কবরস্থান এবং শ্মশান ছাড়া আর কিছুই থাকবে না

কবরস্থান এবং শ্মশান ছাড়া আর কিছুই থাকবে না
  •  
  •  
  •  
  •  

মুক্তমত ডেস্ক: করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যখন সারা পৃথিবীতে ভাটা নেমে আসতে শুরু করছে তখনই প্রবল জোয়ার শুরু হলো বাংলাদেশে!

যখন প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন করে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল তখন দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় লকডাউনের প্রয়োজন পড়েছিল। প্রতিটি গ্রামে গ্রামে শহরের অলিতে গলিতে স্বেচ্ছা লকডাউন চোখে পড়েছিল।

এখন যখন প্রতিদিন ১৫ শ থেকে ১৭ শ করে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে তখন যেন চারিদিকে উৎসব মুখর পরিবেশ! লকডাউন তো দূরে থাক সমান্যতম সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টাও কারো মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

চিকিৎসক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যে পরিমাণ আক্রান্ত হয়েছে তাতে করে কোনভাবেই তাদেরকে দোষারোপ করা যায় না। আমাদের দেশের সরকার এবং দেশে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে যারা আছে নিঃসন্দেহে তারা অনেক জ্ঞানী। তাদের সেই জ্ঞানের কাছে আমার সমান্যতম যুক্তি কিংবা কথাগুলো বড়ই হাস্যকর ঠেকবে এতেও কোন সন্দেহ নাই।

প্রথম যখন অল্প অল্প করে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছিল তখন বুঝা উচিত ছিল এটি এমন একটি রোগ যেটা সংক্রমিত হয়। সংক্রমিত রোগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা সহজে নিম্নমুখী হয় না, ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভোগান্তি সৃষ্টি করবে।

কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসা সরঞ্জাম, ত্রাণ এবং যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিমাণ গুলো শুরুতেই এত ব্যাপক ছিল যে একমাস গড়িয়ে যেতেই নিঃস্ব হয়ে গেছে সবাই। শেষ হয়ে গেল সরকারের ত্রাণ, শেষ হয়ে গেল চিকিৎসা সরঞ্জাম, শেষ হয়ে গেল ধনীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

বাংলাদেশকে মুখে উন্নত রাষ্ট্রের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে এখন আর দেখা যায় না। ধারণা করা যায় তারা লেজ গুটিয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে পুরনো কিছু সঞ্চয় বসে বসে খাচ্ছে। কিন্তু একদিন যখন সেই সঞ্চয় শেষ হয়ে আসবে, চারিদিকে অগণিত মানুষের মৃত্যু হবে, ঘরের দরজা খুললেই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস তাদের ঘাড় চেপে ধরবে তখন তারা কি বলবে তা আমি দেখে যেতে পারবো কিনা জানিনা।

তবে একটা কথা পরিষ্কার অর্থনৈতিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে বলে প্রতিটি মানুষ নিজে থেকে লকডাউন ভেঙ্গে জীবিকার জন্য বেরিয়ে পড়েছে, যে সমস্ত মানুষ ঈদের জামা কাপড় ক্রয় করার জন্য কিংবা বিলাসবহুল দ্রব্যের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে নূন্যতম সচেতনতা নাই। এর কারণ তারা কুসংস্কারে বিশ্বাসী, তাদের মধ্যে জ্ঞানের আলো এখনো পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারেনি।

চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর এলাকায় বসবাস করা একজন গ্রেজুয়েট নাগরিক যদি বিশ্বাস করে করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যু হবে সেটা বিশ্বাস করলে ঈমান চলে যাবে! হায়াত-মউতের মালিক একমাত্র সৃষ্টিকর্তা বলে সাবধানে চলাফেরা করার ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেয় তাহলে অজো পাড়া গাঁয়ে বসবাসকারী মানুষগুলোর অবস্থা কি হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন এই রোগ শুধুমাত্র খারাপ মানুষদের কে আক্রান্ত করবে ভালো মানুষদের আশেপাশেও এই রোগ পৌঁছাতে পারবে না।

বেশ কয়েকজন ধার্মিক লোকের ও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। সেই যুক্তি দেখাতে গিয়ে ও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে আমাকে। যে ধার্মিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে তাহার মতাদর্শের বাহিরে অন্য ধার্মিক ব্যক্তিকে অনুসরণকারী ভক্তরা মনে করছেন তিনি আদৌ ধার্মিক ছিলেন না।

অন্যদিকে বাংলাদেশে যদি করোনা ভাইরাসের কারণে ১০ লক্ষ মানুষের ও মৃত্যু হয় তাতেও সরকার পার পেয়ে যাবে। বরং মাথা উঁচু করে বলতে পারবে আমেরিকার মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের অবস্থা যদি এত বেশি খারাপ হয় সেই তুলনায় আমাদের মতো অনুন্নত এবং জনবহুল দেশে এত কম মানুষের মৃত্যু নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য।

যখন কোন একটা সফলতা নিয়ে কথা হয় তখন আমরা আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী, যখন ব্যর্থতা এসে ছুঁয়ে পেলে আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের তখন আমরা দরিদ্র এবং অনুন্নত।

করোনা ভাইরাসের সাথে লড়াই করতে করতে একটি সময় গিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা এখনো পর্যন্ত কেউ ধারণা করতে পারছে না। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত এই মহামারী থেকে বেঁচে গেলেও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আবারো অনুন্নত রাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছে যাবে। অন্তত উন্নয়নশীল নামক যে ব্যাপারটি ছিল তা আর আমাদের হাতে থাকবে না।

যে সমস্ত মানুষ গুলো বেঁচে থাকবে তাদের জানমালের নিরাপত্তা থাকবে না, মানবতা নামক বিষয়টি চিরতরে নির্বাসিত হবে। করোনাভাইরাস নিয়ে সরকার সময়োপযোগী কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি। দেশের তথাকথিত জ্ঞানী লোক গুলো ও সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত জানিয়ে সরকারের পাশে দাঁড়াতে পারেনি। চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দেশের ত্রাণ বিতরণের বিষয়গুলোর সুষম বন্টন হয়নি।

এই ভাইরাসের ওষুধ এবং ভ্যাকসিন যখন আবিষ্কার হয়নি তখন একমাত্র আকাশের দিকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

কিন্তু তারপরেও নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করে অন্যান্য দেশগুলো যতদিন টিকে থাকবে ততদিনে বাংলাদেশে কবরস্থান এবং শ্মশান ছাড়া আর অবশিষ্ট কিছু থাকবে বলে আমার মনে হচ্ছে না।

লেখক: মুহাম্মদ দিদারুল ইসলাম
কবি ও সাংবাদিক

ঢা/আরকেএস

 

(Visited 4 times, 1 visits today)