করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করা সম্ভব

বিজ্ঞানীদের মতে যেভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করা সম্ভব
বিজ্ঞানীদের মতে যেভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করা সম্ভব

মোঃ শফিকুল আলমঃ কিভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমন বন্ধ করা যাবে সে সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকগন এবং স্বাস্থ্যবিষারদগন কি বলছেন নিউ ইয়র্ক টাইমস তার বিষদ বর্ননা করেছে।

অতীতে যেসব বিজ্ঞানী সফলতার সাথে দ্রুত সংক্রমন করে এমন ভাইরাসজনিত মহামারী পরাজিত করেছে তারা বলছেন যে করোনাভাইরাসের সংক্রমন বন্ধ করা যাবে; তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

করোনাভাইরাস যদিও অজানা মারাত্মক এবং দ্রুত সংক্রমনযোগ্য ভাইরাস তবুও প্রতিরোধ করা যাবে বলেই বিজ্ঞানীগন মনে করেন। চায়না, দক্ষিন কোরিয়া, সিংগাপুর এবং তাইওয়ান তা’ প্রদর্ষিত করেছে। তাদের উচ্চণ্ড প্রয়াসে সংক্রমনের চাকা থামিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে।

কতোটা অবদমিত রাখা যাবে তা’ এখনও দেখতে হবে। কিন্তু ইউএসএ’র সেই সমস্ত সফল বিজ্ঞানীদের পূনরায় সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয় এবং অর্থ বরাদ্দ করার ওপর এবং বিজ্ঞানীদের ওপর আমেরিকার জনগনের বিশ্বাসের স্তর এবং সহযোগিতার ওপর।

এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহনের প্রয়োজন পড়বে।

করোনাভাইরাস থামিয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কারন, করোনাভাইরাসের একটি দূর্বলতা রয়েছে। আর তা’ হচ্ছে এই ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে এবং close contact এ ছড়ায়। এই অবজার্ভেশনটির কথা ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের এক্সপার্ট প্যানেলের চেয়ার ড: ডেভিড এল হেম্যান বলেছেন।

এইভাবে close contact এ কেনো ছড়ায় শুধুমাত্র তা’ জানা যায়নি। ড: ডেভিড বলেন, “close contact এ কোনো গ্রুপের আসা রোধ করা যায়।” “শুধুমাত্র প্রয়োজন সনাক্তকরন এবং স্প্রেড বন্ধ করা এবং সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে close contact এ আসাদের অবিরাম track এবং trace এ রাখা।”

কিন্তু এই উদ্যোগ নিতে যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থাপকদের বোধসম্পন্ন হতে হবে তেমনি সকল সাধারন জনগনের নি:শর্ত সহযোগিতা দিতে হবে। অবরুদ্ধকরন, পৃথকীকরণ ইত্যাদির সফলতা নির্ভর করবে আমেরিকা বা বিশ্বের যেকোনো দেশের সাধারন জনগনের বাস্তবতা পরিমাপ করার ওপর।

যখন তারা বুঝতে সক্ষম হবে যে নিজেদের বাঁচার প্রয়োজনে অবরুদ্ধ থাকতে হবে, পৃথক থাকতে হবে স্বল্প সময়ের জন্য। নিজেকে, প্রিয়জনকে, তথা পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য।

এখন পর্যন্ত যেসব বিশেষজ্ঞগন সাক্ষাত্কার দিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন তারা সবাই পারসন টু পারসন সংক্রমনের ব্যাপারে একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহনে ঐকমত প্রকাশ করেছেন।

এবং তা’ হচ্ছে সোসাল ডিসট্যানসিং, আইসোলেশন, নির্দিষ্ট জনগোস্ঠীর নির্দিষ্ট এলাকায় কনফাইনমেন্ট, আইসোলেশন, আক্রান্তদের সনাক্তকরন, তাদের সংস্পর্শে আসাদের কনটাক্ট ট্রেসিং ইত্যাদি।

উপরোক্ত বিশেষজ্ঞগনের মধ্যে যারা রয়েছেন তাদের সবাই ইতোমধ্যে এইডস, মেলেরিয়া, যক্ষা, ইবোলা এবং ফ্লু ইত্যাদি ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

এই বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বৈজ্ঞানিক, স্বাস্থ্যব্যবস্থাক, মহামারী কেন্দ্রের পরিচালক এবং তারা সবাই আমেরিকা পরিচালিত বৈশ্বিক স্বাস্হ্য সংস্থাসমূহ পরিচালনা করে থাকেন।

এই বিশেষজ্ঞগন আমেরিকানদের জন্য বলেছেন যে এই সময়ে সবাইকে বাসায় থাকতে হবে। আক্রান্তদেরকে আইসোলেশনে রাখতে হবে। মানুষের চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে।

মাস্ক এবং ভেন্টিলেটরের বর্ধিত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। টেস্টিং সুবিধা অবারিত করতে হবে।

আমেরিকার মতো উদার গনতান্ত্রিক দেশে ফোর্সড আইসোলেশন, স্কুল ক্লোজিং বা কনটাক্ট ট্রেসিং ইত্যাদির ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে। এই দেশ (পশ্চিমা গনতান্ত্রিক দেশসমূহ) মানুষের চলাচলের এবং ব্যক্তিগত মতামত ব্যক্ত করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

আমেরিকান পদ্ধতি হচ্ছে স্বেচ্ছায় উদ্বুদ্ধ করে অংশগ্রহন করিয়ে অধিকতর ভালো ফল প্রাপ্তি। জনগনকে মানানোর পদ্ধতি নয়; যথাসময়ে যথাপোযুক্ত কাজটি করার বা মানার আবেদন জানানো হচ্ছে আমেরিকান পদ্ধতি।

