ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ বা তীব্র ক্রোধ আপনাকে অসহায় বা অন্যদের কাছে সাহায্যপ্রার্থী করে তুলতে পারে

মোঃ শফিকুল আলম: “ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধ বা তীব্র ক্রোধ আপনাকে অসহায় বা অন্যদের কাছে সাহায্যপ্রার্থী করে তুলতে পারে।” ঝেড়ে ফেলুন এই যে প্রচন্ড আবেগ আপনার ভেতরে তৈরী হয় সে আবেগের তো প্রস্থান বা নির্গমনেরও প্রয়োজন।

একটি সুস্থ পদ্ধতিতে আপনার ভেতরে তৈরী আবেগের প্রকাশ আপনাকে খানিকটা মুক্তি দিবে বা ক্রোধের নির্গমন ঘটাবে।
তখন নিম্নচাপটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে আপনার মনে প্রশান্তি বয়ে আনবে।

অন্যথায়, বৃত্তাকারে ঘৃণা এবং ক্ষোভ তৈরী করবে। যারা লেখক তারা লেখায় মনোনিবেশ করে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে পারেন। অন্যেরা শারীরিক কসরতে অংশগ্রহন করতে পারেন। দৌড়াতে পারেন, হাঁটতে পারেন।

অথবা যার সাথে কথা বললে ভালো লাগে তার সাথে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে মনের ভেতরের গুমোট ভাবটি থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
সেক্ষেত্রে মামুনুল হকের মতো মানবিক সম্পর্কে জড়িয়ে না যাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত।

সেটি পরবর্তীতে অধিকতর অস্বাস্থ্যকর হবে। সকল তীব্র আবেগ, তীব্র ক্রোধ আমার ভেতরকার চিত্র প্রকাশ করে এবং প্রকাশ করে আমি কি চাই। ঘৃনা বা ক্ষোভের প্রকাশ বলে দেয় আমার কাছে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কি কারনে আমি অসহায় বোধ করি।

তখন আমাকে প্রশ্ন করে জানা যাবে কি কারনে আমি আবেগাপ্লুত হলাম।
আমি জানতে পারি আমি আমার সম্পর্কে কি প্রকাশে করেছি এই বিশেষ পরিস্থিতিতে। অর্থাৎ নিজের ভেতরটা তখন পুরোপুরি প্রকাশিত হয়।

এই প্রকাশ অবশ্য আমাকে আপনাকে বাকী জীবন পরিকল্পনায় বা বাকী জীবনের ছবি আঁকাতে সাহায্য করে। আপনি যখন আবেগাপ্লুত হওয়ার বা রেগে যাওয়ার পরিষ্কার কোনো কারন খুঁজে পাবেননা তখন লেখায় মনোনিবেশ করে বা পড়ায় মনোনিবেশ করে অকারন রাগের বা আবেগ উদগীরণের নির্গমন ঘটাতে পারেন।

এটি এক্ষেত্রে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে হতে পারে কেউ আপনাকে যেভাবে ট্রিট করেছে যা’ আপনার জন্য অবমাননামূলক হয়েছে।

আপনাকে আপনার ক্রোধের কারন খুঁজে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করে রাগের নির্গমন করতে হবে।
বিচ্ছিন্ন এবং বিস্তীর্ণ চিন্তার রেখা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের মন অদ্ভূত। মনটি আপনার একটি অলৌকিক মেসিন।

এই মেসিন আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বিজ্ঞানীরাই আমাদের বলে থাকেন যে মানুষের ব্রেইন বিচ্ছিন্ন প্যাটার্নের চিন্তা করে থাকতে পারে।
এবং সেটা নিয়মিত হয়ে থাকে। ফলে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে প্রতিদিন এলোমেলো চিন্তার উদ্রেক হয়ে থাকে।

ফলে মানুষের মধ্যে নিজের অজান্তেই নেতিবাচক চিন্তার সৃষ্টি হয়। মানুষ যখন তীব্র ক্রোধের মধ্যে থাকেন তখন যেসমস্ত নেতিবাচক চিন্তার উদ্রেক হয়: সাদাকালো ভাবনা: মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে তার বিশেষ একজনের কাছে যেভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত ছিলো সেভাবে হচ্ছেননা। তার কাছে আপনি কখনো ন্যায্যতা পাননি। আপনি তখন নিজেকে বৈষম্যের এবং অন্যায্যতার শিকার ভাবছেন।

বিপত্তিকরন: অত্যধিক আবেগ কোনো বিষয়কে বরং অধিকতর বিপত্তিকর করে তুলে এবং ঘটনাকে ভয়াবহতায় রূপ দেয়। বাস্তবে হয়তো কিছুই ঘটেনি।

ঐচিত্য: আমরা প্রায়শই ভাবি কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ করা উচিত বা উচিত নয়; কিংবা করার জন্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কিনা।

উচিত/অনুচিতের ক্ষেত্রে মতামতটি এভাবে গঠিত হওয়া প্রয়োজন, “যেটি আমাকে সাহায্য করবে সেটি আমি করবো বা করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিবো।”

মন পড়তে শেখা: আপনার মধ্যে যখন ঘৃনা বা ক্ষোভের জন্ম হয় তখন দেখবেন আপনি প্রায়শই অনুমান করছেন যে অন্যে আপনাকে নিয়ে কি ভাবছে বা আপনার কাছে অন্যে কি প্রত্যাশা করছে।

এ অবস্থায় আপনার এই ভাবনা ঠিক না হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি যে চ্যালেন্জের সম্মুখীন হবেন তা’ হচ্ছে আপনার ভাবনা কতোটা সত্য। তার অর্থ এটা দাঁড়ায়না যে আপনি যা’ ভাবছেন তার পুরোটাই ভূল।

মূলত: এক্ষেত্রে ভাবনাটিকে বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। কিন্তু আবেগ আপনার ভাবনায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সুতরাং অধিকতর সামন্জস্যপূর্ণ ভাবনায় থাকতে হবে।

এই এলোমেলো বা বিচ্ছিন্ন ভাবনায় সঠিকটি বাছাই করতে তখন সাইকোলোজিস্ট আপনাকে সবচাইতে বেশি সহযোগিতা করতে পারেন।
তিনি হয়তো আপনাকে CBT বা Cognitive Behavioral Therapy দিতে পারেন।

CBT যারা মানসিক চাপ এবং উদ্বিগ্নতায় ভোগেন তাদের জন্য বেশ সাধারন এবং কার্যকর থেরাপি। নিজেকে বোঝার এবং অন্যের বেদনাভূতি বোঝার অনুশীলন করতে হবে: যখন নিজের ভেতরে ক্ষোভের বৃত্ত তৈরী হবে তখন নিজেকে বাস্তবে বা বর্তমানে ফিরিয়ে আনতে হবে।

লক্ষ্য হচ্ছে, ক্ষোভ এবং ঘৃনার বৃত্তকে ঘুরতে না দেয়া। বরং এমন কিছু করতে হবে যা’ নিজেকে ভালোটা অনুধাবনে সাহায্য করে।
ক্ষোভকে নি:সরিত করার অর্থই হচ্ছে প্রকৃত আপনাকে অনুভব করা।

ক্ষোভ এবং ক্রোধ বরং আপনার পুরো মনকে বিষিয়ে তুলবে। এটি যখন আরও তিক্ততা এবং শত্রুতার স্তরে উন্নীত হয় জীবন তখন নরকে পরিনত হয়।
যেকোনোভাবে আপনি নিজেকে সহজতর করুন আপনি সুখানুভবে ভাসতে থাকবেন।

ক্ষোভ এবং ঘৃনা আপনার জীবনে চুপিসারে তৈরী হবে। আপনার মধ্যে শুধু নেতিবাচক ভাবনা এবং অনুভূতি ঘুরে ঘুরে তৈরী হতে থাকবে। ফলে আপনাকে রাগ, অপ্রাপ্তি, হতাশা, ভয় ইত্যাদি গ্রাস করবে।

আপনার মনে বেদনাদায়ক চিন্তা বা স্মৃতি ভেসে উঠতে থাকবে। আপনি ঘুমোতে পারবেননা।
কারন ঘুমের ভেতরেও আপনি মনের সাথে নিজে নিজের বিরুদ্ধে তর্ক করবেন।

ভাববেন এবং বলবেন,”আমি কি বললাম; সে কি ভাবলো ইত্যাদি।”
আপনি মনে করবেন কেউ হয়তো আপনার জীবনকে প্রভাবিত করছে এবং সেই ভাবনা আপনাকে আন্তরিকতাশূন্য করছে। অজান্তেই আপনি আক্রমনাত্মক হবেন।

চাপা রাগে মুখ কালো করে আপনি তূষ্নীম্ভুত হবেন। এবং অনুশোচনায় ভুগতে থাকবেন। সামাজিকভাবে আপনি তখন নিজেকে গুটাতে থাকবেন।

যেখানে বা যার সাথে আপনার নেতিবাচক অনুভূতি তৈরী হবে আপনি হয়তো সে যায়গা এবং মানুষকে এড়িয়ে চলবেন।
আপনি নিজেকে তখন নি:সঙ্গ রাখতে এবং ভাবতে থাকবেন। আপনার নিজেকে অপরাধী মনে হবে।

এসকল অনুভূতি থেকে আপনার মনে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসাপরায়ণ স্পৃহা তৈরী হতে পারে। আপনাকে সবকিছু ঝেড়ে ফেলতে হবে। ইতিবাচক ভাবনায় থাকতে হবে।
ক্ষোভ নির্গমনে তাৎক্ষণিক ভিন্নমুখকরন বা আমোদ-প্রমোদে ফিরুন।

সাইকোলজিস্টদের মতো অনেক কথা বলে ফেললাম। প্রকৃত মনোবিজ্ঞানীগন আমারে ক্ষমা করবেন।
লকডাউনের মধ্যে মনে হলো এরকম একটি লেখা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন তাই সাইকেলোজিস্ট হওয়ার অপচেষ্টা করলাম মাত্র।

মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী, সাংবাদিক-কলামিস্ট এবং সমাজকর্মী।

[ঢা-এফএ]

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

এইরকম আরো খবর: