চলো বাঁচি বেঁচে থাকার মতো

Photo source : Pinterest, Abstract Garden Of Happiness | চলো বাঁচি বেঁচে থাকার মতো
  •  
  •  
  •  
  •  

আলী আহসান প্রিন্সঃ করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে সবাই কম বেশি ঘর বন্দী জীবন কাটাচ্ছি।

যাদের সুযোগ আছে তারা বাড়িতে আছেন। অনেকের সেই সুযোগ নেই কারণ কাজের প্রয়োজনে, খাবারের সন্ধানে, ইত্যাদি নানান কারণে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা বাইরে যাচ্ছেন তারা ঝুঁকির মধ্যে আছেন।

অনেকের ঘরে মন টেকে না তাই বিভিন্ন ছল করে তারা বাইরে যাচ্ছেন। মানুষের বেশিরভাগ সময় কাটছে বাড়িতে বিভিন্ন ধরণের কাজ করে, টিভি দেখে, গান শুনে বা বই পড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে বেশিরাভাগ সময় কাটছে মোবাইলে বন্ধুদের সাথে কথা বলে কিংবা ফেসবুকে।

ফেসবুকে অনেকের দৈনিক পোস্টের সংখ্যা বেড়ে গেছে। কেউ ঘণ্টায় ঘণ্টায়, কেউ দিনে কয়েকবার বিভিন্ন রকমের পোষ্ট শেয়ার করছেন, কোথায় কতজন মরলো, কতজন আক্রান্ত হলো সেই খতিয়ান দিচ্ছেন, কেউ উপদেশ, কেউ চমকপ্রদ উপায় জানাচ্ছেন যা থেকে করোনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

করোনাকে কেন্দ্র করে পোস্টের যেন অন্ত নেই – উপদেশ, রম্য রচনা, কৌতুক, গান, কবিতা, ছবি, খবর, ইত্যাদিতে ছেয়ে গেছে ফেসবুক, ট্যুইটার, ইনষ্টাগ্রাম, ইউটিউব, হোয়াটস-এপ, ম্যাসেঞ্জার, টাম্বলার, টিক-টক, রেডিট ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার আর ইউটিউব নিয়েই ব্যস্ত আছে।

প্রতিদিন ইনবক্সে ম্যাসেজের সংখ্যা বেড়েছে। নিয়মিত আপনি করনো নিয়ে নানান পোষ্ট বন্ধু, আত্মীয় বা ভাইবোনদের কাছ থেকে পাচ্ছেন।

এইসব অতিরিক্ত পোষ্ট আর মেসেজ নিয়ে অনেকেই বিরক্ত হচ্ছেন, এবং সেটাকে কেন্দ্র করে পোষ্ট দিচ্ছেন। বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক পোস্টে আমরা আমাদের সেইসব বিরক্তি বিভিন্ন কমেন্টের মাধ্যমে জানাচ্ছি। ফেসবুক এক উন্মুক্ত রঙ্গ মঞ্চ আর যে যার ইচ্ছেমতন যা ইচ্ছা তাই করছেন এখানে।

প্রত্যেকের নিজের মত, অধিকার আছে, সুতরাং কে কী করছে, কী শেয়ার করছে, কেন করছে, সেটা যুক্তিসঙ্গত কিনা, বা কমন সেন্সের বাইরের কিছু কিনা এসব এখন আর মনে রাখে না, রাখা উচিৎ না। ভারসাম্য বলে কিছু নেই। তাতেও ক্ষতি নেই কারণ আমরা সবাই করোনা আতঙ্কে আক্রান্ত, বন্দী নিজের ঘরে।

পুরো পৃথিবী থমকে আছে এবং পৃথিবীর মানুষ পাগল হয়ে গেছে। প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে অপেক্ষা নিয়ে। প্রতিদিন আশা নিয়ে বাঁচি। এই বুঝি করোনার চিকিৎসা বের হলো, আজ হয়তো আরও কিছু কম মানুষ মারা গেল, আরও কিছু কম মানুষ আক্রান্ত হলো।

এসব নিয়েই চলছে আমাদের বর্তমান জীবনের প্রতিটি দিন। চলুক জীবন এভাবেই, শুধু যেন বেঁচে থাকি আর সুস্থ থাকি সবাই।

এবার আসি ফেসবুকে দেয়া বিভিন্ন পোস্টের ব্যাপারে। এটা অবশ্যই জরুরী যে অনর্থক মিথ্যা সংবাদ এড়িয়ে যাওয়া। অনেকেই না জেনে এবং না বুঝে অনেক মিথ্যা সংবাদ, করোনার প্রতিকার, এসব ছড়াচ্ছেন, বিশেষ করে ইনবক্সে।

তাদেরকে নিয়ে কিছু বলার আগে আমাদের মাথায় রাখা উচিৎ যে আল্লাহ সবাইকে সমানভাবে সৃষ্টি করেননি। কেউ স্বল্প বুদ্ধির, কেউ জ্ঞানী, কেউ বুদ্ধিহীন, কেউ চণ্ডাল, কেউ ভদ্র, কেউ জটিল, কেউ কুটিল, ইত্যাদি।

তার মানেই এই নয় আমাদের সেই অধিকার আছে যে অন্যদেরকে হেয় করে, ছোট করে কিছু বলা যাবে। বুদ্ধিহীন মানুষকে বুদ্ধিহীন বললেই সে ছোট হয়ে যায় না, তবে সেই বলার একটা পদ্ধতি আছে।

আঘাত না দিয়েও সত্যতা বলা যায়। একজন বোকা মানুষকে তার বোকামি নিয়ে কটাক্ষ্য করা যায় আবার সুন্দরভাবে তার বোকামিটা ধরিয়ে দেয়া যায়।

এখন নিচের কথাগুলো বিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে বলছি, অর্থাৎ যারা Theist তাদের জন্য, Atheist এর জন্য নয়। আল্লাহ আমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় হিসাবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছেন – “O mankind! Lo! We have created you male and female, and have made you nations and tribes that ye may know one another. Lo! the noblest of you, in the sight of Allah, is the best in conduct (righteous). Lo! Allah is Knower, Aware.”

“হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।”

*Righteous বলতে এখানে পরহেযগার ব্যবহার করা হয়েছে, এর অর্থ যারা ভালো কাজ করেন বা নিজেকে সঠিক পথে পরিচালনা করেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত হওয়ার সাথে এই পরহেযগার ব্যাপারটার সম্পর্ক কি? কেনই বা আমাদেরকে এঁকে অন্যের সাথে পরিচিত হতে বলছেন? খুব সহজ উত্তর।

জাতিগত ও গোত্র হিসাবে আমরা আলাদা হলেও আমাদেরকে বলা হচ্ছে যেন আমরা এঁকে অন্যের সাথে মেলামেশা করি এবং নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠভাবে পরিচালনা করি। আমার মনে হয় না, এঁকে অন্যের প্রতি দোষারোপ বা কাদা ছোড়াছুড়ি করে কিংবা অন্যকে হেয় করে নিজেকে সঠিক ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

আর ভুলবশত যদি এমন কিছু আমরা করেও থাকি তাহলে তার জন্য লজ্জিত হওয়া বা নিজের ভুল বুঝতে পারাও শ্রেষ্ঠভাবে বা সঠিকভাবে চলার সমতুল্য। নিজের ভুল সবাই স্বীকার করতে পারে না, কিংবা করতে চায় না।

যারা করে বা করতে পারে, তারা অবশ্যই শ্রেষ্ঠ। আমি নিজে সেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারিনি, কারণ ভুল হয়ে যায় প্রায় সময়।

আর এঁকে অন্যকে হেয় করা বা অন্যকে নিয়ে বিদ্রূপ বা উপহাস করা নিয়ে আল্লাহ এই একই সুরার আগের একটা আয়াতে, ১১ নম্বরে বলেছেন –

“O you who have believed, let not a people ridicule [another] people; perhaps they may be better than them; nor let women ridicule [other] women; perhaps they may be better than them. And do not insult one another and do not call each other by [offensive] nicknames. Wretched is the name of disobedience after [one’s] faith. And whoever does not repent – then it is those who are the wrongdoers.”

“হে বিশ্বাসীগণ! একদল পুরুষ যেন অপর একদল পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয়, তারা উপহাসকারী দল অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং একদল নারী যেন অপর একদল নারীকেও উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয়, তারা উপহাসকারিণী দল অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।

আর তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না; কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা (এ ধরনের আচরণ হতে) নিবৃত্ত না হয় তারাই সীমালংঘনকারী।”

আমাদের এই করোনা আক্রান্ত মহামারী সমতুল্য কঠিন সময়ে নিজেদেরকে সঠিক পথে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

সবার জন্য শুভ কামনা এবং দোয়া যেন আমরা এই ভয়ঙ্কর করোনা আক্রান্ত সময়কে পার হতে পারি, সবাই যেন সুস্থ থাকতে পারি, ঘরে বন্দী থেকে এই করোনার আক্রমণ থেকে নিজেকে ও অন্যকে বাঁচাতে পারি। ছোট্ট জীবন, চলো বাঁচি বেঁচে থাকার মতন।

আলী আহসান প্রিন্স
আলী আহসান প্রিন্স

লেখক পরিচিতিঃ ইউকে প্রবাসী বাংলাদেশী; তিনি পেশায় ম্যাকলারেন টেকনোলজি সেন্টারে একজন ব্যাবসায়িক পরামর্শদাতা।

[ঢা/এফএ]

(Visited 5 times, 1 visits today)