নোশিন আতিয়া মিম এর ধারাবাহিক গল্প : অজ্ঞাত (পর্ব-২)

নোশিন আতিয়া মিম :

পূর্ব প্রকাশের পর >>>>

বক্সটা খোলার পর প্রথমেই পেলাম বকুল ফুলের মালা। লাল রংয়ের একটা জামদানী শাড়ি। বাকিগুলো সেই আগের মতোই। নতুন এড হয়েছে বড়সড় একটা চকলেট এর বক্স। যার ওপর টোকেন এ লিখা গিফট ফর পিচ্ছি। পিচ্ছি প্রভাকে মিন করে বলা বুঝলাম। ডাইরি আর কলম বের করার পর নিচে দেখলাম আবারো সেই নীল রঙের কাগজের চিরকুট।
“শুভ জন্মদিন বিভা।

এই দিনটা যেন তোমার জীবনে আরো অনেক অনেক বছর পর ধরে ফিরে আসে সেই কামনা ই করি।
প্রতিবার একই স্টাইলে গিফট পাঠালে বোর লাগবে। তাই একটু নতুন ওয়ে তে গিফট পাঠালাম।
চকলেট গুলো পিচ্ছির জন্য। ওকে কিছু দেওয়া হয়নি কখনো। তুমি তো আবার চকলেট পছন্দ করো না।তাই চকলেটগুলো পিচ্ছির জন্য দিলাম।ওকে দিয়ে দিয়ো।
ভালো থেকো।

এবারের শাড়ীটা আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। সত্যিই লোকটার চয়েজ অনেক ভালো।

এরমধ্যেই বাবা আমাকে নতুন ফোন আর সিম কিনে দেয়। তাকে মেসেজ এ নতুন নাম্বারটা সেন্ড করে দেই।
তার মেসেজ রিপ্লাই এ সে জানতে চাইলো আমার ফেসবুক আইডি কি?
সেটাও তাকে জানিয়ে দিলাম।
অজ্ঞাত নামে একটা আইডি থেকে রিকোয়েস্ট আসার পর আমিও একসেপ্ট করে নিলাম।আইডিটা তন্নতন্ন করে খুজেও কোনো আইডেন্টিটি পেলাম না। নিরাশ হলাম। তাকে কি এই জীবনে আমি কখনো দেখতে পাবো?

তার দেওয়া জামদানী শাড়িটা পড়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করার পরই আমি তার তোপের মুখে পড়লাম।
” নিজেকে সবার সামনে রিপ্রেজেন্ট করার এতো সখ।নিজেকে সবাইকে দেখানোর এতো ইচ্ছে কেন তোমার? পাবলিক ফিগার হতে চাও নাকি?
” আপনি এসব বলছেন কেন?
” তুমি ফেসবুকে ছবি দিলে কেন?
” অনেকেই তো প্রোফাইলে ছবি দেয়।তাই আমিও দিয়েছি।
” কেন দিবে তুমি? তোমাকে তো বলেছিলাম আমি চাইনা তোমাকে কেউ দেখুক। আর তোমার অনলাইন জগতের ব্যপারে তোমার কোনো ধারণাই নেই।তোমার ছবি অনেক বাজে কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে। সেসব ছাড়াও প্রোফাইলে তোমার ছবি থাকার সুবাদে অনেক ছেলেই তোমাকে দেখবে সেটা আমি চাই না।
” ঠিক আছে। আমি ছবি ডিলেট করে দিচ্ছি।
” হুম ডিলেট তো করবেই। আর হ্যা নেক্সট টাইম আর কখনো তোমার ছবি ফেসবুকে দিবে না। মনে থাকবে?
” জ্বি।

আমার ১৮ তম জন্মদিনে আবারো তার গিফট হাজির।
১৮ তম জন্মদিন তাই ১৮ টা অর্কিড ছিলো পার্সেল এর সাথে।
নীল রঙের শাড়ীর সাথে শাড়ীটা পড়ে তাকে কিছু ছবি দেওয়ার আবদার।
তার কোনো আবদারে না বলার ক্ষমতা আমি অনেক আগেই হারিয়েছি।

