নারকেল গাছে বরফ

  •  
  •  
  •  
  •  

আজাদুল হক: ক্রীসেন্ট রোডে আমাদের টিনের বাড়িটা ছিল গাছগাছালীতে ভরা। আমরা যখন সাভারে থাকতাম তখন আব্বা এই জায়গাটা কিনেছিলেন। আমি আব্বার সাথে লাল রঙের ৫০ সিসি হোন্ডার সামনে বসে এখানে আসতাম।

আব্বা বলতেন এই বাড়িটা আমি তোমার নামে রাখব। সেই জন্য বাড়িটার নাম হয়েছিল “আজাদ মঞ্জিল”। চারিদিকে তখন খালি কাঁঠাল গাছ। তাই জায়গাটার নামই ছিল কাঁঠালবাগান। আমাদের বাসার মধ্যেও ছিল এক বিশাল কাঁঠাল গাছ। দেয়াল ঘেষে কিছু দূর পরপর আব্বা অনেকগুলো নারকেল গাছ লাগিয়েছিলেন।

লাগানোর সময় দেখি আব্বা কতগুলো লবন দিয়ে দিলেন তারপর মাটি দিয়ে গাছ লাগালেন। আমি জিজ্ঞেস করাতে আব্বা বলেছিলেন যে এই নারকেল গাছ হল নোনা জায়গার গাছ। তাই লবন দিলাম যাতে গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। আসলেই গাছগুলো তরতর করে বেড়ে উঠতে লাগল।

আমিও বেড়ে উঠলাম ওদের সাথে কিন্তু আমার সাইজটা আর বাড়লো না ওদের মত। আমি ক্লাস টেন পর্যন্ত বেটেই থেকে গেলাম। এই গাছগুলোর সাথে ছিল আমার ভিন্ন রকমের সখ্যতা। ওদের সাথে একা একা কথা বলতাম। আলগোছে আদর করতাম।

এই গাছ ছাড়াও ছিল আম, আঙ্গুর, তেজপাতা, এলাচি, দারুচিনি, পেয়ারা, কুল বড়ই, আতা, পেঁপে গাছ এবং আরো কত কি। ফুলের গাছ ছিল এতো বেশী যে অনেকগুলোর নামও মনে নেই। তবে আমার জানালার পাশের কামিনী ফুল আর গেটের পাশের শিউলী গাছের কথা ভুলি কি করে?

ওদের ঘ্রান তো এখনো নাকে ভাসে। আমি একা একা এই গাছগুলোর সাথে বহু সময় কাটিয়েছি। একেকটা নতুন পাতা গজালেই দৌড়ে এসে আম্মাকে জানাতাম। শীতের দিনগুলোর সকালবেলা গুলোর কথা বেশী করে মনে পরে। কারণ ঐ বছরের শেষ দিকে এসে যখন শীত আসত তখন স্কুল বন্ধ থাকত।

আমরা এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে উঠতাম। মাঝখানের সময়গুলোতে বাসায় থাকা হত আর সময় কাটাতাম এই গাছগাছালীর সাথে। এই নারকেল গাছগুলো তখন চার পাঁচ ফিট লম্বা হবে। একদিন এই রকম এক শীতের সকালে আমি নারকেল গাছের কাছে গিয়ে দেখি পাতাগুলোর মাঝখানে পানি জমে আছে আর সেটা ভীষণ ঠান্ডা।

আমি নিজেই তখন সোয়েটার, জাম্পার, মাথায় টুপি দিয়ে এক কিম্ভুতকিমাকার প্যাকেট। ঐ ততটুকু ঠান্ডাতেই আমি কাবু। তারপর হাত দিয়ে দেখি পানি আরো ঠাণ্ডা। আমি যে কি রকম অবাক হয়েছিলাম তা বলার মত না। বইতে পড়েছি বরফের কথা। আমি একেবারে নিশ্চিত যে এই পানি বরফ হবেই একদিন।

অথবা রাতে বরফ হয়েছিল এখন গলে পানি হয়েছে। আমি ইঞ্জেকশনের খালি শিশিতে পানি ভরে সব নারকেল গাছের পাতার ভেতর লুকিয়ে রাখলাম। এরপর কাকডাকা ভোরে কেউ ওঠার আগেই গিয়ে সোজা হাজির হতাম দেখার জন্য যে কোন শিশিতে বরফ জমেছে!

দুঃখের কথা আর কি বলব, কোনদিনও জমল না সেই পানি আর আমারও দেখা হয়নি বরফ! জীবনের আরেক অধ্যায়ে যখন শিকাগোতে গেলাম, তখন দেখলাম বরফ কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি। দেখলাম মানে কি, হাড় হাড্ডি দিয়ে টের পেলাম ঠাণ্ডা কাকে বলে। মগজ জমে যাবার মতন অবস্থা।

কি আর করা রীতিমত সেই ঠান্ডা থেকে পালিয়ে চলে গেলাম গরমের জায়গা টেক্সাসে। সেই গল্পগুলো না হয় হবে অন্য আরেকদিন, কি বলেন?

আজাদুল হক
আজাদুল হক

লেখক পরিচিতিঃ আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী তড়িৎ প্রকৌশলী; সাবেক কর্মী, জনসন স্পেস সেন্টার – নাসা, হিউষ্টন, টেক্সাস।
[ঢা-এফ/এ]

জানুয়ারি ১১, ২০২১ ৫:৪১

(Visited 21 times, 1 visits today)