ট্রাম্প-ওবামার ঘৃণ্য রাজনৈতিক সংঘাত

মোঃ শফিকুল আলমঃ আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্সি হেয় করার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেছেন।
অপরদিকে ওবামা দেশে আইনের শাসন ধ্বংস করে দেয়ার জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বারাক ওবামা
একে অপরকে অনেক দিন থেকে স্বাভাবিক রাজনীতির রীতি ছাড়িয়ে ঘৃনা করছেন।
তাঁদের মধ্যকার বিবাদ এখন অনেকটা প্রতীয়মান এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে তীব্রভাবে গ্রথিত হয়েছে এবং দিনে দিনে
তীব্রতর হচ্ছে।২০১১ সালেই ট্রাম্প বার্থার মুভমেন্ট করে ওবামার জন্মস্থান এবং নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

অর্থাৎ ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনেক পূর্বেই দু’জনের ব্যক্তিগত রেষারেষি শুরু হয়েছিলো।২০১৬ এর
নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় এবং ওবামার উত্তরাধিকার হিসেবে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের আসন অলংকরণ
ছিলো ব্যক্তিগতভাবে ওবামার জন্য দূর্ঘটনা।অনেকের মতে পুরো আমেরিকার জনগনের জন্য ২০১৬ ছিলো
একটি দূর্ঘটনাকাল।ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে মিশেল ওবামার বিষন্ন মুখাবয়ব যেনো ওবামার হৃদয়ের
অনুভূতি প্রকাশ করছিলো।

ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্সির সময়কালীন ওবামার স্মৃতি আমেরিকার জনগনের হৃদয় চোখ থেকে মুছে দেবার চেষ্টা করেছেন
এবং এখনও করছেন। ইরানের সাথে ওবামার নিউক্লিয়ার ডীল, পেরিস ক্লাইমেট চুক্তি থেকে আমেরিকাকে তুলে নেয়া,
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সাধারন মানুষের সামর্থের মধ্যে আনায়ন (ওবামাকেয়ার হিসেবে পরিচিত) ইত্যাদি বাতিলের মাধ্যমে
ব্যক্তি ওবামার প্রতি ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ঝেড়েছেন বলেই অনেকে মনে করেন।কারন ট্রাম্প হোয়াইট
সুপ্রিমেসি রাজনীতির শ্লোগান প্রতিষ্ঠিত করেই ২০১৬’র নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন।ট্রাম্পকে দেখা যায়
অনবরত ট্যুইটারে ওবামার শাসনকালীন সময়ের সকল বিষয়ের সমালোচনা করছেন। ওবামাকে দেখা গেছে অধিকাংশ সময়ে কোনো উত্তর না দিয়ে নীরব থাকছেন।

কিন্তু নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্যনির্বাচনকে সামনে রেখে দু’জনে মনে হচ্ছে উত্তেজিত মুষ্ঠিযোদ্ধাদের মতো হাতের গ্লোবস খুলে রেখেই খেলতে নেমেছেন।ওবামা এ মাসের প্রথমেই অনেকটা প্রকাশ্যেই হোয়াইট হাউজের করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপেরসমালোচনা করেছেন। তিনি হোয়াইট হাউজ অনেকটা বিশৃঙ্খল রয়েছে বলে অভিহিত করেছেন।গত উইকএন্ডে ওবামা একটি কলেজ ফাংশনে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় প্রচারিত বক্তৃতায় বলেছেন,করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দায়িত্ববানরাই বলতে পারবেন তারা কতোটা দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেকেই ভাব প্রকাশ করছেন যে এসব ম্যানেজ করা তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পরেনা বা তারা কোনো দায়িত্বে নেই।অপর দিকে ট্রাম্প এ সপ্তাহের প্রারম্ভে আমেরিকার ইতিহাসে ওবামার প্রেসিডেন্সিকে অদক্ষ এবং দুর্নীতিপরায়ন হিসেবে বর্ননা করেছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকগন মনে করছেন ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এক ধাপ এগিয়ে ওবামাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে বসিয়ে এবং টার্গেট করে পূনর্নিবাচিত হতে চাইবেন।

