ঢাকা১৮ ডটকমের সংবাদে দুর্নীতিবাজ মালেকের প্রতিনিধিত্ব বাতিল, আবেদনেও শেষ রক্ষা হল না

নুরুল আমিন হাসান : উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক আব্দুল মালেকের দুর্নীতি নিয়ে ঢাকা১৮ ডটকমে ‘উত্তরা হাইস্কুল: শিক্ষকের যদি থাকে এত দুর্নীতি, শিক্ষা দিবেন কি!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। সংবাদের পর পরই উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের ওই দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের গভর্ণিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি পদ স্থগিত হয়। পরবর্তীতে তিনি পুন:বহালের জন্য আবেদন করলে তার সদস্যপদ বাতিল করে দেওয়া হয়।

রোবাবার (০৫ মে) ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জুনিয়র শিক্ষক আব্দুল মালেকের গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

এর আগে গত ২৪ এপ্রিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক ড. মো. হারুণ অর রশিদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তার শিক্ষক প্রতিনিধিত্ব পদ বাতিল করা হয়।

আরো পড়ুন : ঢাকা১৮ ডটকম’র সংবাদে দুর্নীতিবাজ শিক্ষক প্রতিনিধি মালেক প্রত্যাহার

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর হতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ সংকা্রন্ত ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ের ০৪ তারিখের জারিকৃত পত্রের ৬ নম্বর শর্ত বোর্ডের ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বরের সংশোধিত  ২০০৯ এর প্রবিধানমালা ৪(১)খ অনুযায়ী জুনিয়র শিক্ষক আব্দুল মালেকের সদস্যপদ বাতিল করা হয়।
এত আরো বলা হয়, আব্দুল মালেক ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে উত্তরা হাইস্কুলের প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে মাধ্যমিক শাখার শিক্ষক প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচনের কোন সুযোগ নেই। কিন্ত তিনি নিয়ম বহির্ভূতভাবে নির্বাচন করে শিক্ষক প্রতিনিধি হয়েছিলেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ের ০৪ তারিখের জারিকৃত পত্রের ৬ নম্বর শর্তানুযায়ী প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করিয়া প্রমোশনের মাধ্যমে সহসহকারী শিক্ষকের পদে উন্নীত করা যাবে না মর্মে নির্দেশনা নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তিনি শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অমান্য করে মাধ্যমিক শাখার শিক্ষক হিসাবে এমপিও ভুক্ত হয়েছেন। অপরদিকে মাধ্যমিক শাখার গভর্নি বডির শিক্ষক প্রতিনিধিও হয়েছিলেন। ঢাকা১৮ ডটকমের সংবাদ পর তা শিক্ষা বোর্ডের নজরে আসলে শিক্ষক প্রতিনিধি প্রত্যাহার হয়। যদিও মাধ্যমিক এমপিও ভুক্তি এখনো রয়েছেন।

আরো পড়ুন : উত্তরা হাইস্কুল : শিক্ষকের যদি থাকে এত দুর্নীতি, তাহলে শিক্ষা দিবেন কি!

মাধ্যমিক শাখার এমপিও ভুক্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেন, ‘আমাদের এমপিও ভুক্তি বাতিল করার এখতিয়ার নেই।আমাদের গভর্নিং বডির শিক্ষক বাতিলের এখতিয়ার ছিল, তা আমরা করেছি। কিন্তু এমপিও ভুক্তি বাতিলের বিষয়টি দেখবে শিক্ষা অধিদপ্তর‌।

শিক্ষা অধিপ্তরে যোগাযোগ করা হলে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ‘উত্তরা হাইস্কুলের প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক আব্দুল মালেকের মাধ্যমিক শাখার এমপিও ভুক্তির বিষয়টি ঢাকা১৮ ডটকমের সংবাদে নজরে এসছে শিক্ষা অধিদপ্তেরের। সেই সাথে শিক্ষক মালেকের এমপিও ভুক্তি বাতিল করা প্রসঙ্গে কাজ করছে শিক্ষা অধিদপ্তর। যা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও তিনি জানান।

এছাড়াও শিক্ষা বোর্ডের ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর সংশোধিত (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের  গভর্ণিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি) প্রবিধানমালা, ২০০৯ এর  প্রবিধান-৪(১)খ মতে- ‘উচ্চমাধ্যমিক স্তরের কোন বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক স্তর সংযুক্ত থাকিলে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকগণের মধ্য হইতে তাদের ভোটে একজন শিক্ষক নির্বাচিত হবেন। সেই ক্ষেত্রে মোট নির্বাচিত সাধারণ শিক্ষক সদস্য দুই জনের পরিবর্তে তিন জন হতে পারবে।

