নোশিন আতিয়া মিম এর ধারাবাহিক গল্প : অজ্ঞাত (পর্ব-১)

নোশিন আতিয়া মিম : 

“গল্পটা শুরু হয় প্রায় ৯ বছর আগে। আমার ১৩ তম জন্মদিনে হঠাৎই একটা পার্সেল আসে অজ্ঞাত নামে। আজও আমি জানতে পারিনি কে সে প্রেরক। সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি কবে আমার সামনে আসবে সেটা নিয়ে আমি আজও সন্দিহান।

আমি বিভা। কিছুক্ষণ আগেই আমার নামের পাশে বিবাহিত তকমাটা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাস্টার্স এ ভর্তি হয়েছি কিছুদিন আগে। অনেকদিন যাবতই বাবা বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় করছিলো।

অবশেষে আজ বাবার জেদের কাছে হার মেনে বিয়েটা করতেই হলো। অথচ যার সাথে বিয়ে হয়েছে তাকে আজই আমি প্রথম একনজর দেখেছি।এখনও অবধি তার সাথে আমার কোনো কথা হয়নি।শুনেছি সে ডাক্তার।কর্মসুত্রে রাজশাহী থাকে।

অনুষ্ঠানের পর আমাকেও রাজশাহী চলে যেতে হবে। ফাতিন ( আমার বর) আর ওর পরিবার আজই আমাকে প্রথম দেখতে এসেছিলো।যদিও ওরা আগেই আমাকে দেখেছে,বাবার সাথে তাদের কথাবার্তা আগেই বলে রাখা। অফিশিয়ালি আজই প্রথম এসেছিলো।

আজই ওরা কাবিন করিয়ে নিয়েছে।অনুষ্ঠান করে একমাস পর আমাকে নিয়ে যাবে। বাবার মুখের ওপর আমি কথা বলতে পারিনি।বললেও বাবা শুনতো না। গত দুবছর যাবতই বাবা বিয়ের কথা বলছিলো।

আমি সাত পাঁচ বুঝিয়ে এতোদিন আটকে রেখেছিলাম।আজ আর শেষ রক্ষা হলো না। আর আজ আমি বাবাকে জোর গলায় কিছু বলতেও পারিনি।বলার মতো কিছুই ছিলো না।

বাবাকে বলতে পারিনি আমি এখনই বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। নিজেকে অন্যের জন্য তৈরি করতে আমার একটু সময় লাগবে।বাবাকে বলতে পারিনি আমার মনটা আমি অনেক আগেই কাউকে দিয়ে বসে আছি।

যাকে কখনো চোখে দেখিনি,যার নামটাও আমি জানিনা।আমি তাকেই ভালোবেসে বসে আছি।যদিও গতকাল সে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে তার প্রতি আমার ফিলিংসগুলো শুধুই মরীচিকা। তাকে আমার পাওয়া হবে না।

গতকাল আমার জন্মদিন ছিলো। গত ন’বছরের মতো গতকালও সেই অজ্ঞাত নামে পার্সেল এসেছে। এটা তার পাঠানো ১০ ম পার্সেল।

আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমরা দু বোন। প্রভা আমার ছোট বোন। আমার আর ওর মধ্যে বয়সের তফাত দেড় বছর। আমার আর প্রভার মধ্যে গলায় গলায় ভাব।আমাদের মধ্যে ঝগড়া কখনই হয়না।দুজনই দুজন অন্ত প্রাণ।বাবা মা দুজনই চাকরিজীবী।

সেদিন আমার জন্মদিন ছিলো। আমি আর প্রভা বাসায়ই ছিলাম সেদিন। আম্মু আর বাবা তাড়াতাড়ি চলে আসবেন বলে আশ্বাস দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ভরদুপুরে কলিংবেল বেজে উঠায় আমরা ভেবেছিলাম আম্মু বাবা হয়তো চলে এসেছে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। অথচ আম্মুর কড়া রেসটিকশন ছিলো লুকিং গ্লাসে না দেখে কে সেটা শিউর না হয়ে দরজা খোলা যাবে না। সেদিন আমি এতোকিছু ভাবিনি। দরজা খুলে খুব অবাক হয়ে গেলাম। কেউ নেই। প্রভাও আমার পিছনে এসে দাঁড়ালো।

