দিনমজুর মানুষগুলো কারো চোখে পড়ে না

  •  
  •  
  •  
  •  

মুহাম্মদ দিদারুল ইসলাম: বিশ্বব্যাপী সকল শ্রেণীপেশার মানুষেরা কারোনা আতঙ্কের মধ্যে দিন অতিবাহিত করছে, বাংলাদেশেও এই আতঙ্ক আগের চেয়ে আরো বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিনির্ভর খাতগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

দেশের স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার গুলো ও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরেও আজ থেকে অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ।

এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য দ্রব্যের দাম অবিশ্বাস্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের ভ্রাম্যমাণ আদালত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চোখে পড়েছে সকলের। অনেকগুলো গণমাধ্যমেও এ নিয়ে খবর ছাপানো হয়েছে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেভাবে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাতে করে উন্নত কোন রাষ্ট্রের সমস্যা তৈরি না হলেও আমাদের দেশের জন্য এটি খুবই দৃষ্টিকটু এবং দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস। দীর্ঘদিন ধরে আরাম- আয়েশে বসে বসে খাওয়া তো দূরে থাক দেশের শতকরা ৮০ভাগ মানুষ এক সপ্তাহ টানা কাজ করতে না পারলে না খেয়ে মরতে হবে।

আজ পড়ন্ত বিকেলে চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ানহাট এলাকায় দিন মজুর শ্রমিক গুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুবই আশ্চর্য হয়েছি।পাশাপাশি তাদের বিষন্ন মুখ দেখে হৃদয়ের গভীরে এক অদৃশ্য ব্যথা অনুভব করেছি।

এগিয়ে গিয়ে একজনের সাথে কথা বলতেই জানতে পারলাম গত তিনদিন ধরে তাদের হাতে কোন কাজ নেই। সকালে ঠিকমতো নাস্তা করেও বাসা থেকে বের হতে পারেনি। বাড়ির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা জিজ্ঞেস করতেই যেন চোখের জল গড়িয়ে পড়বে এমন অবস্থা!

তারপরেও এই দুরবস্থা খুব শীঘ্রই ঠিক হয়ে যাবে বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কিছুটা তফাতে এসে দাঁড়িয়ে থাকলাম। খুবই ইচ্ছে হলো লোকগুলোর জন্য কিছু একটা করতে!

চারিদিকে লক্ষ লক্ষ টাকার নির্বাচনী পোস্টার ঝুলছে মাটি থেকে দৃষ্টিসীমার কিছুটা উপরে! তা দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো এই মানুষগুলোকে দেশের নাগরিক হিসেবে গণনা করা হয়তো! তারা কি এই সমস্ত প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবে!

একটু বাম পাশে ঘুরে যাত্রী ছাউনীর করুণ অবস্থা দেখতে পেলাম। বসতে গিয়ে দেখলাম যেকোনো মুহূর্তে পরনের কাপড় ছিঁড়ে যাওয়াসহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারি। তবুও সেখানে কোনরকম বসে কিছুক্ষণ ধরে চারিদিকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম দুই-একজন ভিক্ষুক এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছে, কখনো এর কাছে বা কখনো ওর কাছে গিয়ে হাত পাতছে। অধিকাংশ মানুষ সামর্থ্য থাকলেও ভিক্ষা দিতে চায় না।

এরই মধ্যে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক থাকার কারণে কোন মানুষ ভিখারীর সামনাসামনি দাঁড়াবে তো দূরে থাক পাশ দিয়ে পর্যন্ত যেতে চাইছে না।

যে সমস্ত দিনমজুর মানুষ গুলো দাঁড়িয়ে আছে তাদের কাছাকাছি গিয়ে আবারো কথা বলার চেষ্টা করলাম, একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম আজকে রাতে খাওয়ার জন্য বাসায় কিছু আছে কি?
তিনি অনেকটা দীর্ঘ প্রশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলেন কারো কাছ থেকে ধার দেনা করে কোনরকম কিছু চাল নিতে পারি কিনা দেখি।

এরই মধ্যে তিনি আবার অভিযোগ করে বললেন, ভাই আমাগো দেশের কি আইবো? শুনছি অন্য দেশের সরকার তাগোরে সাহায্য দিতাছে, আর আমাগো দেশে চাইলের দাম নাকি আবারো বাইড়া গেছে?
আমিও মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলাম হ্যাঁ কিছুটা বেড়েছে!

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে যারা নিজেদের খুব ধার্মিক দাবি করেন তাদের বলতে শুনেছি এগুলো স্রষ্টা গজব দিয়ে থাকেন, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সেই গজব তাদের উপর গিয়ে পড়ে যারা স্রষ্টার কোনভাবে কোন ধরনের লাভ না করুক অন্তত ক্ষতি করেননি।

অর্থের বিচারে সমাজের তথাকথিত উচ্চশ্রেণীর মানুষগুলো বছর দুয়েক বসে বসে খেলেও তাদের সে অর্থ শেষ হবে না। কিন্তু দিনমজুর মানুষগুলোর কি অবস্থা হবে?

যারা আগামী দুইদিন বাড়ি থেকে বের হতে না পারলে কাজ করতে না পারলে ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করতে করতে হামাগুড়ি দিতে থাকবে। তাদের পরিবারের শিশু সন্তান কিংবা বৃদ্ধদের কি অবস্থা হবে!

সরকার তাদের কথা চিন্তা করবে কিভাবে জানিনা, ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটাল সানগ্লাসে এসমস্ত দিনমজুর মানুষগুলো কারো চোখে পড়ে না! তাদেরও বা চোখে পড়বে কেন যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি যে তাদের তিলে তিলে মারবেন এমন হুকুম সৃষ্টির পূর্বেই হয়তোবা ঠিক করে রেখেছিলেন।

লেখক: মুহাম্মদ দিদারুল ইসলাম
কলামিস্ট ও সাংবাদিক।

ঢা/এফএইচপি

মার্চ ২১, ২০২০ ৮:০৬

(Visited 32 times, 1 visits today)