ছুটির মন ও মননের গল্প

বিকাশ মজুমদার: “মন মননের গল্প” বইটা পড়ার পর থেকেই মনের ভেতর থেকে এক ধরণের তাগিদ অনুভব করছি বইটার পাঠ অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার অনুভূতির কথা কিছু লিখি। বইটার উৎসর্গ এবং ভুমিকা লেখার স্টাইলই পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে একে একে শাহিদা আরাবি ছুটি’র ১৪টি গল্পের আড়ালে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিকে।

গল্পগুলো পড়ার পর পাঠকের মনে হবে বইটার নামকরণের সার্থকতা। মন মননের গল্প বইয়ের গল্প গুলো ঠিক তথাকথিত গল্প নয় বরং লেখক শাহিদা আরাবি ছুটি’র শৈশব থেকে আজকের ব্যস্ত প্রবাস জীবনের দৈনিন্দন আলেখ্য, বেশিরভাগই পেশা জীবনের সাথে সম্পর্কিত। প্রতিটি লেখাই যেন আত্মনিমগ্নতার আড়ালে জীবনের গভীর দর্শন।

বর্ণনা করেছেন নিতান্ত সরলতায়, সহজ বাক্যের অদ্ভুত গতিশীল ছোটগল্পের সংজ্ঞায়। বইটার প্রথম গল্পের নাম ‘বদ জ্বীন’ যা আসলে রূপকার্থে সিজোফ্রেনিক মানুষের টানাপোড়েনের সংকট। লেখকের মামা সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত হয় এবং তিনি বাস্তব জগত থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে কল্পনার জগতে বিরাজ করেন।

সমস্যাটা এখান থেকেই শুরু। মাত্র হাজার খানেক বছর আগেও যদি মনোবিজ্ঞানীগণ সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে আজকের মত এত জ্ঞান রাখতেন তাহলে হয়ত পৃথিবীকে অনেক সম্ভাব্য সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারতেন।

আমরা গ্রামে ছোটবেলায় এমন বদ জ্বীনের সাক্ষাৎ পেয়েছি এবং দেখেছি জ্বীন ছাড়ানোর নামে কী নিষ্ঠুর নির্মমতা। দারিদ্র, অশিক্ষা আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ মনে করে কিছু বদ জ্বীন মানুষের উপর আছর করে ফলে মানুষটা তখন আর সেই মানুষ থাকে না।

বদজ্বীনকে ছাড়াতে ওঝা, পীর, ফকির ভণ্ডের দল অর্থহীন মন্ত্র, দোয়ার ঝাড়ফুঁক দিয়ে সিজোফ্রেনিক মানুষটাকে বিভিন্ন কায়দায় অত্যাচার করতে থাকে। কখনো বেদম পেটায়, কখনো প্রচণ্ড শীতের রাতে ঠাণ্ডা পানিতে চুবায়, কখনো আগুনে পোড়ায়, ইত্যাদি অমানবিকতার চূড়ান্ত আচরণ করতে থাকে।

নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে অপরের বিপদ দেখার মজাও অসাধারণ। গ্রামে জ্বীন তাড়ানোর আমিও প্রত্যক্ষ সাক্ষী, মানুষটা যত কষ্ট পাবে দর্শকের তত আনন্দ কারণ তাদের ধারণা কষ্টটা পাচ্ছে সেই বদ জ্বীন, যার উপর আছর হয়েছে তার কিছু হচ্ছে না।

অনেক সময় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত মানুষ নিজেই নিজের সঙ্গে তার সমস্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করে। ক্রনিক পর্যায়ে চলে গেলে সেই মানুষটা সমস্যার সমাধানও দিয়ে দেয়।

এসব কিন্তু ঘটতে থাকে নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধুপানের মতই। এই আত্মকথনকে বলে ‘ড্রামাটিক মনোলগ’ যা অনেক ধর্ম প্রচারক মহাপুরুষদের মধ্যেও ছিল। তাদের মনোজগতে আলাদা আরেকটা চতুর্মাত্রিক জগত থাকে, সেই জগতের ব্যক্তিদের সাথে সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষের যোগাযোগও থাকে, সেখান থেকে তারা শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ ইত্যাদি অনুভূতিও পায়।