যখন থেকে বিশেষজ্ঞগন গনমাধ্যমে সাক্ষাত্কার শুরু করেন তখন থেকেই লক্ষনীয়ভাবে আমেরিকানদের জীবন আচরনে পরিবর্তন শুরু হতে থাকে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্টেট গভর্নমেন্ট থেকে জনসাধারনকে নিজ নিজ বাসায় থাকার কথা বলা হচ্ছে।

অপরিহার্য নয় এমন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের শাটার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমেরিকার রাস্তাঘাট এখন নীরব। বন্ধুরা একে অপরের সাথে দূরত্ব বজায় রাখছে। সপ্তাহ খানেক আগে যা’ আমেরিকায় অসম্ভব মনে হয়েছিলো তা’ এখন স্বাভাবিক। আমেরিকার মানুষ এখন বিশেষজ্ঞদের উপদেশ অনুসরণ করছে।

বৈজ্ঞানিকদের কথা অনুসরণ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স নিয়মিত করোনাভাইরাসের ওপর ব্রিফিং করে যাচ্ছেন।

তবে কথা উঠেছে রাজনীতিকদের এখন পাশে ঠেলে বিজ্ঞানীদের করোনাভাইরাস মহামারী দমনের নেতৃত্ব গ্রহন করতে হবে। কারন বৈজ্ঞানিকদের যেমন ভাইরাস কনটেইনড রাখার ক্ষমতা রয়েছে তেমনি আমেরিকানদের কি করতে হবে তা’ ব্যাখ্যা করে বোঝানোরও ক্ষমতা রয়েছে।

যুদ্ধের সময় জেনারেল যুদ্ধ সম্পর্কিত ব্রিফিং করেন; তেমনি প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে মাইক্রোফোনের সামনে থেকে সরিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলার জটিল বিষয়ে ব্যাখ্যাদানে মেডিকেল এক্সপার্টদের এগিয়ে আসতে হবে বা আসতে দিতে হবে।

সর্বোপরি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্রিফিং এ বলতে হবে কিভাবে মানুষের জীবন রক্ষা পাবে, বলতে হবে গড় আয়ের মানুষরা আসন্ন কঠিন সময় কিভাবে পার করবে।

অঙ্গুলি নির্দেশ করে কে ভাইরাস সংক্রমনে দায়ী আর কে দায়ী নয় তা’ বলার সময় এটি নয়। এখন শত্রুর দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে এবং তা’ হচ্ছে ভাইরাস।

বৈজ্ঞানিকগন এবং মেডিকেল এক্সপার্টগন নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর ব্যাপারে একমত পোষন করেছেন:

– শহর থেকে শহরে সংযোগ বন্ধ করে সংক্রমন ঠেকাতে হবে,
– সংশ্লিষ্ট শহরের মধ্যে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রন করে সংক্রমন ঠেকাতে হবে,
– আক্রান্তদের সনাক্ত করতে টেস্ট নিশ্চত করতে হবে এবং তা’ হতে হবে টেস্টারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে,
– সনাক্তকৃত কনফার্মড ইনফেক্টেডদের আইসোলেশনে রাখতে হবে,
– টেম্পারেচার চেক,
– সর্বত্র মাস্কের পর্যাপ্ততা নিশ্চিতকরন,
– ভাইটাল সার্ভিসগুলো সরকারী ব্যবস্থায় অব্যাহত রাখা – খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ, ফোন লাইনস, গ্যাস এবং নিত্যপ্রয়েজনীয় সার্ভিসেস। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভেন্টিলেটর, মাস্ক ইত্যাদির উৎপাদন অব্যাহত রাখা,
– ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেন তৈরীতে প্রনোদোনা প্রদান,
– স্বাস্থ্যবিভাগসহ জরুরী সার্ভিসে ভলান্টিয়ার নিয়োগ,
– নির্দিষ্ট কিউর মেডিকেশন জানা না থাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এন্টিমেলেরিয়া ড্রাগস ক্লোরোকুইনস এবং হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনস প্রয়োগ করে দেখা। যদিও দু’টি মেডিকেশন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কতোটুকুন কার্যকরী তা’ প্রমানিত নয়,
– চুড়ান্তভাবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারে যেতে হবে যার বিকল্প নেই।

ধনী দেশগুলোকে ভাবতে হবে করোনা মোকাবেলায় তারা কতোটা হিমশিম খাচ্ছে এবং অপেক্ষাকৃত গরীব দেশগুলো এই মহামারীর সাথে কিভাবে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকবে।

চীনসহ এশিয়ার যে দেশগুলো অলরেডি করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রনে এনেছে তাদের উচিত হবে যুদ্ধরত গেশগুলোকে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা।

প্রথমাবস্থায় ধনীদেশগুলো বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থার সতর্কবানীকে গুরুত্ব দেয়নি বা অবজ্ঞা করেছে এবং তা’ ছিলো আইসোলেশন এবং কনটাক্ট ট্রেসিং।

তুলনামূলকভাবে গরীব দেশগুলো বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থার ওয়ার্নিং অনুসরন করেছে এবং করছে যখন ধনীদেশগুলো বরং প্রথমাবস্থায় এই রুলস্ কার্যকর করতে পারেনি।

একটি দেশের সফলতা থেকে এখন অন্য দেশের শিক্ষা গ্রহন করে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এখন ধনী, গরীব নির্বিশেষে একে অপরের সাহায্যে এই মহামারী রোধ করতে হবে।

কিভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমন বন্ধ করা যাবে সে সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকগন এবং স্বাস্থ্যবিষারদগন কি বলছেন নিউ ইয়র্ক টাইমস তার বিষদ বর্ননা করেছে।
মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )