জাতীয় শোকের মাস আগস্ট এবং বর্তমান আওয়ামীলীগ

  •  
  •  
  •  
  •  

মুক্তমত ডেস্ক: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর সাধারন বাঙ্গালী, আওয়ামীলীগ সমর্থক, নেতা-কর্মী নীরবে বা সরবে এই দিনটি অত্যন্ত ভাব এবং গাম্ভীর্যের সাথে পালন করে আসছিলো।

সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে এই দিনে যখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারন করার অধিকার ছিলোনা তখনও মানুষ নীরবে চোখের জল ঝরিয়েছে। অনেকে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছে। এমনকি হাসতে হাসতে জীবন উৎসর্গ করেছে।

বঙ্গবন্ধুকে তখনও অনেকে বিস্তারিত জানতোনা। অতোটা গভীরে জানার প্রয়োজনও ছিলোনা। ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর কন্ঠে উচ্চারিত এই অমোঘ বানী শ্রবনই যথেষ্ট ছিলো। রক্তে শিহরন জাগানো এই বজ্র কন্ঠের দৃঢ় উচ্চারনই সেদিন নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে অকাতরে জীবন বাজী রেখে দেশ স্বাধীন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো।

সাধারন বাঙ্গালী শুধু এতোটুকুনই জানতো যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শোষন থেকে বাঙ্গালী জাতির মুক্তি চায়। প্রত্যেক মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। এর বেশী সাধারন মানুষের জানার প্রয়োজন ছিলোনা।

সাধারন বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধুর চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে কতোটা স্পষ্ট ধারনা পোষন করতো সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ রয়েছে। ৯০% এর অধিক মুসলমানের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটির ব্যাখ্যা দেয়া অত্যন্ত কঠিন ছিলো।

মানুষতো ওসবের অর্থ বোঝার চেষ্টা করেনি। তারা বুঝেছিলো শেখ মুজিবকে। তারা চিনেছিলো শেখ মুজিবকে। এতো বড় ক্যারিশম্যাটিক নেতা ইতিহাসে বিরল। একটি প্রায় অশিক্ষিত এবং অনেকটা ধর্মানুভূতিশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই জাগরন তৈরীর ঘটনা ইতোপূর্বে ঘটেছে কি-না তাতেও সন্দেহ রয়েছে।

হ্যাঁ, একেবারেই স্বল্প সংখ্যক মধ্যবিত্ত শ্রেনী বিশেষ করে শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, ছাত্রসমাজ তাঁর বা আওয়ামীলীগের কোর আদর্শের কথা বুঝতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ যে বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় (বিশেষ করে নিজেদেরকে প্রগতিশীল দাবী করতেন) তখন আওয়ামীলীগের তেমন অনুসরনযোগ্য আদর্শ নেই বলে প্রচার করতেন তারাই মূলত বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু ৬৬ সালের ৬ দফায় কি বলতে চেয়েছিলেন বা চার মূলনীতি গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ কি জিনিস।

তারা অবশ্য জেনে শুনেই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করতেন। আওয়ামীলীগের আদর্শ ছিলো বলেই ৭০’র নির্বাচনে আওয়ামীলীগ দেশের মানুষের ম্যান্ডেট পেয়েছিলো এবং বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের মানুষের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহনের অধিকার পেয়েছিলেন।

যারা এক সময়ে প্রগতিশীলতার নামে আওয়ামীলীগের কোনো আদর্শ নেই বলেছিলেন তারা এখন মনেপ্রাণে আওয়ামীলীগের মূলনীতিকে এখন ঘনো ঘনো উচ্চারন করেন। তারা ৬ দফার কারনে দেশের স্বাধীনতা এসেছে বলে এখন উচ্চকন্ঠ। কিন্তু আওয়ামীলীগ দলটির এখন কি অবস্থা? তারা কি আর গনতন্ত্রের চর্চায় রয়েছে? তারা কি এখন চার মূলনীতিতে বিশ্বাস করে? অথবা অনুসরন করে?

যারা এক সময়ে বঙ্গবন্ধুকে পুরোপুরি না জেনেই আত্মোৎস্বর্গ করেছিলো বা করতে প্রস্তুত ছিলো তারা এবং পরবর্তী প্রজন্ম এখন বঙ্গবন্ধুকে বিস্তারিত জানেন। সকল প্রজন্ম এখন বঙ্গবন্ধু’র অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েছেন, পড়ছেন। টানা এক যুগ বঙ্গবন্ধুর পজিটিভ নেতৃত্বগুন, দেশপ্রেম, দেশ সৃষ্টি, ঐতিহাসিক ভাষন, দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে সবাই প্রতিনিয়ত শুনছেন। ব্যক্তি মানুষের যে স্বাভাবিক দোষত্রুটি থাকে তা’ বঙ্গবন্ধু নিজে তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সরলভাবে প্রকাশ করলেও বর্তমান আলোচোকগন ভুলেও উচ্চারন করেননা।

মানুষ এখন বঙ্গবন্ধুকে জানেন। আওয়ামীলীগের ইতিহাস জানেন। শুধু মেলাতে পারেনা বর্তমান আওয়ামীলীগ এবং আওয়ামীলীগ সরকারের কর্মকান্ড বা বুঝতে পারেনা আওয়ামীলীগের আর সত্যি সত্যিই কোনো আদর্শ আছে কি-না। মানুষ কানে শুনে আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে।

মানুষ জানে চারটি মূল নীতির ওপর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। মানুষ দেখতে পায় আওয়ামীলীগ বা তাদের সরকার গনতন্ত্রের চর্চা করছেনা। আওয়ামীলীগ এখনও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে তা’ আর এখন কেউ বিশ্বাস করেনা।

আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি তা’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার পরও মানুষের এখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। বিএনপি’র স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের সংগে গাঁটছড়া নিয়ে আওয়ামীলীগ যতোটা উচ্চকন্ঠ জামায়েতকে নীরবে আওয়ামীলীগে বিলীন করে নেয়ার ব্যাপারেও ততোটা সচেষ্ট।

মানুষ আওয়ামীলীগের এই দ্বিচারিতা সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে জানছে এবং ঘৃনা করছে। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ সাধারন কর্মীদের মাঝে শুধুই হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

আওয়ামীলীগ আদর্শচ্যুত হয়ে স্বাভাবিক পথ এবং দিকভ্রান্ত। জনগনের আস্থার পরিবর্তে গুটিকতক স্তাবক শ্রেনীর সমর্থন পুষ্ট হয়েছে। স্বাভাবিক গনতান্ত্রিক পথ অনুসরন না করে একটি স্তাবক প্রশাসনের ক্রীড়ানকে পরিনত হয়েছে। জনগনের ওপর তারা পুরোপুরি আস্থা হারিয়েছে।

অর্থাৎ বিশাল একটি স্তাবক শ্রেনীর অন্ধ প্রশংসা সত্বেও তারা নিজেরাই বুঝতে পেরেছে স্বাভাবিক গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরন করে ক্ষমতায় আসা যাবেনা। সে কারনেই দিনের নির্বাচন রাতে করতে হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারকার্য এবং তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামীলীগে বিলীন করা, এমপি বানানো একই সাথে চলছে।

প্রতিপক্ষ বিএনপি দৃশ্যত শক্তিহীন। আওয়ামীলীগের মতো সংগঠন তাদের কখনোই ছিলোনা। এখনতো একেবারেই শক্তিহীন। তা’হলে আওয়ামীলীগকে আদর্শ জলান্জলী দিয়ে স্বৈর শাসকের ভূমিকায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে হচ্ছে কেনো? আওয়ামীলীগ পা ফঁসকে অনেকটা নিজেরাই খাদে পতিত হয়েছে। গভীর খাদে পতিত হয়েছে। এই খাদ থেকে ওঠা সম্ভব নয়। তারা ক্রমাগত গভীরে প্রবেশ করছে।