চারদিকে কাউকেই দেখলাম।প্রভা ফ্লোরের দিকে ইশারা করলো।
” আপু দেখো গিফট,,
ফ্লোরে তাকিয়ে দেখি আসলেই একটা পার্সেল রাখা। বক্সের ওপরে প্রাপকের জায়গায় আমার নামটা জ্বলজ্বল করছে।কিন্তু প্রেরকের জায়গায় ‘অজ্ঞাত’ লিখা।
আমি আর প্রভা অবাক হয়ে বক্সটা ভেতরে নিয়ে আসি।
বক্সটা খুলবো কি না ভাবছিলাম।
” আপু খুলে দেখ কি আছে ভেতরে।
” বক্সটা খুলা কি ঠিক হবে?
” ঠিক হবে না কেন? খুলে দেখ না কি আছে ভেতরে।
” কিন্তু কে পাঠিয়েছে সেটা তো জানিনা।অপরিচিত কারও গিফট,,
” তুই বক্সটা খুলে তো দেখ। হয়তো ভেতরে তার পরিচয় পাবি।

প্রভার কথায় বক্সটা খুললাম।
বক্স থেকে প্রথমেই বের হলো একটা বেলীফুলের মালা। এরপর পেলাম একটা কালো জমিনে সাদা সুতোয় হালকা কাজ করা আর সাদা পাড়ের একটা শাড়ী।শাড়ীটা ভীষণ সুন্দর। কালো আর সাদা ৪ ডজন কাচের চুড়ি। ২ পা-টি পায়েল। শাড়ীর সাথে ম্যাচ করে কানের দুল আর একটা বড়সড় ডাইরি সাথে কিছু বেশ সুন্দর কলম। তলানিতে পড়ে ছিলো একটা নীল কাগজের চিরকুট।

অতিউৎসাহী হয়ে কাগজের ভাজটা খুব জলদি খুললাম।
“বিভা,,
Happy birthday dear,,
Many many returns of the day.

আমি কে সেটা জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি? ইচ্ছেটা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। যখন সময় হবে আমি নিজেই তোমার সামনে এসে দাঁড়াবো। তার আগে আমি কে, কেন তোমাকে গিফট পাঠাই সেসব নিয়ে একদম চিন্তা করবে না। পড়াশোনায় মন দাও। আর আমার এই পার্সেলটার কথা ঘূর্ণাক্ষরেও কাউকে বলবে না। তোমার পাশের পিচ্চিটা তো জানেই ওকে বলে দিবে কাউকে না বলতে। অবশ্য তুমি নিজেও পিচ্ছি।

তোমার ডাইরি লেখার অভ্যাস আছে কি না জানিনা। তবে এখন থেকে করে ফেলো। যে ডাইরিটা পাঠিয়েছি তাতে আজ থেকে তুমি রোজ লিখবে।তোমার ভালো লাগা খারাপ লাগা সব লিখে রাখবে। প্রতিদিন একটা লাইন হলেও লিখবে।

আমি আবারও বলছি পড়াশোনায় কোনো প্রভাব যেন না পড়ে। পড়াশোনা ঠিক মতো না করলে আমি কখনই তোমার সামনে আসবো না।

ভালো থেকো। ডাইরির কোনো একটা পাতায় একটা ফোন নাম্বার লিখা আছে।

ওখানে ছোট্ট করে একটা মেসেজ দিবে।

তবে হ্যা তুমি কখনই কল দেওয়ার চেষ্টা করো না। আর আমি কে সেটা জানারও চেষ্টা করবে না।

*অজ্ঞাত

কাগজটা ভাজ করে আমি আর প্রভা একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম। দুজনেরই জিজ্ঞাসু দৃষ্টি। কে হতে পারে?
প্রভা আমাকে তাড়া দিলো জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলার। আম্মু চলে আসলে আর এসব জানলে খুব বকবে। দুজন মিলে গিফটগুলো কাভার্ড এ রেখে দিলাম।আম্মু কখনই আমাদের জিনিসপত্রে হাত দেয়না। আম্মু চাকরিজীবী বলেই নিজেদের কাজটা আমরা নিজেরাই করতে শিখে গেছি।