‘বারী সাহেব’ গল্পে দেখতে পাই নিখাদ মধ্যবিত্ত অর্থনীতির একটা পরিবার যেখানে বাবা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং গড়পরতা কেরানি শ্রেণির মত অফিসের বসের ত্রাসে ত্রাহি তার মাং মধুসূদন অবস্থা। তো এই পরিবার যাচ্ছে একদিন বসের বাসায় বেড়াতে।

বেড়াতে যাওয়ার যে প্রস্তুতি সেটাই আমার কাছে চমৎকার লেগেছে এবং লেখক তুলির মত কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগা শিশুর মানসিক অবস্থা। নিজেকে যথাসম্ভব উপস্থাপন করার প্রচেষ্টায় মেয়েটার মা তার তোরঙ্গে তুলে রাখা সবচেয়ে সুন্দর শাড়ি পরে, সাধ্যমত প্রসাধন করে, গায়ে উৎকট সুগন্ধি মাখার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে তাদের বিলাসী দৈন্যতা।

‘বারী সাহেব’ গল্পে বিত্তবানদের অহেতুক অহমবোধের যে চিত্র আমরা দেখতে পাই তা যথার্থ অর্থেই শ্রেণি বিভাজন যা সমাজের চোরা স্রোত। কিন্তু সময় হলো শ্রেষ্ঠ ঘাতক ও নিরাময়। যে বাড়িতে সেদিনের যে শিশু বিত্তের বেড়াজাল ডিঙিয়ে ঢুকতে পারেনি, বাবা মায়ের সাথে নিজে অপমানের ঘাম লেপ্টে ফিরে এসেছিল সেই বাড়িতেই সেই শিশুটি বড় হয়ে ঢুকতে পারে কিন্তু সেদিনের সেই রাশভারী ধনী লোকটির অবস্থান অন্তিম শয়ানে।

বিধাতার সঙ্গে তিনি মরণের সাপ লুডু খেলছেন। অহংকার আজ মৃত্যু পথযাত্রী।

আহ! জীবন কী শিক্ষা দিয়ে দেয়, যদিও মানুষ সময় থাকতে বুঝতে পারে না। সময় তুমি শ্রেষ্ঠ ঘাতক ও নিরাময়। মন মননের গল্প পড়ে আমি সাইকোসিস সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি এবং বুঝতে পারি প্রতিটি মানুষের দুইটা জীবন থাকে। একটা জীবন সে নিয়মিত যাপনে অভ্যস্ত কিন্তু কোন দুর্ঘটনা, ট্রমা, ব্রেকআপ ইত্যাদির পরে শুরু হয় তার আরেকটা জীবন।

সাইকোসিসে ভোগা মানুষ একই সাথে দুই জীবনে বাস করে। এই দ্বৈত জীবন মানুষটার বাস্তব জীবন কেড়ে নেয়। আশংকা হয়, আমি নিজে বোধহয় কেউকে দুইটা জীবনের খাদে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি। পড়ে যাওয়ার সময় গগণবিদারী আর্তচিৎকার শুনেছি, না জানি সে নতুন জীবনে কেমন আছে!

শাহিদা আরবী ছুটি’র গল্প বলার একটা সাবলীল এবং চমৎকার কৌশল আছে। গল্পের মধ্যে সে টুইস্ট তৈরি করতে জানে, এবং গল্পের মধ্যে পাঠকের সাথে মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলতে পারেন। পানির বোতলের দিকে তাকিয়ে একটা মেয়ের পিপাসার অনুভুতি জাগা আপাত দৃষ্টিতে তেমন আগ্রহ জাগানিয়া না হলেও পানি দেখেই মেয়েটির কেন পিপাসা লাগে জানলে আপনি চমকে উঠবেন।