তাই তারা শাহেদ, পাপিয়া, সাব্রিনা, সম্রাটদের ধরতে পারে তাদের গড ফাদারদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনা। দূর্নীতিবাজ স্বাস্থ্যের ডিজি পদত্যাগ করলেও তাকে এ্যারেস্ট করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রককে মন্ত্রীপরিষদ থেকে বাদ দিতে পারেনা। শেয়ার মার্কেট ম্যানপুলেটরদেরকে আইনের আওতায় আনায়ন করতে পারেনা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনায়ন করতে পারেনা। বরং এই দূর্নীতির অতল খাদে ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে সরকার।

দলের অবস্থা আরও করুন থেকে করুনতর হয়েছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের কোনো পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি। সকল পর্যায়ে নেতৃত্ব এখন কেজি দরে কেনাবেচা হয়। পদ্ধতির অনুসরন না থাকায় চড়া দামে দল এখন বিক্রি হয়। আদর্শের বিচ্যুতির ফলে জামায়াত, বিএনপি থেকে আসা লোকজন অনায়াসে নেতৃত্ব কিনে নিচ্ছে।

তারা আবার নেতৃত্বে বসে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদেরকে যারা বিশেষ করে জামায়াত, বিএনপি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন, সংগ্রাম করে এক সময়ে নির্যাতিত হয়েছে তারাই এখন সেই শক্তির দ্বারা লান্চিত হচ্ছে। তারাই অনেকটা দূর্নীতির নিয়ন্ত্রকও বটে।

একটি বিষয় লক্ষ্যনীয়ভাবে কমন। যারা যেখানেই রয়েছে একজন ব্যক্তিকে প্রশংসা করছেন। তিনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের বর্তমান নেতৃত্বে যারা আছেন কারনে অকারনে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করে সকল দায় এড়িয়ে প্রতিনিয়ত বগল বাজাচ্ছেন। সিভিল প্রশাসন, সামরিক প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সবাই দলীয় রাজনৈতিক সমর্থকদের মতো প্রধানমন্ত্রী’র প্রশংসা করে যাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী’র ব্যক্তিগত সহকারী যাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্ট্যাটাস সহকারী সচিব থেকে যুগ্ম সচিবের মধ্যে তারাও গনমাধ্যমে এসে প্রধানমন্ত্রী’র পক্ষে স্তাবকতা করে যাচ্ছেন। আহা বেশ! বেশ! একটা অবস্থা বিরাজমান।

এরই মধ্যে বছর ঘুরে ফিরে এসেছে আগস্ট মাস। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর জাতি অবাক বিস্ময়ে খুনি মোস্তাকের নাট্যমন্চে আগমন এবং নাটক মন্চায়ন দেখে চিনতে পেরেছিলো মীর জাফরকে। আর এখন সহজেই শেখ হাসিনার চারপাশে অসংখ্য খুনি মোস্তাকের উদ্যত তরবারি দেখে মুক এবং বধির হয়ে গেছে। একবার পথ হারালে মানুষ গভীর জঙ্গলে পথ হাতরে আর পথ খুঁজে পায়না। তখন হিংস্র প্রাণীর সাথে হয় লড়াই করে বাঁচতে হয় বা জীবন দিতে হয়।

আগস্ট মাস বর্তমান আওয়ামীলীগ এবং শাসক গোষ্ঠীকে কি অন্ধকারের চোরাগলি থেকে আলোর পথ আওয়ামীলীগের আদর্শে ফিরিয়ে আনতে পারবে? আইয়ুব-ইয়াহিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যারা সত্যের অমোঘ বানী গনতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দিতেন তাদেরকে আরেকবার নির্ভীক করতে সমর্থ্য হবে? উত্তর জানা নেই। তবুও শেখ মুজিব বাঙ্গালীর হৃদয়ে চিরোজাগরুক থাকবে।

মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতি: মোঃ শফিকুল আলম
অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

ঢা/আরকেএস

(Visited 37 times, 1 visits today)