গর্ভবতীদের ওপর চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের প্রভাব: যা বলে ইসলাম

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ। ফাইল ছবি
  •  
  •  
  •  
  •  

ঢাকা১৮ ডেস্ক : আমাদের উচিত যা কিছু কোরআন ও রাসূল (সা.) এর সহিহ হাদিসে রয়েছে সে সম্পর্কে জানা ও সে অনুযায়ী আমল করা।

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কুসংস্কার আছে। ওই সময় খেতে নেই, তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হবে, গর্ভবতী মায়েরা এ সময় কোনো কিছু কাটলে, ছিঁড়লে বাচ্চা ঠোঁট কাটা জন্মাবে, কোনো কিছু ভাঙলে, বাঁকা করলে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেবে। এধরনের যত কথা প্রচলিত আছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা, যার সঙ্গে কোরআন ও সুন্নাহর কোনো সম্পর্ক নেই।

চন্দ্র, সূর্য বা অন্য কোনো সৃষ্ট বস্তু অদৃশ্য ভাবে কারো উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে এধরনের বিশ্বাস রাখা তাওহিদের পরিপন্থী।

যে আল্লাহ তায়ালা ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে তার মনে রাখা উচিত যে, আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে চন্দ্র, সূর্যের গ্রহণও একেকটি নিদর্শন।

কেউ যদি চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ দেখে, তার উচিত হবে রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করা ও বেশি বেশি করে সে সময় আল্লাহকে স্মরণ করা।

বস্তুত সূর্য গ্রহণের সময় গর্ভবতী নারীদের বা কারো জন্যই জাগতিক কোনো কাজ করা বা না করা নিয়ে কোনো রকম বিধি-নিষেধ নেই। এ ব্যাপারে যা প্রচলিত আছে, তা কেবলই কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস। এ ধরনের কোনো নিয়ম মানলে বা বিশ্বাস করলে মারাত্মক গুনাহ হবে।

বরং সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণকে মহান আল্লাহর কুদরতী নিদর্শন বলে বিশ্বাস করতে হাদিসে বলা হয়েছে এবং তখন পুরুষদেরকে মসজিদে জামাতের সঙ্গে সালাতুল কুসুফ (সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে) ও সালাতুল খুসুফ (চন্দ্রগ্রহণের ক্ষেত্রে) নামাজ পড়ার জন্য বলা হয়েছে। এর বাইরে এতে কোনোরূপ বিধি-নিষেধ নেই।

ইসলামের দৃষ্টিতে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ:

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণকে এতদুভয়ের ওপর একটি ক্রান্তিকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর মাখলুক তথা সৃষ্টবস্তু এবং এর প্রমাণস্বরূপই আল্লাহ এ দুটোর ওপর ‘গ্রহণ’ প্রদান করেন। ‘গ্রহণ’ সূর্য ও চন্দ্রের ওপর প্রযোজ্য আল্লাহর কুদরতের আলামত বা নিদর্শন বৈ অন্য কিছুই নয়, যদিও বিভিন্ন ইতিহাসের গ্রন্থে এ সম্পর্কীয় নানাবিদ বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়।

সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ সূর্য ও চন্দ্র পূজারিদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সতর্কবাণী পৌঁছে দেয় যে, এ দুটোও অন্যান্য মাখলুকের মতো আল্লাহর মাখলুক এবং এরা উপাসনাযোগ্য নয়।

যেহেতু এরা নিজেরাই বিপদগ্রস্ত হয়, যা থেকে এরা আত্মরক্ষা করতে পারে না, সেহেতু এগুলো উপাসনার যোগ্য হতে পারে না। বরং এ দুটোকে আল্লাহকে চেনার নিদর্শন হিসেবে গণ্য করাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।

আল্লাহ বলেছেন, ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, আর চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সেজদা করো, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা নিষ্ঠার সঙ্গে শুধু তারই ইবাদত করে থাকো। (সূরা: হা-মিম আস সাজদাহ: ৩৭)।

জাহিলি যুগে মানুষ ধারণা করত যে, বিশ্বে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যু কিংবা দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির বার্তা দিতে সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণ হয়ে থাকে। ইসলাম এটাকে একটি ভ্রান্ত ধারণা আখ্যায়িত করেছে এবং ‘গ্রহণ’কে সূর্য ও চন্দ্রের ওপর একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল বা বিপদের সময় বলে গণ্য করেছে। এ জন্য সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় মুমিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন এ সময়ে অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ রেখে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ, দোয়া, সালাত আদায় প্রভৃতি আমল করে থাকে।

হাদিসের আলোকে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ:

(১) মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, ‘রাসূল (সা.) এর পুত্র ইব্রাহিমের মৃত্যুর দিনটিতেই সুর্যগ্রহণ হলো। তখন আমরা সবাই বলাবলি করছিলাম যে, নবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই এমনটা ঘটেছে। আমাদের কথাবার্তা শুনে রাসূল (সা.) বললেন, সুর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শন সমুহের মধ্যে দুটি নিদর্শন, কারোর মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্রগ্রহণ বা সুর্যগ্রহণ হয় না।’ (বুখারি: ১০৪৩, মুসলিম: ৯১৫ – আরবি সংস্করণ)।

