জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন স্বপ্নদ্রষ্টা আতিফ আসাদ

জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন স্বপ্নদ্রষ্টা আতিফ আসাদ
  •  
  •  
  •  
  •  

রাকিব হাসান নয়ন : ছোট থেকে স্বপ্ন ছিল পাঠাগার গড়ে তোলার, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন আতিফ আসাদ। ছোটবেলার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পূর্ণতা দিতে আতিফ গড়ে তুলেছেন ‘শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগার’। জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাসড়া মাজালিয়ায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন পাঠাগারটির।

অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আতিফ আসাদ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করছেন জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে। বাবা মা ৭ ভাই বোনের বিশাল পরিবারে কষ্টেই বড় হয়েছেন আতিফ আসাদ। এতো বড় একটি পরিবার চালাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছিলেন আতিফের বাবা। বাবার এই কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে এবং নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে ছোট থেকেই বিভিন্ন কাজ করে উপার্জন করা শুরু করেছিল আতিফ।

অর্থের যোগান দিতে পড়াশোনার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রী, খাট বার্নিশ ও ধান কাটার কাজ করেছেন আতিফ। এরপরেও লেগেই থাকতো অর্থের অভাব। ফলস্বরূপ আতিফরা সাত ভাইবোন প্রয়োজনীয় বই খাতার চাহিদা পূরণ করতে পারতেন না কখনোই। নিয়মিত স্কুলেও যেতে পারতেন না তারা, প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাওয়া তো অলীক কল্পনা।

মূলত বইয়ের প্রতি প্রবল ভালোবাসার জন্ম সেখান থেকেই, স্বপ্ন দেখেছিলেন পাঠাগার গড়ে তোলার, অর্থের অভাবে তখন তা সম্ভব না হলেও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি আতিফ। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রথম নিজের ঘরের বারান্দায় একটি পাঠাগার নির্মাণ করেন তিনি।

আতিফের মতে, একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। লেখাপড়ার খরচ যোগাতে গিয়ে বাবা-মাকে হিমশিম খেতে হয়। তাই পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই কিনে জ্ঞান অর্জন করা অসম্ভব। এজন্য আতিফ শুরুতে বিনামূল্যে বই পাঠদানের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে পাঠাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।

কিন্তু বিধি বাম! স্বপ্ন পূরণের আগেই হারিয়ে যায় আতিফের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গী। জমি সংক্রান্ত বিরোধে অকালে প্রাণ হারান আতিফের ভাই। ২০১৮ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তার ভাইকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ খবরে ভেঙ্গে পড়েন আতিফ। তবে ছোট থেকেই হার না মানা আতিফ এই ধাক্কাও সামলে নিয়েছিলো। নিজের স্বপ্ন ও ভাইয়ের পথ প্রদর্শনকে জোড়া লাগিয়ে মাত্র ২০টি বই নিয়ে ভাইয়ের নামেই, ‘মিলন স্মৃতি পাঠাগার’ গড়ে তোলেন তিনি।

প্রথম থেকেই আতিফ আসাদের আত্মবিশ্বাস ছিল- যেহতেু তিনি নিঃস্বার্থভাবে ভাল কাজের দায়িত্ব কাধে তুলে নিয়েছেন, তার এ যাত্রায় ভালো মুনষগুলো অবশ্যই সঙ্গী হবেন। তিনি ভুল ভাবেন নি- বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুদান পেয়েছেন তিনি, বইও এসেছে অনেক। এভাবেই দিন দিন বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে পাঠাগারে আর বাস্তবায়নের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে আতিফের স্বপ্ন।

আতিফ বলেন, আমি অনেক গান করতাম। আমাদের বাড়ীতে এখনও বাউল গানের আসর হয়। ধর্মীয় লোকদের একটা বাধা তো থাকেই। তবুও এই সংস্কৃতি ধরে রেখেছি আমি। আমি নিজেও গান লিখতাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সেগুলো গাইতাম। বড় ভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো আমি সংগীতশিল্পী হবো। আমার স্কুলের শিক্ষকরা সহ বন্ধু সবাই বলতো গানটা আকড়ে ধরতে।