পক্ষান্তরে, পরোক্ষভাবে ট্রাম্প তাঁর পুরনো হোয়াইট সুপ্রিমেসি কৌশলেই ফিরবেন। ট্রাম্প সরাসরি ওবামাকে জানুয়ারী ২০১৭ সালে তাঁর আসন্ন প্রেসিডেন্সিকে হেয় করার জন্য ওবাবামা তাঁর শেষ সময়ে ষড়যন্ত্র করেছেন বলেও বলছেন। এবং তা’ ছিলো রাশিয়ার নির্বাচন মেনুপুলেশন ষড়যন্ত্র তদন্তকরন প্রক্রিয়া। যেহেতু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ছিলেন ওবামা প্রেসিডেন্সির ভাইস প্রেসিডেন্ট; সুতরাং ট্রাম্পের ক্যাম্পেইনের মূল টার্গেট শুধু জো বাইডেনই নন ওবামাও। কথিত রাশিয়ার ইলেকশন মেনুপুলেশন ষড়যন্ত্রকে ট্রাম্প বরং ওয়াটারগেটের মতো ওবামাগেট বলে অবিহিত করেছেন। ট্রাম্প বলেন ওবামাগেট আমেরিকার ইতিহাসে সবচাইতে বড় রাজনৈতিক অপরাধ। এই অপরাধের জন্য ট্রাম্প নিজেকে নয় ওবামাকে দায়ী করছেন। যদিও এর বেনিফিট ভোগ করছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন এটাকে রাষ্ট্রদ্রহীতা বলুন বা যা’ খুশী তাই বলুন। এই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করার ষড়যন্ত্র করেছিলো।আমেরিকার গনমাধ্যমও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে।

অনেকটা রাজনৈতিকভাবে লাইনড আপ হয়েছে। লিবারেল মেইন স্ট্রীম মিডিয়াগুলো ইস্যুটিকে হালকাভাবে নিয়ে হাস্যকর বিতর্ক অবিহিত করে করোনাভাইরাসে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যর্থ ট্রাম্প জনগনের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে এ ধরনের হাস্যকর যুক্তির অবতারনা করছেন বলে মনে করে।অপরদিকে কনজার্ভেটিভ মিডিয়াগুলো ট্রাম্পের বক্তব্যকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে ওবামার ওপর আক্রমনকে যুক্তিসংগত মনে করছে।জো বাইডেন এই বিতর্কে অংশগ্রহনে অনীহা ব্যক্ত করেছেন।

তিনি মনে করেন ট্রাম্প কপোনাভাইরাস মোকাবেলায় ব্যর্থতা ঢাকার জন্য এবং জনগনের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতে অহেতুক বিতর্ক করছেন। বাইডেন আরও বলেন যে এধরনের খেলা সব সময়ই খেলতে থাকেন। দেশ এখন ক্রাইসিস ফেইস করছে। অথচ ট্রাম্প প্রকৃত সমস্যা এড়াতে সচেষ্ট রয়েছেন বলে বাইডেন মনে করেন।ট্রাম্প অবশ্য অনবরত ওবামা এবং বাইডেনকে আক্রমন করে যাচ্ছেন। পূন: পূন: ট্যুইটিং করছেন।

২০১৬ এর নির্বাচন পরবর্তী তদন্ত ইস্যুকে বরং এবছর ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী ইস্যুতে পরিনত করছেন। তবে ট্রাম্প ওবামাগেট ইস্যু কতোটা জনগনকে বোঝাতে পারবেন বা এর থেকে কতোটা বেনিফিট নিতে পারবেন সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞগন সন্দিহান। তবে ইস্যুটিকে জীবন্ত রাখতে ট্রাম্প রিপাবলিকানদেরকে অনুরোধ রেখেছেন।ট্রাম্পের ঘনিষ্ট রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বক্তকেই আসলে শিরোনাম করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ আমাদের বর্তমান (ট্রাম্প) প্রেসিডেন্ট রয়েছেন যিনি সাবেক প্রেসিডেন্টকে (ওবামা) তাঁর (ওবামা) প্রেসিডেন্সিকে হেয় করে রাষ্ট্রদ্রহীতার অপরাধ করেছেন বলে মনে করেন। আমাদের সাবেক (ওবামা) প্রসিডেন্ট রয়েছেন যিনি বর্তমান (ট্রাম্প) প্রেসিডেন্টকে আইনের শাসন ধ্বংস করার অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন।”তিনি আরও বলেন, “ আমরা একে অপরকে হেয় করার একটি অস্বাভাবিক যুগে বাস করছি।”

মোঃ শফিকুল আলম
মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

(Visited 1 times, 1 visits today)