জরুরী ইন্টারনেট সেবায় দরকার জরুরী প্রণোদনা

জরুরী ইন্টারনেট সেবায় দরকার জরুরী প্রণোদনা
  •  
  •  
  •  
  •  

এস এম সামসুর রহমান শিমুল : অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের এক নম্বর রপ্তানিকারক খাত হিসেবে চিহ্নিত তৈরি পোষাক শিল্পখাতকে সরকার প্রণোদনা দিয়েছে ৫০০০ কোটি টাকা। এটা খুবই খুশির সংবাদ। কিন্তু দেশের অর্থনীতিকে সুসংহত রাখার জন্য প্রতিটি খাতের প্রতি লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়। কারণ পুরো দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য দেশের প্রতিটি সেক্টর একটি আরেকটির সাথে ইন্টারকানেকটেড। তথ্য-প্রযুক্তির ‌ব্যাপক প্রসারের কারণে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আসছে দেশের প্রতিটি সেক্টর। আর এই ডিজিটালাইজেশনের ধারক ও বাহক হিসেবে যে মাধ্যমটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে, যাকে ছাড়া এই তথ্য-প্রযুক্তির উন্ন‌য়ন তথা ডিজিটালাইজেশনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়না তা হল ইন্টারনেট। এই অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন অচল।

একদিনের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ হলে, কি ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে দেশের ব্যবসা-শিল্প থেকে শুরু করে সরকারি, আধা-সরকারি, আর্থিক ও বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের তা ভাবনারও অতীত। ইন্টারনেটের অচলাবস্থার কারণে দেশের অর্থনীতিতে নামতে পারে ব্যাপক ধস। ইন্টারনেটের নির্ভরতা চলে এসেছে দেশের ৮০% মানুষের মাঝে। তাই সময় এসেছে ইন্টারনেটের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে ভাবার। এই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নই পারে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটাতে।

করোনার এই সংকটকালে, জরুরী সেবা হিসেবে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লকডাউনের আওতামুক্ত। করোনার ঝুঁকি নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন এই সেবার সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ কর্মী। জানা গেছে, শত শত কর্মী সেবাপ্রদানের পর করোনায় আক্রান্তও হয়েছেন। সরকারের গৃহীত এই জরুরী সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের জন্য আমরা কি করতে পেরেছি?

দাবি উঠেছে, এই ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারীভাবে প্রণোদনা দেওয়ার। জরুরী সেবা দিতে গিয়ে যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অস্বচ্ছলতা আসে, তাহলে এই খাতেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।

এই ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টার ফলে এখন পর্যন্ত ব্যাংক, বীমা, আউটসোর্সিং, কলসেন্টার, সফটওয়্যার, এবং ই-কমার্স খাত সাবলীল ভাবে চলছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে কর্পোরেট অফিসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়াতে। এতে আইএসপি কোম্পানিগুলোর আয় কমে গেছে ৫০ শতাংশ। এদিকে কোয়ারেন্টাইন ও লকডাউনের কারণে হোম ইউজার বৃদ্ধি পেলেও তার সাথে বাড়াতে হচ্ছে ব্যান্ডউইথ সাপ্লাই। এর জন্য Upstream প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। ছোট-মাঝারি এইসব আইএসপি প্রতিষ্ঠান সবসময় হোম ইউজারদের সাবসিডাইজ দিয়ে ব্যবসা করে। কিন্তু করোনার এই সংকট কালীন মুহুর্তে কর্পোরেট কোম্পানীগুলোর কর্মবিরতির কারণে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে পাচ্ছে না মাসিক ফি, অন্যদিকে হোম ইউজারদের বাড়তি সেবা ও সুবিধা বাড়ানোর ফলে বেড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ের পরিমাণ।

দুঃখের বিষয় হল, হোম ইউজারদের সেবা বৃদ্ধি করলেও তাদের কাছ থেকেও আসছে না আশানুরুপ মাসিক ফি। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি, অধিকাংশ আইএসপি কোম্পানির বিলিং সিষ্টেম অনলাইন বেইজড নয়। এতে নিয়মিত বিল পরিশোধ করেনা গ্রাহকরা। যার ফলে বিলম্যানদের হোম ইউজারদের কাছে যেতে হয় বিল সংগ্রহের জন্য। কিন্তু কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন, সামাজিক দুরত্বের দোহাই দিচ্ছে হোম-ইউজাররা। এতে আইএসপি-এর বিলম্যানরা পারছেন না যথাযথ বিল সংগ্রহ করতে। ফলে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দেয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।

যেখানে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও টেলিকম কোম্পানীগুলোর সাথে জোট তৈরীর উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ প্রোগ্রাম ঘোষণা দিয়েছে হুয়াওয়ে। স্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারিত্বের প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে তারা একটি ইকো-সিষ্টেম তৈরি করতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজার উন্মোচন হবে বলে হুয়াওয়ে মনে করে। বিশ্বের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বৃহৎ আকারে ছক কষছে, সেখানে আমাদের সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল এই জরুরী সেবা খাতে তেমন নজর দিচ্ছেন না।

উন্নত বিশ্বের আইএসপি গুলো যেখানে তাদের এক বছরের রেভিনিউ টার্গেট ফিল-আপ করছে একদিনে, গ্রাহকদের ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে। আমাদের দেশিয় ইন্টারনেট গ্রাহকদের ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও আয় বাড়েনি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর। বরং আয় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে করোনাকালে আর্থিক সংকটের কারণে।

তাই বাংলাদেশ সরকারকে এই জরুরী সেবা খাতে জরুরী ভিত্তিতে আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক পরিচিতি :
এডিটর-ইন-চীফ, ঢাকা১৮.কম
আহবায়ক, বাংলাদেশ ক্যাবল অপারেটরস এসোসিয়েশন (কোয়াব)

ঢা/কেএম

(Visited 17 times, 1 visits today)