কিন্তু উত্তরা হাইস্কুলে প্রাথমিক শাখা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক শাখার কোন গভর্ণিং বডি নেই। অপরদিকে প্রাথমিক শাখার শিক্ষকরাই মাধ্যমিক শাখার গভর্ণিং বডিতে ছিলেন। যা শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম বহির্ভত।

আরো পড়ুন : ঢাকা১৮ ডটকম’র রিপোর্টে টনক নড়েছে শিক্ষা বোর্ডের, উত্তরা হাইস্কুলের ২ অভিভাবক সদস্য প্রত্যাহার

এদিকে উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের অভিভাবক সদস্যরা বলেন, একজন প্রাথমিক শাখার শিক্ষক দুর্নীতির মাধ্যমে মাধ্যমিক শাখার এমপিও ভুক্ত হয়েছেন। আবার মাধ্যমিক শাখার গভর্ণিং বডিতেও অবৈধভাবে ছিলেন। আর উত্তরার হাইস্কুলের অভিভাবক ও সরকারের কাছ থেকে প্রতি বছরেই হাতিয়ে নিচ্ছেন ১০ রাখ টাকারও বেশী।

অভিভাবক কাশেম বলেন, ‘শিক্ষক হল মানুষ গড়ার কারিগর। তিনি নরম কাঁদা মাটিতে মূর্তি বানানোর মত করে একটা অবুঝ শিশুকে শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেন।কিন্তু সেই শিক্ষকেরই নীতি ঠিক না থাকে, দুর্নীতিবাজ হন, তাহলে তিনি কি শিক্ষা দিবেন? আর তার কাছ থেকে দুর্নীতি ছাড়াও কি বা-ই শিক্ষা নিতে পারেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে উত্তরা হাইস্কুলের সচেতন শিক্ষকরা বলেন, ‘শুধু মালেই নন, প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক হয়ে মাধ্যমিক শাখার এমপিওভুক্ত হয়েছেন এমন আরো ১৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। তারাও একইবাবে সরকার ও স্কুলের ফান্ড থেকে প্রতিমাসে অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকারও বেশী করে হাতিয়ে নিচ্ছেন।
এদিকে শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজকে দেওয়া গত জানুয়ারির ৩০ তারিখে বোর্ডের প্রত্র নং- ২৬৫/ক/অনু/০৯/২৫০১ এর জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় শিক্ষক প্রতিনিধি মো. আব্দুল মালেকের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। যা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গর্ভনিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির গঠন সংক্রান্ত প্রবিধানমালা ২০০৯ অনুসরণ করা হয়েছে।

এর আগে গত ২৩ মার্চ বৃহস্পতিবার শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের আদেশক্রমে কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর ড. মো. হারুন অর রশিদ স্বাক্ষরিত অপর এক বিজ্ঞপ্তিতে গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য মো. আবেদ আলী ও দেলোয়ার হোসেন নামের দুই জনের সদস্যপদ বাতিল করা হয়।

তার আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডির উচ্চ মাধ্যমিক শাখার বেআইনী ও অবৈধভাবে দুই অভিভাবক সদস্যে আবেদ আলী ও দেলোয়ার হোসেন এবং শিক্ষক প্রতিনিধি আব্দুল মালেকের সদস্যপদ বাতিল করার প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেন একজন অভিভাবক।

উত্তরা হাই স্কুলের সচেতচন মহল জানায়, প্রাথমিক শাখার জুনিয়র শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও মাধ্যমিক শাখার এমপিও ভুক্তির মাধ্যমে সরকার ও অত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায়  ২০ বছর যাবৎ অবৈবধভাবে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

তাছাড়াও প্রায় ১০ মাস তিনি বিধি বহির্ভূতভাবে উত্তরা হাইস্কুলের দিবা শাখার ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বপালন করেন। এমন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তারা। অভিভাবকদের দাবি, এমন অভিযোগ শুধু মালেকের বিরুদ্ধে নয়, প্রাইমারী শাখার অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে রয়েছে। স্কুলের সুনাম রক্ষার্থে এসব তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

আরো পড়ুন : উত্তরা হাইস্কুলের উচ্চমান সহকারীর রমরমা ফরম ফিলআপ বাণিজ্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )