‘করোনামুক্ত চায়না’ উপাখ্যান, অর্থনীতির নয়া চাপ

  •  
  •  
  •  
  •  

মোঃ শফিকুল আলম: অলৌকিকভাবে চায়না দেশকে করোনামুক্ত করেছে এই উপাখ্যান ভেঙ্গে পড়ায় লক্ষ লক্ষ চাইনিজ এবং বিশ্বের অর্থনীতি নতুন করে চাপের মুখে!!!

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার চায়নার অর্থনীতি বিগত এক দশক জিডিপি’র ধীর গতিতে উন্নয়নে থাকা এখন একেবারেই নাজুক অবস্থায় পতিত হয়েছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলে করোনাভাইরাসের কড়াকড়ি লকডাউনে ৫২ বছর বয়স্ক বিশিষ্ট সিনেমা ব্যবসায়ী, ‘বোনা ফিল্ম গ্রুপ’ এর চীপ এক্সিকিউটিভ হুয়াং উই তার ব্যবসায়ের মৃত্যু ঘটায় তিনি বেইজিং বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এবং এই আত্মহত্যাটি ঘটে দেশের রাজধানি বেইজিং এর ২১ মিলিয়ন মানুষকে যখন গত সপ্তাহে গৃহবন্দী থাকার নির্দেশ আসে তার কয়েক দিন পূর্বে। নতুনভাবে এশিয়ার বৃহত্তম জিন ফাদি হোলসেল ফুড মার্কেট থেকে নতুন করে অধিকতর ভয়ানক করোনাভাইরাসের সংক্রমন ঘটে। বেইজিং এর জনসংখ্যার ৭০% এই মার্কেট থেকে ভেজিটেবল সাপলাই পেয়ে থাকে। পুরো মার্কেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

চায়নার দক্ষিনান্চলের মানুষ বেশ পরিশ্রমী হিসেবে চিহ্নিত। ফুজিয়ান এবং গুয়ানডং দু’টি প্রদেশে ১৫০ মিলিয়ন লোকের বসবাস। বিগত ৪০ বছর এই দু’টি প্রদেশ জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য হারে অবদান রেখে আসছে।

এ দু’টি প্রদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। কুয়ানঝুর গাড়ী ব্যবসায়ী থেকে গুয়ানঝুর কারখানা শ্রমিক কিংবা শেনঝেনের রাস্তার ফেরিওয়ালা পর্যন্ত কঠিন সময় অতিবাহিত করছে।

১৯৮০ সালে বর্তমান চাইনিজ প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং পোর্ট সিটি ফুজিয়ানের ভাইস মেয়র ছিলেন। এই শহরের জিয়ামেনে ৬০ বছর বয়স্ক ফল বিক্রেতা মি: চেন বলেন তাদের এখন এক কড়িও আয় নেই। তিনি আরও বলেন যে তার ছেলে একজন শ্রমিক এবং নিজেই নিজেকে সাপোর্ট করতে পারছেনা। ছেলের ওপরও মি: চেন নির্ভর করতে পারছেননা।

পোর্ট সিটি ফুজিয়ান চায়নার অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট। এখন কোনো ভিজিটর নেই। মি: চেনের ব্যবসায় তেমন ভালো ছিলোনা। এখন পুরোপুরি বন্ধ। করোনাভাইরাস লকডাউনের পর চায়নার কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত মাসিক ১০০ উয়ান হারে যা’ ২০.৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সমান বয়স্কভাতা সহায়তা পাচ্ছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় একজন সাধারন শ্রমিক ঘন্টায় ২০.৫০ ডলারের বেশি আয় করে থাকেন এবং সংগত কারনেই তারা এই পরিমান অর্থ গড়ে প্রিতিদিন ব্রেকফাস্ট বা লান্চে ব্যয় করে থাকেন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখন চায়নায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহন করছে সেবা গ্রহনকারী নিজে। করেনাভাইরাসের কারনে লক্ষ লক্ষ সাধারন শ্রমিকের আয় কমে যাওয়ায় তারা স্বাস্থ্যসেবা বন্চিত হবেন বা হচ্ছেন।

চায়নার প্রধানমন্ত্রী লি কিকিয়াং স্বয়ং গত মাসে বললেন ১.৪ বিলিয়ন চাইনিজদের মধ্যে মাত্র ৬০০ মিলিয়ন দারিদ্রসীমার সামান্য উপরে বসবাস করেন। বাকী প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন।
তাদের মাসিক গড় আয় মাত্র ১০০০ উয়ান বা ২০৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।

এই আয় দিয়ে তারা মধ্যম আঁকারের কোনো সিটিতে একটি কক্ষের ভাড়া মেটাতেও পারেননা। সমসাময়িক চায়নায় প্রধানমন্ত্রী লি’র বক্তব্য অভ্যন্তরীণ বিতর্ক তৈরী করেছে।

শেনঝেন গুয়ানডং এর একটি উন্নত মেট্রোপোলিশ সিটি। শতাব্দীকাল ধরে দ্রুত বর্ধনশীল নগরী হিসেবে পরিচিত। ২০ মিলিয়ন লোকের বসবাস এই শহরে। উইচ্যাট মালিকানাধীন টেক জায়ান্ট টেনসেন্ট এই শহরে অবস্থিত। টেনসেন্টের মূল্য বর্তমান বাজারে ৫০০ বিলিয়ন ডলার।

একই সাথে আলিবাবা গ্রুপের মূল্য হবে ৮৭৫ বিলিয়ন ডলার। করোনাভাইরাসের কারনে ২০২০ এর প্রথম ছয় মাস মানুষ ঘরে আবদ্ধ হয়ে সবচাইতে বেশি পরিমান ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে।

টেনসেন্ট এবং আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা পনি মা এবং জ্যাক মা’র সম্পত্তির মূল্য যথাক্রমে ৭৩ বিলিয়ন ডলার এবং ৬৪ বিলিয়ন ডলার। শেনঝেনের শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশের এমপ্লয়মেন্ট করে থাকে টেনসেন্ট এবং আলিবাবা। শেনঝেনের হুয়াকিয়াং নর্থ রোডে রয়েছে ইলেকট্রনিক মার্কেট।

এই মার্কেটের তিন তলায় ড্রোন চায়নার জনপ্রিয় টয় বিক্রি করে থাকেন মিস লি। তৈরী করে থাকেন তার হোম সিটি শান্তাউতে। মিস লি বলেন কোভিড-১৯ শুরুর পর আর বিক্রি নেই। আট তলায় অবস্থিত স্টোর মালিকদের একই ধরনের প্রতিক্রিয়া।

রাওয়ান ক্যালিক একজন অস্ট্রেলিয়ান যতক্ষণ এই মার্কেটের একটি স্টোর বিটমেইন এর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ স্টোরে একজনও কাস্টোমার ঢুকতে দেখেননি এবং তিনি ঘন্টাধিক সময় স্টোরের সামনে ছিলেন। রাস্তার অপর পাড়ে একজন মধ্যবয়সী মহিলা একটি ব্যাংকের সামনে ফেপিয়াও (invoice or tax receipts) ফেপিয়াও বলে চিৎকার করছে।

মূলত ফেইক ইনভয়েসেস সংগ্রহ করে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীগন এগুলো ব্যবহার করে থাকে। করোনার মধ্যে সেই মহিলার কাছেও কোনো কাস্টোমার দেখা গেলোনা। অর্থাৎ এই ধরনের অবৈধ ব্যবসায়ও বন্ধ রয়েছে। কারন মানুষের আয়ইতো কমে গেছে এবং এমনিতেই আয়কর কম দিতে হবে।

গুয়াডং প্রদেশের রাজধানি হচ্ছে গুয়ানঝু। রাজধানির অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ। অথচ গুয়ানঝু বিশ্বের অন্যতম ব্যবসায় কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক বর্ডারইতো বন্ধ। কি করে ব্যবসায় চলবে? চায়নায় স্থানীয় শ্রমিকদেরই কোনো জব নেই সেখানে মাইগ্রান্ট শ্রমিকদের জব থাকার কোনো প্রশ্নই আসেনা।

অস্ট্রেলিয়ান প্রতিনিধি দক্ষিন চায়নার শ্রম বাজার ঘুরে দেখলেন। বন্ধের সময় আবারও বর্ধিত করা হয়েছে। মহামারির কারনে শ্রম বাজারে নতুন কোনো এমপ্লয়মেন্ট নেই। গত বছর এই সময়ে এই বাজারে ২.১৮ মিলিয়ন জবের সংস্থান ছিলো। এই বড় শ্রম বাজারে কর্মসংস্থান করে থাকে প্রধানত গুয়ানঝু সরকার এবং বেইজিং কেন্দ্রীয় সরকার যৌথভাবে। চাইনিজ নেতৃত্ব বেকারত্বের এই হার দেখে এখন হতাশ।

প্রধানমন্ত্রী লি’র ন্যাশনাল পিপল’স কংগ্রেসে সরবরাহকৃত রিপোর্ট এবং বক্তৃতা সে কারনেই কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তাঁর এই বক্তৃতা “আমাদের অর্থনীতি এমন কিছু ফ্যাক্টরের সম্মুখীন হবে যা’ অনুমান করা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।” তাঁর এই বক্তৃতায় কোনো অসত্যতা ছিলোনা।

গত বৃহস্পতিবার অনলাইন জব মার্কেট ওপেন করেছে সাউথ চায়নায়। জব না থাকার কারনেই জব মার্কেট ওপেনিংয়ে দেরী হচ্ছিলো। জবলিস্টিং এ কোনো পারমানেন্ট জবের অফার নেই। কমিশন বেইজড কিছু অফার রয়েছে। টেলিফোনে ইনসিউরেন্স পলিসি বিক্রি করতে পারলে কমিশন পাওয়া যাবে এমন জবের অফার আছে। কমিশনের ভিত্তিতে ফোন কোম্পানিগুলোর ফোন বিক্রি করার কিছু জবের অফার রয়েছে। একেবারেই সীমিত।

অথচ মহামারির পূর্বে জব মার্কেটের অবস্থা ছিলো অনেকটা শপিং করার মতো। শপিং এ গেলে যেমন প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা যেতো তেমনি জব মার্কেটে জব চাইলেই পাওয়া যেতো- কথাগুলো বললেন ৩৫ বছর বয়স্ক শ্যাং ইয়াউন। শ্যাং বললেন এখন তারা শুধু বাঁচার লড়াই করছেন।

চীনের যখন অর্থনীতির এই অবস্থা তখন তারা বিশ্বে মোড়ল সাজার জন্য এশিয়া এবং আফ্রিকার দারিদ্রক্লিষ্ট দেশগুলোতে করোনা মহামারির সুযোগে নিম্ন মানের মাস্ক, মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং ওষুধ সামগ্রী সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছেন। ইন্ডিয়ার বর্ডারে আগ্রাসন চালিয়ে যুদ্ধ বাঁধানোর চেষ্টা করছে।

অস্ট্রেলিয়ায় চাইনিজ স্টুডেন্টদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহন না করার জন্য প্রপাগান্ডা করছে, অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্লি আমদানির ওপর ট্যারিফ আরোপ করেছে,অস্ট্রেলিয়া থেকে বিফ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার স্টেট এবং ফেডারেল গভর্নমেন্টের ওয়েবসাইট হ্যাক করে তথ্য ডাকাতির চেষ্টা করেছে। এর কারন হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেনো উহাং এ সৃষ্ট করোনাভাইরাসের উৎস তদন্তের কথা বললেন।

করোনা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে এই মর্মে ক্রেডিট নিলেও এখন করোনার দ্বিতীয় ওয়েভে নতুন করে বেইজিং আক্রান্ত। অর্থনীতির অবস্থা প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। এর মধ্যেও চীন নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের প্রচেষ্টায় রতো। চায়নার এহেনো আচরনে অস্ট্রেলিয়া নতুনভাবে ব্যবসায়িক স্ট্রাটেজি নিতে বাধ্য হচ্ছে।

মোঃ শফিকুল আলম
মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।
[ঢা/এফএ]

(Visited 8 times, 1 visits today)