(২) আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূল (সা.) এর জামানায় একবার সূর্যগ্রহণ হলো। গ্রহণ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে রাসূল (সা.) দ্রুত মসজিদের দিকে ধাবিত হলেন এবং সবাইকে মসজিদে আসতে আহ্বান জানালেন। তিনি নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ করলেন যে এই জামায়াতে আগে কখনো এমন করেননি। অতঃপর রুকুতে গেলেন এবং রুকু এত দীর্ঘ করলেন যা আগে কখনো করেননি। অতঃপর দাঁড়ালেন কিন্তু সিজদায় গেলেন না এবং দ্বিতীয় রাকায়াতেও কিরাত দীর্ঘ করলেন। অতঃপর আবার তিনি রুকুতে গেলেন এবং তা পূর্বের চেয়ে আরো দীর্ঘ করলেন। রুকূ সমাপ্ত হলে দাঁড়ালেন, এরপর সিজদায় গেলেন এবং তা এত দীর্ঘ করলেন যে, আগে কখনো এমনটা করেননি। অতঃপর সিজদা থেকে দাঁড়িয়ে প্রথম দু’রাকাআতের ন্যায় দ্বিতীয়বারও ঠিক একইভাবে নামাজ আদায় করলেন। ততক্ষণে সূর্যগ্রহণ শেষ হয়ে গিয়েছে। নামাজ সমাপ্ত হলে তিনি আল্লাহর হামদ (প্রশংসা) পেশ করে খুৎবা প্রদান করলেন। বললেন, সূর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শন সমূহের মধ্যে দু’টো নিদর্শন, কারোর মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না। অতএব, যখনই তোমরা চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করবে তখনই আল্লাহকে ডাকবে, তার বড়ত্ব ও মহত্ব প্রকাশ করবে এবং নামাজে রত হবে। (বুখারি: ১০৪৪, মুসলিম: ৯০১ – আরবি সংস্করণ)।

আমাদের উচিত যা কিছু কোরআন ও রাসূল (সা.) এর সহিহ হাদিসে রয়েছে সে সম্পর্কে জানা ও সে অনুযায়ী আমল করা।

সূর্যগ্রহণ দেখে ভীত-শঙ্কিত হতেন রাসূল (সা.):

সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ দ্বারা আল্লাহ তার বান্দাদের ভীতি প্রদর্শন করেন বলেও হাদিসে উল্লেখ আছে, যাতে মানুষ ঈমান ও আমলমুখী হয় এবং পাপাচার বন্ধ করে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা সূর্যগ্রহণ হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) ভীত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করে দীর্ঘ সালাত আদায় করে বললেন, ‘এ হচ্ছে একটি নিদর্শন, যা আল্লাহ প্রেরণ করেন। এটা কারো মৃত্যু কিংবা জন্মের জন্য সংঘটিত হয় না; বরং এর দ্বারা আল্লাহ তার বান্দাদের ভীতি প্রদর্শন করেন। তোমরা যখন এর কোনো কিছু দেখবে তখন ভীত মনে তার (আল্লাহর) জিকির, দোয়া ও তার ক্ষমা প্রার্থনার দিকে দ্রুত গমন করবে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের নামাজের নিয়ম:

কুসুফ বলে সূর্যগ্রহণকে এবং খুসুফ বলে চন্দ্রগ্রহণকে। সূর্যগ্রহণের সময় যে নামাজ পড়া হয় তাকে ‘সালাতুল কুসুফ’ বলে। চন্দ্রগ্রহণের সময় যে নামাজ পড়া হয় তাকে বলে ‘সালাতুল খুসুফ’। সূর্যগ্রহণের সময় দু’রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত (আল্লাহর নিমিত্ত দু’রাকাত কুসুফের নামাজ পড়ছি এই বলে নিয়ত করতে হবে)।

সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়তে হয়। ইমামতির হকদার তৎকালীন মুসলমান শাসক বা তার নিযুক্ত ব্যক্তি। এক রেওয়াত অনুসারে প্রত্যেক মসজিদের ইমাম নিজ নিজ মসজিদে জামাত করে সূর্যগ্রহণের নামাজ পড়তে পারেন (যদি ইমাম না পাওয়া যায়, তবে প্রত্যেকে একা একা নামাজ পড়বে এবং নারীরা নিজ নিজ ঘরে পৃথকভাবে নামাজ আদায় করে নেবে)।

কুসুফের নামাজের জন্য আজান বা ইকামত দেয়া জায়েজ নয়। পাড়ার লোকদের একত্র করার জন্য ‘নামাজে চলো, নামাজে চলো’ বলে একজন লোক উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে পারবে।

সাখাতুল কুসুফের মধ্যে সূরা বাকারার মতো অনেক লম্বা কেরাত পাঠ করা এবং রুকু সেজদা অনেক লম্বা করা সুন্নত এবং কেরাত চুপে চুপে পড়তে হবে।

নামাজ শেষে ইমাম সূর্যগ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত- দু’হাত উঠিয়ে দোয়া করতে থাকবে (আর নিজেদের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে)। মুক্তাদিরা আমিন আমিন বলতে থাকবে। গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দোয়ায় মগ্ন থাকবে। অবশ্য যদি গ্রহণ ছাড়ার আগে সূর্য অস্ত যায় বা কোনো ফরজ নামাজের ওয়াক্ত হয়, তবে দোয়া বন্ধ করে নামাজ পড়ে নেবে।

চন্দ্রগ্রহণের সময়ও দু’রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণের নামাজের জন্য জামায়াতে নামাজ পড়া বা মসজিদে যাওয়া সুন্নত নয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাড়িতে পৃথক পৃথকভাবে একাকী নামাজ পড়ে নেবে।

আল্লাহ যেন আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন এবং আমাদেরকে রাসূল (সা.) এর দেয়া শিক্ষাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে সাহায্য করেন। আমিন।

ঢা/কেএম

জুলাই ৭, ২০২০ ১২:৩৭

(Visited 19 times, 1 visits today)