মানুষের ব্রেইন বড় অদ্ভুত জগত, সেখানে সব স্মৃতি জমা থাকে কম্পিউটারের ফাইলের মত সাজানো। ছোটবেলায় কেউ যদি দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় তবে তাকে বহন করতে হয় আজীবন সেই বেদনার দায়। “লবণাক্ত পিপাসা” গল্পের মেয়েটি বর্তমানে পেশা এবং সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার গুরুমস্তিস্কের ফাইলে জমা হয়ে আছে ছোটবেলার দুঃসহ স্মৃতি।

ইরাকের ইঙ্গ-মার্কিন যুদ্ধে বিদ্ধস্ত একটা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে মৃত মায়ের শরীরের উপর হামাগুড়ি দেয়া শিশুটি তৃষ্ণার্ত ছিল এক অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকের দ্বারা উদ্ধার হওয়ার আগপর্যন্ত।

এই সময়ে সে ছিল প্রচণ্ড পিপাসার্ত। তখন সেই মেয়েটির চোখে কোন ভয়, আশঙ্কা ছিল না, ছিল শুধু সমুদ্রসম পিপাসা। তাই এখন পানি দেখলেই প্রচণ্ড পিপাসা পায়। মন মননের গল্প বইটিতে রবিন শর্মা বা শিব খেরার মত সহজে কর্পোরেট বস বা কোটি টাকার মালিক হওয়ার সহজ উপায় বাতলে দেয়া নেই, ডেল কার্নেগির মত মোটিভেশন স্পিচ নেই, আমাদের লুৎফর রহমানের মত উন্নত জীবনের গাইডলাইন দেয়া নেই কিন্তু ফিনিক্স পাখির মত পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর ছাই থেকে উড়ে যাওয়ার গল্প আছে।

একটা মেয়ে হুইল চেয়ারে বসে থেকে কীভাবে এত প্রাণবন্ত হতে পারে? কতটা প্রাণশক্রি থাকলে একজন নারী ফ্রিদা কাহলো হতে পারে মন মননের গল্প না পড়লে বোঝা সম্ভব না। বইটির সবথেকে আকর্ষনীয় এবং ভয়ানক সুন্দর গল্পটার নাম প্যারাসাইকোলজিকাল। গল্পটি পড়ে আমি ভয় পেয়েছি এবং যাদেরকে শুনিয়েছি তারা প্রত্যেকেই চমকে উঠেছে।

আলোচ্য বইটির প্রতিটি গল্পই যেহেতু লেখকের পেশাগত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, প্যারাসাইকোলজিকাল তার ব্যতিক্রম নয়। গল্পের প্রোটাগনিস্ট ডেভিড একরাতে দুইটার দিকে সিডনি থেকে ক্যানবেরা ফিরছিল। সেই একাই এবং ড্রাইভিং সিটে। তার দ্রুতগতির গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে একজন।

এই ঘটনার কয়েকমাস পর থেকেই ঠিক রাত দুটো হলেই ডেভিডের ঘুম ভেঙ্গে যায়। এরপর থেকে ডেভিড বুঝতে পারে তার ঘরে অন্য একজনের উপস্থিতি আছে যাকে সে দেখতে পায় না। অশরীরীর উপস্থিতির সাথে সাথে ঘর ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং ডেভিডের ধারণা অশরীরী সেই আত্মহত্যা করা লোকটি।

প্যারাসাইকোলজিকাল গল্পের টুইস্ট হলো ডেভিডের আশেপাশে যারা থাকে তারাও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা অনুভব করে।

মন মননের গল্প বইটির মূল উপজীব্য বিষয় মানুষ, ভাঙাচোরা, জোড়াতালি দেয়া, ব্যর্থ সে যেমন মানুষই হোক না কেন। “একটি বিশ ডলারের নোট” মনে হয় গল্প নয়, সারাজীবন চকচকে জিনিসের প্রতি লোভাতুর আমার জন্য ব্যক্তিগত শিক্ষা। লেখক আমার চোখ থেকে টিনের কালো চশমা খুলে দিয়েছেন যেন।