আম্মু আব্বু বিকেল নাগাত ফিরে আসে। ঘরোয়া ভাবেই আমার জন্মদিন পালন হয়।

রাতে আম্মু আব্বু শুয়ে পড়ার পর আমি ডাইরি নিয়ে বসলাম। কি লিখবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।

অনেক ভেবে লিখে রাখলাম এই দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কোনো একটা রহস্য এখান থেকেই শুরু।এর শেষটা কোথায় আমার জানা নেই। তবে সেই অজ্ঞাত লোকটা কে জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। তার পাঠানো গিফটগুলো আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

ডাইরির ঘেটে একটা পৃষ্ঠায় একটা নাম্বার খোঁজে পেলাম।

আম্মু আব্বু বাইরে থাকে বলে বাসায় একটা মোবাইল রেখে যায়। যদিও এই ফোনটাতে একচ্ছত্র আধিপত্য আমারই। ফোনটা হাতে নিয়ে নাম্বারটাতে হাই লিখে একটা টেক্সট করে নাম্বারটা ডিলেট করে দেই। আম্মু সচরাচর ফোন চেক করে না। তাও রিস্ক নিতে চাইনি। নাম্বারটা ততোক্ষণে আমার ব্রেনে সেভ হয়ে গেছে। খুব ইচ্ছে করছিলো নাম্বারটাতে একটা কল দিতে। শেষ অবধি ইচ্ছেটাকে আর পশ্রয় দেইনি। হঠাৎ ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠে।দেখলাম সে নাম্বার থেকে টেক্সট এসেছে। মনে হয়েছিলো আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে। যদিও তখন এতোকিছু বুঝিনি তবে একটা অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছিলো সেটা বুঝেছি।
মেসেজটা ওপেন করতেই দেখলাম
” থ্যাংকস।
আমি জানি তোমার কল দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমি কে সেটাও জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সঠিক সময় এখনও আসেনি।
অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পড়ো।
শুভরাত্রি।
মেসেজটা ডিলেট করে শুয়ে পড়ি। সকালে স্কুল আছে। বেশি রাত জাগা ঠিক হবে না।

সেদিন থেকেই আমার ডাইরি লেখা শুরু। এখন ডাইরি লেখাটা আমার নেশা হয়ে গেছে বলতে পারি। যাই ঘটুক আমাকে রাতে ডাইরি নিয়ে বসতেই হবে।

পরদিন থেকে আগের মতোই সব চলছে।স্কুল, বাসা,পড়াশোনা। তবে এরমধ্যে যুক্ত হয়েছে ডাইরি লেখা আর ফোনটা একটু পর পর চেক করা কোনো মেসেজ এসেছে কি না সেটা দেখার জন্য।
তবে সে মেসেজ খুব কম করতো।মাসে একটা মেসেজ আসতো তার। তাও আবার আমার কোনো কাজ তার ভালো না লাগলে সেটা জানানোর জন্য।

আমার ১৪ তম জন্মদিনেও সে পার্সেল পাঠিয়েছিলো।
সেখানেও একটা কলাপাতা রংয়ের শাড়ী, শাড়ীর সাথে ম্যাচিং কানের দুল আর চুড়ি, পায়েল সাথে ১৪ টা গোলাপ ফুল। ডাইরি আর কলম তো ছিলোই। ডাইরির ওপরে একটা ছোট্ট চিরকুট লাগানো ছিলো।
যাতে লিখা ছিলো
” তোমার প্রতিদিনকার ঘটনাগুলো লিখে রাখবে।তোমার ভালো লাগা খারাপ লাগা সব। একদিন হুট করে এসে ডাইরি গুলো চেয়ে বসবো। আর তোমার সব অনুভুতি, ভাবনাগুলো একেবারে জেনে যাবো।