আমার জন্মদিনে তার পার্সেল আসাটা আমার কাছে সাধারণ ব্যাপারই হয়ে দাড়িয়েছিলো তখন। তাকে দেখার জন্য তখন আর মনটা উতলা হতো না। তার এই দূরত্বটাই তখন ঠিক মনে হতো। তার সাথে মাঝে মাঝে টুকটাক মেসেজিং টুকটাক কথা এটাই বেশ ছিলো।
এসবের মধ্যেই তার প্রতি ভালোলাগাটা কখন ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে বুঝতেই পারিনি। হ্যা আমি না দেখেই তাকে ভালোবেসেছিলাম। হয়তো সেটা বোকামি।তবে সেই বোকামিটাই আমি করেছি।

এভাবেই সময় এগুলো। তার পার্সেল সংখ্যা এক এক করে দশ এ এসে দাঁড়ালো।
আর পরিচয় ৯ বছরে।
ততোদিনে আমি ভালো একটা পাবলিক ভার্সিটিতে এডমিশন নিয়ে অনার্স শেষ করার পথে।
অনার্স তৃতীয় বর্ষে উঠার পরই বাবার মাথায় ভুত চাপলো আমার বিয়ে নিয়ে।
বাবাকে অনেক বুঝিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের কথা বলে পড়াশোনায় দোহাই দিয়ে বিয়ে আটকে রাখতাম।তবে মূল কারন ছিলো সেই অজ্ঞাত মানুষটা। তাকে ছাড়া অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী করার কথা আমি ভাবতেই পারছিলাম না। কিন্তু বাবাকে তো তার কথা বলতে পারছি না। যাকে কখনো চোখেই দেখলাম না, তার কোনো ডিটেইলস ই জানলাম না তার কথা কিভাবে বলবো।

অনার্স শেষ করার পর বাবা কোমর বেঁধে নামলেন।বিয়ে আমাকে দিয়েই ছাড়বেন।
এদিকে আমি বাবাকে যুক্তিসংগত কারনও দেখাতে পারছি না বিয়ে না করার।
নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে যখন বললাম বাবাও তার উপায় বাতলে দিলেন। মাও বাবার সাথে একমত।এবার বিয়েটা করা উচিত। কিন্তু আমি কি করে ওদের বলতাম আমি যাকে ভালোবাসি তাকে এখন বিয়ে করা সম্ভব না। সে এখনো দেখাই দেয়নি আমাকে। হুটহাট তার মেসেজ বা কল আসে। ভীষণ টানাপোড়েন এ ছিলাম এসব নিয়ে।

আমার জন্মদিনে বাবা হঠাৎ বললেন আগামীকাল বাসায় কিছু মেহমান আসবে।আমি যেন কোথাও না বের হই।জানতে চাইলাম কে আসবে। বাবা বললেন পাত্রপক্ষ দেখতে আসবেন। ছেলের ব্যাপারে বাবা আগেই খোঁজখবর নিয়ে রেখেছেন।ছেলেরাও আমাকে পছন্দ করেছে। কালকে জাস্ট অফিসিয়ালি আসবেন কথা বলার জন্য। এবার নাকি বাবা আমার কোনো কথাই শুনবেন না।ছেলে অনেক ভালো। সব ঠিক থাকলে এখানেই বিয়ে দিবেন আমার। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কি হবে এবার।
এবার তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না।