“আমারও ইচ্ছে ছিলো কিন্তু ভাই মারা যাওয়ার পর সব ছেড়ে দিয়ে বই বিলানোর কাজকেই আপন করে নিয়েছি। কারণ ভাইকে হত্যার দিন রাতেও মঞ্চে গান গাচ্ছিলাম আমি, এখন ভাবি আমি যদি সেদিন রাতে বাড়ীতে থাকতাম তাহলে হয়তো ভাইকে বাঁচাতে পারতাম। অভিশপ্ত মনে হতো নিজেকে।”

আতিফ জানান, প্রায় ১০০ পাঠক আছে পাঠাগারের। সময় ভেদে কম বা অনেক বেশিও হয়। শুরুর দিকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতাম। বই রাখার মতে জায়গা না থাকা, ঘর সংকট তো আছেই। অনেকে উপহাস করতো টিটকারি দিয়ে কথা বলতো। এখনও বলে। কি শুরু করেছে ছেলেটা, এখন কি আর এই বইগুলো পড়ে কেউ! লেখাপড়া না করে মানুষের সেবা করবে! অনেকে সামনে না বললেও পিছে পিছে পাগল বলতো। তাতে আমার কষ্ট লাগতো কিন্তু দমে যাইনি। মনের মধ্যে একটি কথাই থাকতো আমার অবসর সময় টুকু মানুষের জীবনকে আলোকিত করার কাজে লাগাচ্ছি।

“প্রথমে তো পাঠাগার কি বুঝতোই না অনেকে‌ পাঠাগারের সব বই কুরিয়ারে আসে উপজেলায়। ৮-১০ কিলো সাইকেল চালিয়ে নিয়ে আসতে হয়। একদিন আমি আর আমার বন্ধু সবুজ কুরিয়ার থেকে বই নিয়ে বাড়ী ফিরছি। তখন এক লোক বলতাছে, এতগুলো বই দিয়ে কি করবে? পাঠাগারে কি বই বিক্রি হয়? সবার ধারণাও ছিলো না পাঠাগারে বই বিক্রি নয় বিনামূল্যে পড়া যায়। এই জিনিসগুলো বুঝিয়ে পাঠক তৈরী করা শুরুতে একটু সমস্যাই ছিলো। ”

আতিফ বলেন, মাঝে মাঝে টাকা না থাকলে জামালপুর শহর কুরিয়ারে থেকে ৪০ কিলো সাইকেল চালিয়ে বই আনতে যেতে হয়। আবার লেখাপড়ার খরচের যোগান দিতে দূরে কোথাও দীর্ঘ সময় কাজ করতে গেলে বা আমি কোন কারনে বাড়িতে না থাকলে আমার মা যেহেতু বাড়ীতে থাকেন তিনিই বই দেন এবং সংগ্রহ করেন।

আতিফের পাঠাগারের পাঠকদের মধ্যে বেশির ভাগই ছাত্রছাত্রী। বিনামূল্যে বই পড়তে পেরে বেশ আনন্দিত তারা। এই বয়সে এরকম একটা উদ্যোগ নেবার কারণে গ্রামবাসীও তাকে অনেক ভালোবাসেন। আতিফ চান, বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামে যেন একটা করে পাঠাগার গড়ে ওঠে। জ্ঞানের আলো যেন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

সবশেষে তিনি জানান, তার এই উদ্যোগে যদি গ্রামবাসীর উপকার হয় এবং তারা যদি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন হতে পারেন এতেই তিনি খুশি।

ঢা/আরকেএস

সেপ্টেম্বর ৫, ২০২০ ৮:৫৮

(Visited 73 times, 1 visits today)