এবারও তার কোনো পরিচয় পাইনি।
তবে সেদিন রাতে আমাকে অবাক করে দিয়ে তার কল আসে। ফোনের স্ক্রিনে তার নাম্বারটা দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন ঢিপঢিপ করছিলো।
কলটা রিসিভ করে চুপ করে রইলাম।
ওপাশের মানুষটাও চুপ।
আমিই প্রথম কথা বললাম।
” কেমন আছেন?
” প্রথমে সালাম দিতে হয় সেটা নিশ্চয় জানা আছে?
আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। আসলেই সালাম দেওয়া উচিত ছিলো।
” সরি।
” ইট’স ওকে। হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার।
” থ্যাংকস।
” মাই প্লেজার। বাই দ্যা ওয়ে গিফট পছন্দ হয়েছে?
” জ্বি।
” ডাইরি লিখছো তো রোজ?
” জ্বি।
” গুড। তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো।
” আপনি,,
আমি কথাটা শেষ করতে পারিনি।তার আগেই সে বলে উঠলো
” তোমাকে বলেছিলাম আমি কে সেই প্রশ্নটা আমাকে করবে না। আমিই তোমাকে বলবো আমি কে। তবে সেটা সঠিক সময়ে। রাখছি এখন।
বলেই সে কল কেটে দিলো।কি অদ্ভুত মানুষ!

এরপর আবারো তার মেসেজ হঠাৎ হঠাৎ আসতো।
একদিন আমি স্কুল থেকে বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফিরি।বাসায় আসার কিছুক্ষণ পরই সেই নাম্বার থেকে কল আসে।
কল রিসিভ করার পরই তার গুরুগম্ভীর কন্ঠটা শুনলাম। মনে হচ্ছিলো সে খুব রেগে আছে।
” আর কখনো বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় হাটবে না। আর কখনও যেন এরকম না হয়।
” কেন,,,
সে কিছু না বলে কল কেটে দিলো।
কিছুক্ষণ পর মেসেজ দিলো।
” বৃষ্টিতে ভেজার পর তোমার জামা শরীরের সাথে লেপ্টে ছিলো। তুমি বড় হচ্ছো সেটা ভুলে গেলে চলবে না। ভেজা কাপড়ে রাস্তায় হাটছিলে।রাস্তার লোকজন তোমাকে আড়চোখে দেখছিলো।আমি চাইনা তোমার বডি শেপ কেউ এভাবে দেখুক। আর কখনও যেন এরকম না হয়।

মেসেজটা পড়ে আমারও ভীষণ অসস্তি হচ্ছিলো। লজ্জাও পেয়েছি ভীষণ।
এরপর আর কখনওই আমি বৃষ্টিতে ভিজে ফিরিনি। বাইরে থাকা অবস্থায় বৃষ্টি হলে বৃষ্টি থামা অবধি অপেক্ষা করি নয়তো ছাতা নিয়ে বা রিক্সা করে ফিরে আসি।বৃষ্টি বিলাস নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছি এরপর থেকে।

পড়াশোনা, বাবা মা বোন আর তাকে নিয়ে ভালোই কাটতো সময়গুলো। ক্লাস এইটে বৃত্তিও পেলাম।সে ও খুব খুশি হলো।

পরের জন্মদিনে আবারও তার গিফট।তবে গিফটটা আসে জন্মদিনের পরের দিন।আমার জন্মদিনটা সেবার শুক্রবারে ছিলো।আম্মু আব্বু বাসায় থাকবে বলে সে গিফটটা পরের দিন পাঠাবে বলে আমাকে মেসেজ করে জানিয়েছিলো। আমি শরীর খারাপের বাহানা করে পরেরদিন স্কুলে যাইনি।

বারবার দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে লুকিংগ্লাসে দেখছিলাম কেউ আসে কি না। হতাশ হয়ে আমি রুমে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই কলিংবেল বেজে উঠলো। আমি দরজা খুলে শুধু পার্সেলটাই পেলাম।তখন আফসোস হলো আর একটু সময় থাকলেই হয়তো দেখতে পারতাম কে গিফট টা রেখে গেছে।

এবারও সেই একই গিফট। একটা সাদা জমিনের লাল পাড়ের শাড়ী,চুড়ি,কানের দুল, ডাইরি কলম আর বকুল ফুলের মালা।

