট আউট করলাম । এইবারের মেসেজ পারফেক্ট হয়েছে।

তাই খুশি খুশি ভাব নিয়ে আবার পার্কিংয়ের দিকে রওনা হলাম, নতুন মেসেজটি আগেরটার সাথে পাল্টাপাল্টি করবো বলে যেয়ে দেখলাম একটি ছেলে গভীর মনোযোগ দিয়ে, গাড়ির উপর রাখা আমার লেখা কাগজটি পড়ছে। তার মুখ হাসি হাসি। যেনো খুব মজার একটা চিঠি পড়ছে। কেমনটা লাগে।

ছেলেটির চুলগুলো বড় বড়, প্রায় ঘাড় সমান। সামান্য এলোমেলো,তবে যেটুকু অগোছানো হলে খারাপ লাগবে না দেখতে সেটুকুই অগোছানো। আজকাল কেউ লম্বা চুল রাখে নাকি? নব্বই দশকের শেষের দিকে ছেলেরা এই ফ্যাশন করতো। এখনকার ছেলেরা ফ্যাশন করে দাড়ি রাখে। নানান ডিজাইনের দাড়ি।

যাইহোক, ছেলেটিকে আমার মেসেজ পড়তে দেখে একবার ভাবলাম দৌড় দেই, সে মেসেজ পরে চলে যাক। সামনাসামনি হবার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিলোনা কিন্তু তার আগেই ছেলেটি আমার দিকে তাকালো। বললো, এইটা কি তোমার পার্কিং?
আমি বললাম, হুম।

সে তখন আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বললো, এইটা কি? আমার জন্য আরেকটা মেসেজ লিখে এনেছো? আমি আবারো বললাম, হুম।

সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়ে কেউ হুম হুম করেনা, এইটা মেসেন্জার চ্যাটিং না যে দুতিনবার ‘হুম’ বললাম, তারপর অন্য আরেকটা উইন্ডোতে চলে গেলাম। তবুও কেন হুম হুম করছি কে জানে … মাটির দুইতলা নিচের জনমানবহীন নিঃশব্দ একটা পার্কিংয়ে আমার মনে হচ্ছিলো, আরেকটা শব্দ বললেই বোধহয়, ছেলেটির সাথে আমার অনেক কথা বলা হয়ে যাবে।

ছেলেটি আমার লেখা মেসেজ ভাঁজ করে পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে ক্লান্ত গলায় বললো আর মেসেজের দরকার নেই, আমি আমার গাড়ি সরিয়ে ফেলছি। সে হেটে হেটে তার গাড়িতে ঢুকার ঠিক আগ মুহূর্তে কি জেনো ভেবে আমাকে বললো, এই নতুন মেসেজে কি আর কিছু নতুন আছে ?

আমি বললাম, নাহ নেই, শুধু লাল রঙের জায়গায় পুরো মেসেজ কালো রঙে লিখেছি।
সেই ছেলে তার কপালের উপর পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে বললো, দাও এই মেসেজটাও নিয়ে যাই। আমি তাকে দ্বিতীয় মেসেজটিও দিয়ে দিলাম।

সে আমার দ্বিতীয় মেসেজটি পড়লো তারপর বললো আগের মেসেজে তুমি লিখেছিলে ‘ইউ ডোন্ট লাইক ইট ‘ এই মেসেজে সেটা লেখনি। তারমানে কি তুমি বিষয়টা পছন্দ করা শুরু করেছো? বলেই সে হো হো করে হাসতে শুরু করলো।
আমার ধারণা ছিলো বাংলাদেশী ছেলেরাই এই ধরণের কিউট/রোমান্টিক দুষ্টামিগুলো করতে পারে।

বিদেশী ছেলেরা এইসব দুস্টামো ফাজলামো, সস্তা রসিকতা তেমন পারেনা। পারলেও সেগুলো আমি কখনোই বুঝতে পারিনি। আজকে আমার সেই ভুল ভাঙলো। ছেলেটি আমার দ্বিতীয় মেসেজ ভাঁজ করে পকেটে নিয়ে হাসতে হাসতে গাড়ির ভেতর ঢুকে গেলো।

বুঝতে পারছিনা, এমন ছোট ছোট অদ্ভুত ঘটনাগুলো কি শুধু আমার সাথেই ঘটে নাকি আরো অনেকের সাথেই হয়?
ছবি: এই লেখা শেষ করেই, অফিসের ডেস্কে বসে একটা ফ্রেশ কিন্তু ঘোলা ছবি তুলে ফেললাম!

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক।
[ঢা-এফ/এ]

জানুয়ারি ১৯, ২০২১ ৬:৫৪

(Visited 16 times, 1 visits today)