তার নাম্বারে কল দিলাম।সুইচড অফ বলছে।আমার মাথায় হাত। তার সাথে কন্টাক্ট করবো কিভাবে। আমি অনবরত ট্রাই করেই যাচ্ছি বিকেল থেকে।
অবশেষে রাত দশটার পর কল ডুকলো।আমিও যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
ফোনের ওপাশে তার কন্ঠটা শুনেই কান্না চলে এলো।
” কি ব্যাপার তুমি কাঁদছো কেন?
কান্নার জন্য কিছুই বলতে পারছিলাম না।
” কি হয়েছে সেটা তো বলবে? কান্না বন্ধ করো বলছি।
” আমার বিয়ে ঠিক করেছে বাবা।আপনি কিছু একটা করুন।
” সেটা তো ভালো কথা। এতে কান্নার কি হলো?আর এখানে আমি কি করবো?
” কান্নার কি হলো মানে? আমার বিয়ে হয়ে যাবে আর আপনি কিছু করবেন না?
” দেখো তোমার বিয়ে হলে আমার করণীয় হবে তোমাকে উইশ করা আর গিফট পাঠানো। এটা ছাড়া আমি আর কি করতে পারি?
” এসব আপনি কি বলছেন? আপনি আমাকে বিয়ে করবেন না?
” হোয়াট! আমি কেনো তোমাকে বিয়ে করবো?
” তাহলে এতোদিন এসব গিফট, মেসেজ কল এসব কেনো? আপনি আমাকে ভালোবাসেন না?
” কি আবোল তাবোল কথা বলছো তুমি?
আমি কেনো তোমাকে ভালোবাসতে যাবো? গিফট পাঠালে আর কথা বললেই কি ভালোবাসা হয় নাকি?
” কিন্তু আমি যে আপনাকে ভালোবাসি। প্লিজ আপনি কিছু একটা করুন। আমি এই বিয়ে করতে চাইনা।
” কি বোকার মতো কথা বলছো তুমি? আমি কিছু কেনো করবো। আচ্ছা তুমিই বলো আমি তোমাকে কখনো বলেছি আমি তোমাকে ভালোবাসি? না কখনো তোমাকে কোনো কমিটমেন্ট দিয়েছি? কাউকে গিফট দিলেই কি ভালোবাসি সেটা বুঝায় নাকি? এসব পাগলামি বাদ দাও। ছেলে ভালো হলে বিয়ে করে নাও। আর তুমি কখনো আমাকে দেখোনি, আমি কে,কি করি কিছুই তুমি জানো না। আমাকে ভালোবাসো কি করে? এসব নিষক পাগলামি। আমি তোমাকে গিফট পাঠাতাম তাই তোমার আমাকে ভালো লেগেছে। এর বেশি কিছুই না।
তোমাকে পাঠানো এটাই আমার শেষ গিফট। আর কোনো গিফট বা তোমার সাথে আর কথাও হবে না।
” তাহলে এতোদিন এসব গিফট, মেসেজ কেন করতেন? কল করতেন? বলুন।এই নয় বছর আমার সাথে কেন এই লুকোচুরি খেললেন?
” গিফট পাঠাতাম আমার ইচ্ছে হতো বলো। ভালো লাগত বলে। এর বেশি কিছু ভাবতে যেওনা।সেটা বোকামি হবে। এসব ভুলে নতুন জীবন শুরু করো।আমার জন্য বিয়ে না করাটা তোমার বোকামি বই আর কিছু না।
ভালো থেকো।আর ডাইরি লেখা ছেড়ে দিও না আবার। আমি কিন্তু হুট করে এসেই আমার দেওয়া ডাইরিগুলো চেয়ে বসবো।তখন আমাকে সেগুলো দিতে হবে।
” আমাদের কি আদৌ কখনও দেখা হবে?
” ভাগ্য চাইলে অব্যশই হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ হাফেজ।

ব্যস আজ আমার বিয়ে হয়ে গেলো। বাবাকে আর কিসের ভরসায় বিয়ে পিছোতে বলবো? কার ভরসায়ই বা অপেক্ষা করে থাকবো।তাই আর বাবার মুখের ওপর জোর দিয়ে কিছু বলতে পারিনি। বাবার পছন্দের ছেলেকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছি।
যদিও আমি নাকি ছেলের পছন্দের ছিলাম। আমি খুব অবাক হলাম যখন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড নোশিন আমাকে সাজাতে এলো।
” তুই!
” হুম, আমার ভাবীকে সাজাতে এলাম।
” ভাবী?
” তোর যার সাথে বিয়ে হচ্ছে সে তো আমার ভাই। চাচাতো ভাই।
এই বিয়েটা বাবা ই ঠিক করেছে। যদিও ভাইয়ার ও তোকে পছন্দ হয়েছে। ( বলে রাখা ভালো নোশিন আর আমার বাবা খুব ভালো বন্ধু)