আমার জন্মদিনের পরদিন থেকে নতুন ডাইরি লিখা শুরু করতাম। তার কথামতো একটা লাইন হলেও লিখতাম।
তার কল বা মেসেজ এর জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করতাম। যদিও এই তিনবছরে সে তিনবার কল দিয়েছে।

সে চতুর্থবার কল দেয় যখন আমি ক্লাস টেন এ পড়ি। আমি কোচিং শেষ করে আমার কিছু ছেলে ফ্রেন্ডস দের সাথে কথা বলতে বলতে বাসায় ফিরেছিলাম।এটা তার ভালো লাগেনি। সেটা জানানোর জন্যই কল দেওয়া। খুব অবাক হতাম। এই লোক কি সারাক্ষণ আমাকে ফলো করে নাকি? এরপর থেকে বাসা থেকে বের হলে বারবার আশেপাশে তাকাতাম।তাকে দেখার আশায়। কিন্তু দেখিনি কখনও।হয়তো দেখেছি কিন্তু চিনতে পারিনি।

আমার ১৬ তম জন্মদিনে সে বাসন্তী রংয়ের একটা শাড়ী দিয়েছিলো।আর বাকি জিনিসগুলো আগের মতোই।চুড়ি আর কানের দুল বরাবরের মতো শাড়ীর সাথে ম্যাচিং। সাথে কিছু কাঠগোলাপ।
” লোকটার পছন্দ অনেক ভালো রে আপু।
খুঁজে খুঁজে কি সুন্দর শাড়ী আর বাকি জিনিসগুলো কেনে। সৌখিন অনেক। কিন্তু কে বল তো?
” সেটা আমি কি করে বলবো? আমিও তো খুঁজছি।
” ইসস,,, তুই কতো লাকি বলতো,, তোর প্রতি জন্মদিনে কতো ভালো গিফট আসে তোর।
” তোর হিংসে হচ্ছে?
” কি যে বলিস, হিংসে হবে কেন? তুই লাকি সেটাই বললাম।
” হয়েছে এতো বলতে হবে না। নিজের কাজে যা।

এবার গিফট নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর সময় নেই। সামনে এক্সাম। রেজাল্ট ভালো করতে হবে। তাই পুরো কনসেনট্রেশান পড়াশোনাতে দিয়ে দিলাম। অন্যকিছু ভাবার সময় নেই এখন।

এবারও আমার রেজাল্ট ভালোই হলো৷ ভালো একটা কলেজে ভর্তিও হয়ে গেলাম।আম্মু আব্বু ছাড়াও আমার রেজাল্টে যে সবচেয়ে বেশি খুশি তিনি হলেন সেই অজ্ঞাত মানুষটি।

কলেজের নবীন বরন অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। বাসায় এসে ফ্রেস হয়েই লম্বা একটা ঘুম দিয়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিতেই দেখলাম সে ৮০ বারের কল দিয়েছিলো। আমি তো অবাক।এতোবার কল দেওয়ার কারন কি?
আমি কল ব্যাক করে ভাবছিলাম তখনই তার কল আসে।
আবারও তার থমথমে কন্ঠ।বুঝলাম কোনো কারনে রেগে আছে।
” এতোক্ষণ কি করছিলে।কল দিয়েছি দেখোনি?
” ঘুমাচ্ছিলাম।
” তুমি আজ কাজটা মুটেও ভালো করোনি।
” কোন কাজটা?
” কলেজে শাড়ী পড়ে যাওয়াটা। এতো সুন্দর করে সাজার কি দরকার ছিলো? ছেলেরা তোমাকে দেখছিলো।তোমাকে অন্যকারও চোখে দেখতে আমার ভালো লাগে না। আর কখনো খোলা চুলে কারও সামনে নিজেকে উপস্থাপন করবে না। আমি চাই না তোমার সৌন্দর্য বাইরের কেউ দেখুক। বোরকা পড়ে হিজাব করে যাবে এখন থেকে। মনে থাকবে?
” থাকবে।
” গুড গার্ল।

