ক্রীম রোল, আহা সেই ক্রীম রোল

  •  
  •  
  •  
  •  

আজাদুল হক: গ্রীন রোডে যেখানে এখন গ্রীন লাইফ হাসপাতাল তার পাশে নির্মানাধীন জায়গায় অনেক আগে আমাদের ছোটবেলায় কয়েকটি দোকান ছিল। দোতলায় ছিল পিংকী ফটোগ্রাফার্স আর কোনায় একটা দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার।

নীচে ছিল দীপুমিন মেডিকো নামে একটা ওষুধের দোকান আর ঠিক তার পাশে ছিল একটা বেকারী, নাম ছিল সিবকো বেকারী। এই বেকারীকে নিয়েই আজকের কথকতা। এই দোকানটার সব কয়েকটা বৈয়াম আর কাঁচের শেলফে কি রাখা থাকত তা যেমন জ্বলজ্বলে মনে আছে, তেমনি ঐ দোকানের ঘিয়ে মাখা ঘ্রানটাও যেন নাকে লেগে আছে।

কাঁচের বৈয়ামগুলোতে থরে থরে নানা রকমের বিস্কুট সাজানো থাকত। আর থাকত চানাচুর। বাল্ব লাগানো একটা টিনের বাক্সে থাকত হট প্যাটিস। তবে আমার নজর থাকত দুইটা জিনিসের প্রতি। একটা হল ক্রীম রোল আর আরেকটা হল পেস্ট্রি। এগুলো তখন এতই মজা লাগত যে খাবার সময় আবেশে যেন চোখ বন্ধ হয়ে আসত।

পেস্ট্রীগুলো মুখে দিলেই গলে যেত। আর ক্রীম রোল? আহা কি সেই ক্রীম রোল। তবে এই দোকানের সবকিছু ছিল আমার কেনার সামর্থ্যের বাইরে।

আমাদের বাসায় অতিথীদের বিভিন্ন শ্রেনী অনুযায়ী কদর করা হত।এক ধরণের অতিথী ছিল যাদের জন্য মুড়ি মাখানো, বা শহীদের দোকানের বাবুল বিস্কুট বা কাঠের টুকরার মতন দুইটা টোস্ট বিস্কুটই যথেষ্ট ছিল। মাঝামাঝি রকমের অতিথীদের জন্য গ্রীন রোডের জিঞ্জিরা হোটেল থেকে থেকে আনা হত ডালপুরি বা বিক্রমপুর মিস্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি।

আর ভিআইপি বা বিশেষ টাইপের অতিথীদের জন্য আনা হত এই বেকারী বিস্কুট, পেস্ট্রি বা ক্রীম রোল। সাথে থাকত মিষ্টি। এই তিন নাম্বার অতিথী এলেই আমার নজর থাকত কখন এরা যাবে আর কয়টা ক্রীম রোল বাকী থাকবে।

অতিথীদের সামনে খেতে বললে লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে বলতাম, না ঠিক আছে, আমি খাব না। আর তারা চলে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম বেঁচে যাওয়া ক্রীম রোলের ওপর। অথচ দোকানে গেলে কখনো মনে হত না এখান থেকেই একটা খেয়ে যাই। আম্মাই বেশীর ভাগ আমাকে দোকানে যেতে বলতেন।

উনি কোনদিনও জিজ্ঞেস করতেন না দোকান থেকে কোন টাকা ফিরেছে কিনা। এটা ছিল আমাদের বাসার একটা অলিখিত নিয়ম। বাজার বা দোকান থেকে ফিরেই আমি বাকী টাকা এবং খুচরো পয়সা বিছানার একদিকের তোষক উঠিয়ে রেখে দিতাম। সেখানে আরো টাকা থাকত।

এরপর যদি কখনো টাকা লাগত তাহলে আম্মাকে জিজ্ঞেস করতাম টাকা নিব কিনা।

আম্মা সায় দেবার পর ঐ বিছানা উঠিয়ে সেখান থেকে গুনে গুনে যা নেবার তা নিয়ে নিতাম। আম্মা না বলা পর্যন্ত কারো চোখ ফাকি দিয়ে সেখান থেকে টাকা নেবার কথা মগজেও আসেনি কোনদিন। ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার বল কিনতাম সবাই মিলে চাঁদা তুলে।

আমার ভাগে পড়ত আট আনা বা একটাকা। সেই চাঁদা আম্মার কাছে নেবার জন্য কত ফন্দি আটতাম। আম্মাকে খুশী করার জন্য জোরে জোরে পড়তাম ভাবখানা এমন যে আমি খুবই ভালো এক ছাত্র। কিন্তু আমি যে গবেট তা আম্মাও জানতেন।

তিনি জেনেও ভান করতেন যেন জানেন না। জোরে জোরে পড়ার পর কথার ছলে টুশ করে বলে ফেলতাম যে আমার একটা টাকা লাগবে ফুটবল বা টেনিস বল কেনার চাঁদার জন্য। আম্মা সায় দিলে দৌড়ে গিয়ে বিছানার তোষকের নীচ থেকে গুনে গুনে চারটা সিকি বা দুটো আধুলি নিয়ে নিতাম।

সহজ, সরল সেই জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত চোখে ভাসে। গাছ যেমন বেশী বয়স হলে নুয়ে পড়ে মাটিতে, ফিরে আসে প্রকৃতির কোলে, তেমনি যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন ফিরে যাচ্ছি আপন ছেলেবেলায়।

স্মৃতি রোমন্থনের স্বাদই আলাদা।
একদম ঐ ক্রীম রোলগুলোর মতন!!

আজাদুল হক
আজাদুল হক

লেখক পরিচিতিঃ আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী তড়িৎ প্রকৌশলী; সাবেক কর্মী, জনসন স্পেস সেন্টার – নাসা, হিউষ্টন, টেক্সাস।
[ঢা-এফ/এ]

জানুয়ারি ১০, ২০২১ ১০:১৩

(Visited 27 times, 1 visits today)