বিয়ের আগে ফাতিনকে আমি একবার দেখেছিলাম।বেশ পরিপাটি হ্যান্ডসাম একজন মানুষ। সুদর্শন ও বটে। তবে কোনো কথা বলা হয়নি। সে ও বলেনি আমারও ইচ্ছে হয়নি।
ওরা চলে যাওয়ার পর আমি ফ্রেশ হয়ে ডাইরি নিয়ে বসেছি। অভ্যাস বা বদভ্যাস যা ই হোক ডাইরি লেখাটা আমার জন্য তা ই।

আর কখনও হয়তো সেই অজ্ঞাত মানুষটা কল বা মেসেজ দিবে না। হয়তো অজ্ঞাত নামে কোনো পার্সেলও আসবে না। তবে সে সবসময় মনেই থাকবে।ডাইরি লেখার মতো সেও আমার অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে।তাকে দেখার একটা সুপ্ত ইচ্ছে আমার মনে থেকেই যাবে। তাকে ভুলে যাওয়া এতো সহজ নয়। এতোবছর ধরে একটু একটু করে তার জন্য মনে জায়গা তৈরি হয়েছে। একঝটকায় তাকে সরিয়ে সরিয়ে অন্য কাউকে জায়গা দিয়ে দেয়া মুটেও সহজ নয়। তবে যার সঙ্গে সারাজীবনের জন্য বাধা পড়েছি তাকে আমি কখনই ঠকাবো না। আপ্রান চেষ্টা করবো তারজন্য নিজেকে তৈরি করতে।

কাঁধে কারও স্পর্শ পাওয়ায় লেখা বন্ধ করে পিছনে তাকালো বিভা।
দেখলো প্রভা দাঁড়িয়ে আছে।
” কি রে তুই ঘুমাসনি এখনো?
” না আপু ঘুম আসছে না। তাই ভাবলাম তোর কাছে চলে আসি। তুই ঘুমাসনি কেন এখনো?
” আমারও ঘুম আসছে না। আর এই যে লেখছিলাম।এখনই শুতে যাবো। ডাইরিটা ড্রয়ারে রেখে বিভা উঠে পড়ে।
” তোর খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না আপু?
“কষ্ট হবে কেন?
” আমাকে মিথ্যা বলিস না আপু। আমার থেকে লুকিয়ে লাভ নেই। আমার চেয়ে বেশি কেউ তোকে বুঝে না। আচ্ছা আপু তুই ফাতিন ভাইয়ার সাথে সংসার করবি কি করে? যেখানে তুই অন্য কাউকে ভালোবাসিস।
” এসব কথা আর বলিস না কখনও।আর জানিস তো মেয়েদের নিজেকে হাজারবার ভেঙ্গে হাজারবার গড়তে হয়। আমিও নিজেকে ভেঙ্গেচুরে গড়ে নিবো।তুই চিন্তা করিস না।
” মন থেকে পারবি মেনে নিতে?
” পারতে যে হবেই আমাকে। যার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার দিকে অসন্তোষ ছিলো বলে তাকে তো আর কষ্ট দিতে পারবো না। আমার যতো কষ্টই হোক।
” চোখের জলটা কেন আড়াল করছিস আপু? কান্না চেপে রাখলে কষ্ট আরও বাড়বে আপু। একটু কান্না কর।হালকা লাগবে।
কথাটা শুনে বিভার চোখের জলটা আর বাঁধ মানে নি। প্রভাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠে। প্রভাও আপুকে জড়িয়ে ধরে কেদে উঠে।
সেরাতে প্রভা বিভার সাথেই রইলো।বিভা প্রভার কোলে মাথা রেখেই বাচ্চাদের কোলে মতো ঘুমিয়ে পড়ে।
প্রভাও আপুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।ও তো জানে আপুর মনের ওপর দিয়ে কি ঝড় বইছে।

বিভার ঘুম ভাঙ্গে মোবাইলের রিংটোনের শব্দে। ঘড়িতে তখন সকাল ৮ টা। প্রভা ততোক্ষণে উঠে চলে গেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো একটা আননোন নাম্বার ভেসে আছে। বিভা ভাবছিলো কে হতে পারে। ও মনে মনে চাইছিলো কলটা যেন সেই অজ্ঞাত মানুষটার হয়। ওর যে সেই মানুষটার কন্ঠ শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।

কলটা রিসিভ করে বিভা ওপাশে কে আছে জানার জন্য।

চলবে >>>

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )