ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরে কেন?

  •  
  •  
  •  
  •  

ফিচার ডেস্ক:  টিকটিক শব্দ করে ঘোরে ঘড়ির কাঁটা। কোনদিকে ঘোরে, আমরা তো তা সবাই দেখি। কিন্তু কখনো কি ভাবনায় এসেছে, কেন ডান দিকেই ঘোরে? বাঁ দিকে ঘুরলেই বা কী এমন সমস্যা?

যদি নাই হয়, তাহলে ঠিক কী কারণে ঘড়ির কাঁটা কেবল ডান দিকেই ঘোরে?

ঘড়ি আবিষ্কার হয়েছিল ইউরোপে। তার আগে মানুষ সময় দেখত সূর্য ঘড়িতে।

আর সেই সূর্য ঘড়ির প্রভাবেই ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকল ডানদিকে।

ইউরোপ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। তাই সূর্য হেলে থাকে দক্ষিণ আকাশে।

সেই কারণেই সূর্য ঘড়িতে যে দণ্ড থাকত, তার তার ছায়া বাঁ থেকে ডান দিকেই সরে সরে যেত।

সেই হিসেবেই হতো সময়ের পরিমাপ। এই কারণেই ঘড়ির কাঁটাও ওই ভাবেই সরতে লাগল। বাম থেকে ডানদিকে। যাকে বলে ক্লকওয়াইজ।

সবচেয়ে প্রাচীন যে ঘড়িগুলো, সেগুলোতে কিন্তু কাঁটার ঘোরাঘুরির কোনো বিষয় ছিল না। হ্যাঁ, সূর্যঘড়িই হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম ঘড়ি।

এই সূর্যঘড়িও কিন্তু অনেক রকমের ছিল। সবচেয়ে প্রাচীন সূর্যঘড়ি বলা হয় মিসরীয়দের ওবেলিস্ককে। ধারণা করা হয়, মিসরীয়রা এই ঘড়ি বানানো শিখেছিল খ্রিস্টের জন্মেরও সাড়ে তিন হাজার বছর আগে।

এ রকম আরেকটা ঘড়িকে বলা হয় ‘শ্যাডো ক্লক’। ওটা বানিয়েছিল ব্যাবিলনীয়রা, খ্রিস্টের জন্মের হাজার দেড়েক বছর আগে।এখন, এই সূর্যঘড়িগুলোতে সময় দেখা হতো সূর্যের ছায়া দেখে।

অর্থাৎ সময়-নির্দেশক যে কাঁটা বা দণ্ড, সেটা স্থির থাকত। সূর্যের আলোয় সে কাঁটার ছায়ার পরিবর্তন দেখেই সময় হিসাব করা হতো।

আর এখনকার ঘড়িতে আবার উল্টো, এই কাঁটাগুলোই ঘুরে ঘুরে সময় জানান দেয়। ছায়া দেখার কোনো বালাই নেই। এই রকম ঘড়ি, মানে যেই ঘড়িতে কাঁটা ঘুরে ঘুরে সময় জানান দেয়, তেমন ঘড়ি প্রথম বানানো হয় ১৩ শতকে।

তবে তখনই এই ঘড়িগুলো তেমন জনপ্রিয় হয়নি। হবে কী করে, তখনো যে মানুষের সময় দেখার তেমন দরকারই পড়েনি। সূর্য দেখেই মানুষ দিব্যি বুঝে নিত যে এখন সকাল না দুপুর, বিকেল না সন্ধ্যা।

সময় নিয়ে এরচেয়ে বেশি মাথা ঘামানোর তেমন দরকারই ছিল না।এরও মোটামুটি ৪০০ বছর পরে, ১৮ শতকে যখন কলকারখানা বসতে শুরু করল, তখন মানুষের নির্দিষ্ট করে সময় দেখার দরকার হতে শুরু করল।

নির্দিষ্ট সময়ে কারখানায় যেতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার কাজে লাগতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ে ছুটি হবে, কারখানার নিয়মটাই যে তেমন! তখন সবার ওই কাঁটাওয়ালা ঘড়ির দরকার পড়ল, যাতে সবাই সময়মতো সব কাজ করতে পারে।

ফলে ঘড়িও খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল।এবার একটা হিসাব মেলানো যাক। যে অঞ্চলে পুরোনো ঘড়িগুলো তৈরি হয়েছিল, মিসর আর ব্যাবিলন—এগুলো কিন্তু একই অঞ্চলে।

অন্যান্য সূর্যঘড়িও কিন্তু মোটামুটি সেই অঞ্চলের কাছাকাছিই তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, এশিয়া আর ইউরোপের মাঝামাঝি যে অঞ্চল, পশ্চিমাদের পরিভাষা অনুযায়ী যাকে এখন বলা হয় মধ্যপ্রাচ্য।

মিসর-ইরাক-ইরান-তুরস্ক ওই অঞ্চলে।পৃথিবীর বিখ্যাত সব প্রাচীন সভ্যতাগুলোর বেশির ভাগই কিন্তু গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলেই।

যেমন মিসরের মিসরীয় সভ্যতা, ইরাকের মেসোপটেমীয় সভ্যতা, ইরানের পারস্য সভ্যতা, তুরস্কের গ্রিক ও ট্রয়ের সভ্যতা। মেসোপটেমীয় সভ্যতার আবার চারটি ভাগ আছে—সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, অ্যাসিরীয় সভ্যতা আর ক্যালডীয় সভ্যতা।

আর এ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সূর্যঘড়ির ছায়া দিনের সঙ্গে ক্রমাগত পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সরে যেত।

অর্থাৎ, দিন যত গড়িয়ে রাতের দিকে যেত, ছায়াও তত পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে যেত। সেখান থেকেই ঘড়ির কাঁটার দিকের ব্যাপারটা এসেছে।

সে অনুযায়ীই ঘড়ির কাঁটা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যায়।এখন প্রশ্ন হলো, পশ্চিম-পূর্বের সঙ্গে বাঁ ও ডানের কী সম্পর্ক? এবার তাহলে একটা মানচিত্র নিয়ে বসা যাক।

মানচিত্রের ওপরের দিকে একটা দিকনির্দেশক চিহ্ন থাকে। তার পাশে লেখা থাকে এন বা নর্থ। মানে, মানচিত্রের ওপরের দিকটা হলো নর্থ, বাংলায় যাকে বলে উত্তর। আর নিচের দিকটা হলো দক্ষিণ।

তাহলে হিসাবে বাঁ দিকে পড়ে পশ্চিম আর ডান দিকে পূর্ব দিক। এ কারণেই ঘড়ির কাঁটা ডান দিক থেকে বাঁ দিকে যায়।

মানে, আসলে ওটা ডান থেকে বাঁ না, বলা উচিত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যায়।সূর্যঘড়ি কত যুগ হল পরিত্যক্ত। অথচ তার ছোঁয়া যেন আজও নিয়ন্ত্রণ করে চলে ঘড়ির চলনকে।

ঠিক এই ভাবেই ইতিহাসকে ছুঁয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে সময়। এটাই বোধহয় নিয়ম।

ঢা/তাশা

(Visited 8 times, 1 visits today)