প্রতিটি গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে লেখাটা অনাবশ্যক বড় হয়ে যাবে। বরং আমি পাঠককে নিয়ে নিয়ে যেতে চাই লেখকের প্রথম প্রেমের গল্পে। ১৬ বছর বয়সে লেখক প্রেমে পড়েন এক অদেখা অতীত ছেলের কিন্তু গল্প বলার অভিনব স্টাইলের কারণে পাঠক বুঝতে পারবেন না প্রেম না কল্পনাবিলাস, অতীত না বর্তমান।

কারণ লেখকের প্রেমাস্পদ মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা নায়ক শহীদ শাফি রুমি যিনি ১৯৭১ সালেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন এবং তখন লেখকের জন্মও হয়নি। মুক্তিযোদ্ধার প্রতি প্রেম সম্ভবত তিনি পারিবারিকভাবে অর্জন করেছেন। কারণ, লেখকের মামাও মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখযোদ্ধা এবং তাদের বাড়িতে গেরিলাদের অস্ত্রগোলাবারুদ সংরক্ষিত থাকত নিরাপদে।

দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও তিনিও আর ফিরে আসেন নি। লেখকের মা নিজে সেই না ফেরা ভাইয়ের জন্য এখনও ঈদের দিন সেমাই, মাংশ, পোলাও রান্না করে অপেক্ষা করে বসে থাকেন। মন মননের গল্প বইটির আলোচনার পাশাপাশি নির্মোহ সমালোচনাও দরকার।

আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে লেখকের লেখনিতে হয়ত তার অজান্তেই হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব রয়ে গেছে এবং নিজস্ব স্টাইল অর্জনের জন্যই লেখকের সেই প্রভাব মুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি।

আরেকটা গুরুতর অভিযোগ বইটির বিরুদ্ধে আমার পক্ষ থেকে। বইটিতে বানান ভুলের মহোৎসব যেন। ব্যক্তিগতভাবে র এবং ড় বর্ণের ভুল প্রয়োগ আমি সহ্য করতে পারি না। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম যেহেতু শিকড় ছাড়া উচ্ছন্নে যাওয়া পরভৃৎ শ্রেণি তাই হয়ত প্রুভ রিডিংয়ের সময় বানানকে তেমন গুরুত্ব দেয় নি অথবা বইটার প্রকাশক বানান সম্পর্কে সচেতন নয়, অথবা জানেই না কিন্তু প্রকাশনার মত একটা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে জড়িত।

ওরা জানে না বানান কীভাবে বাক্যের অর্থ বদলে দিতে পারে বা বিকৃতি ঘটিয়ে ফেলতে পারে। এই প্রজন্মের “কাপড় পড়া” দেখে আমার প্রশ্ন জাগে তাহলে এরা বইখাতা দিয়ে কী করে? বইটার “আমাদের গল্পগুলো” একটা তীব্র মিষ্টি প্রেমের গল্প। করোনা মহামারীর লকডাউনে আটকে পড়া সদ্যবিবাহিত তরুণ তরুণীর দূরত্বের আকুতি ভরা গল্পে নাদিয়া নামের মেয়েটি যখন গেয়ে উঠল “আজি ঝড়ো ঝড়ো মুখর বাদল দিনে” তখন বইটার প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা দেখা দিয়েছিল।

পরে মনে হলো, এটা তো লেখকের দোষ নয়, দোষ হলো যারা বইটা এডিট করেছিল আর তাদের জানার অপরিসর জগত অথবা তারা কোনদিন গানটা নিজের কানে শোনেনি। লেখক নিজে প্রবাসী বলেই হয়ত এত খুঁটিনাটি তদারকি করতে পারেন নি, তবে আশা করি প্রকাশক পূনর্মুদ্রনে এসব প্রমাদ ও ভ্রান্তি দূর করবেন।

ঢা/এসআরএস/সাখা/মমি 

মার্চ ৪, ২০২১ ১০:৪৩

(Visited 42 times, 1 visits today)