লোকটার প্রতি আমার একটা অন্যরকম এট্রাকশন ছিলো। কেনো জানিনা তার সব কথা আমি মেনে নিতাম।মেনে চলতাম।
ভালো লাগত তার কথা শুনতে।তার শাসনগুলো,বিধিনিষেধ গুলো আমাকে অন্যরকম ফিলিংস দিতো। তাকে দেখার ইচ্ছেটাও আরও তীব্র হতো।এদিকে তার কন্ঠের ওপর তো ক্রাশ খেয়ে বসেই আছি।তার বাচনভঙ্গি যেকোনো মেয়েকেই তার প্রতি উইক করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তার প্রতি নিজের ফিলিংসগুলো ও ডাইরিতে লিখে রাখতাম। সে বয়সে ভালোবাসা না বুঝলেও ভালোলাগাটা বুঝতাম। তাকে না দেখলেও আমার তাকে ভালো লাগতো।ভীষণরকম।
তবে সে কেন আড়ালে আছে সেটাই এখনো বুঝতে পারছি না।কবে সে সামনে আসবে সেটাও রহস্য।

কলেজে যাওয়া আসার পথে একটা ছেলে আমার পিছু নিচ্ছিলো কিছুদিন যাবত। ছেলেটা বখাটে নয়।তবে আমাকে নাকি তার ভালো লেগেছে।তাই প্রোপোজ করেছিলো। আমি রিজেক্ট করে দেই।তা সত্ত্বেও রোজ দাঁড়িয়ে থাকতো। আমার সাথে কথা বলতে চাইতো। আমি কখনই পাত্তা দেইনি।কথাও বলিনি সেভাবে।
একদিন হঠাৎ সে আমার হাত ধরে আমাকে দাঁড়াতে বলে। তার কিছু কথা বলার জন্য। তার হাত এক ঝটকায় ছাড়িয়ে আমি চলে এসেছিলাম।
তারপরদিন থেকে আমি আর ছেলেটাকে দেখিনি। আসা যাওয়ার পথে চোখ ঘরিয়ে চারদিকটা দেখতাম ছেলেটা আছে কিনা।তবে সেদিনের পর তাকে আর দেখিনি।মনে মনে খুব খুশিই হয়েছিলাম।
” কলেজ ছুটি হলে সোজা বাসায় চলে আসবে।আশেপাশে এতো তাকানোর কি আছে? কাউকে খুঁজো তাই না? লাভ নেই।তোমার আশিক আর কখনোই রাস্তায় দাড়াবে না।তাকে খুজে লাভ নেই। সে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।চলে গেছে বলা ঠিক হবে না বাধ্য করেছি চলে যেতে। তোমাকে অন্য কেউ দেখবে সেটাই সহ্য হয়না তোমাকে অন্য কেউ স্পর্শ করবে সেটা মানবো কি করে? আর তোমাকে বলছি আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা বাসায় আসবে। কোনো হেরফের যেন না হয়।

আমিও তার কথা মতো চুপচাপ বাসায় চলে আসতাম। কলেজ আর বাসা এইভাবেই চলছিলো।
সাথে তার টুকটাক মেসেজ আর হঠাৎ কল তো ছিলোই।

আমার পরের জন্মদিনে তার গিফটে একটু পরিবর্তন আসে। গিফট বক্সটা এবার সে একটা ছেলের হাতে পাঠিয়েছে। ছেলেটা এসে কলিংবেল বাজানোর পর দরজা খুলবো কি খুলবো না সে নিয়ে ভাবছিলাম। তিনবার কলিংবেল বাজানোর পর অবশেষে খুলেই দিলাম।
” আপনার নামে একটা পার্সেল এসেছে ম্যাডাম।
” কে পাঠিয়েছে?
” সেটা বলার পারমিশন নেই। আপনি নিন এটা।
” কিন্তু কে দিয়েছে?
” প্লিজ ম্যাডাম আমার কাছে জানতে চাইবেন না।সময় হলে নিজেই জানতে পারেন।
বক্সটা আমার হাতে দিয়েই সে হনহন করে চলে গেলো। আমি ভাবছিলাম সেই অজ্ঞাত মানুষটার গিফট এখনো এলো না।আবার নতুন কে গিফট পাঠানো শুরু করলো।গিফট বক্সের ওপর কিছুই লেখা নেই।

চলবে >>

(Visited 1 times, 1 visits today)