ওমর ইশরাক: দুর্দিনে বাংলাদেশকে আশার আলো দেখালেন যিনি

প্রযুক্তি ডেস্ক: করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। লাগাম টানা যাচ্ছে না এ মহামারির। এ সময়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে ভেন্টিলেটর (কৃত্রিমভাবে শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়ার যন্ত্র)। এটি সহজেই যেকোন পরিচর্যা কেন্দ্র বা বাসায় ব্যবহারের উপযোগী। তবে এটি তৈরি করা এত সহজ বিষয় না।

ফুসফুসের ব্রোংকিউল গুলি যখন ফ্লামেটেড হয় এবং জলীয় পদার্থ জমে তখন শ্বসনের মাধ্যমে নেয়া অক্সিজেন অক্সি হিমোগ্লোবিনে রুপান্তরে বাধা প্রাপ্ত হয়। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়া। এ সময় শ্বাস স্বাভাবিক রাখতে ভেন্টিলেটর লাগে।

ভেন্টিলেটর তৈরির সক্ষমতা আছে অনেক কোম্পানির। তবে কৌশল জানা নেই। কৌশল জানলে অনেক কোম্পানী এগিয়ে আসতে পারতো। সাধারণত কোনো কোম্পানি এর উৎপাদন কৌশল উন্মুক্ত করে না। তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান ওমর ইশরাক এগিয়ে এসেছেন তার মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি তৈরির প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে। ওমর ইশরাক চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির বিশ্বখ্যাত উৎপাদন প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিক– এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চেয়ারম্যান। মেডট্রনিকের সম্পদের পরিমান $১০০ বিলিয়নের বেশি। সারা বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ কাজ করে এই কোম্পানিতে।

ওমর ইশরাকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। শিক্ষাজীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কিং কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ারিংয়ের ওপর বিএসসি ও পিএইচপি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অতি সম্প্রতি তিনি কম্পিউটার চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইন্টেল করপোরেশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এশিয়া সোসাইটির ট্রাস্ট্রি বোর্ডেরও সদস্য। বৈশ্বিক পর্যায়ে তিনি নেতৃস্থানীয় একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।

তবে এরই মাঝে আমরা সবচেয়ে আশার খবরটি পেয়েছি প্রকৌশলী ওমর ইশরাকের কাছ থেকেই। সম্প্রতি তিনি তার এক টুইটে ভেন্টিলেটর তৈরির ডিজাইন উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছেন। টুইটে তিনি জানান, বৈশ্বিক মহামারির এ সময়ে মেডট্রনিক ভেন্টিলেটর তৈরির কলা–কৌশল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিগত সোর্স কোডও উন্মুক্ত করা হয়েছে যেন এ দুর্যোগের সময় সক্ষম যে কোন প্রতিষ্ঠান ভেন্টিলেটর উৎপাদন করতে পারে।

এতে ওমর ইশরাক এ বিষয় নিয়ে একটি ফাইল শেয়ার করেছেন। এতে লেখা আছে, ভেন্টিলটরের প্রযুক্তিগত নকশা এমনভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে যেন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, স্টার্ট আপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহজেই যন্ত্রটি উৎপাদন করতে পারে। পিবি ৫৬০ নামের ওই ভেন্টিলেটরের পেটেন্ট উন্মুক্ত করা হয়েছে। ভেন্টিলেটরটির সেবার নির্দেশিকা (ম্যানুয়াল), নকশা বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি, উৎপাদন প্রক্রিয়ার তথ্য, রূপরেখা ও স্পেসিফিকেশন Medtronic.com/openventilator ওয়েবসাইট থেকে যে কেউ নিতে পারবেন।

সুখবর হচ্ছে, এক্ষেত্রে দেশীয় ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনকে সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে Medtronic। নিজস্ব কারখানায় অক্সিজেন ভেন্টিলেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরি করতে যাচ্ছে ওয়ালটন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই তাদের উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এ প্রযুক্তিতে তৈরি ভেন্টিলেটর দিয়ে সহজেই বয়ষ্ক ও শিশুদের সহজেই অক্সিজেন দেওয়া যাবে। এটি সহজেই যেকোন পরিচর্যা কেন্দ্র বা বাসায় ব্যবহারের উপযোগী। মেডট্রনিক আশা করছে, ভেন্টিলেটরটির পেটেন্ট উন্মুক্ত করায় করোনা ভাইরাসের মহামারির এ সঙ্কটে ভেন্টিলেটর উৎপাদন বাড়বে।

পেটেন্ট উন্মুক্ত করায় বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় প্রকৌশলীদের সহায়তায় উৎপাদন করতে পারবেন। মেডট্রনিকের গবেষণা ও উন্নয়ন শাখার কর্মকর্তারা যেকোন কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছেন।

এদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এক ভিডিও কনফারেন্সে জানান, মেডট্রনিকের সহায়তায় বাংলাদেশ ভেন্টিলেটর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি), বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভেন্টিলেটর তৈরির উদ্যোগে সরকার সহযোগিতা করছে।

পলক বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় স্থানীয়ভাবে ভেন্টিলেটর (কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার যন্ত্র) উৎপাদন করবে বাংলাদেশ। পরবর্তীতে স্থানীয় উদ্ভাবক ও উৎপাদনকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।

এ প্রসঙ্গে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ বলেন, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ভেন্টিলেটর খুবই জরুরি। ওয়ালটন সব সময় দেশের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। সে জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষাকারী ভেন্টিলেটর, পিএপিআর (পাওয়ার এয়ার পিউরিফায়ার রেসপিরেটর), অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, ইউভি ডিসইনফেকট্যান্ট, সেফটি গগলস, প্রোটেকটিভ শিল্ড, রেসপিরেটরি মাস্ক ইত্যাদি চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে কাজ করছে ওয়ালটন।

বর্তমানে এসব চিকিৎসা সরঞ্জামের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং ডিজাইন নিয়ে কাজ চলছে। কারখানাসহ অফিস ছুটি থাকলেও এ কাজে নিয়োজিত আছেন ওয়ালটনের অর্ধশতাধিক প্রকৌশলী। তারা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দেশের জরুরি অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্র তৈরিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ওয়ালটনের আরেক নির্বাহী পরিচালক উদয় হাকিম বলেন, ‘দেশ-বিদেশে এখন ভেন্টিলেটরের বিশাল ক্রাইসিস। মানুষের জীবন বাঁচাতে এটি এখন জরুরি। আর তাই প্রয়োজনের তাগিদে আমরা ভেন্টিলেটর উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য। এটি উৎপাদন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা ভেন্টিলেটর উৎপাদনে যাব। অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই হয়তো শুরু করতে পারব।’ তাঁর প্রত্যাশা, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্যের মতো এ খাতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ। রয়েছে রপ্তানির বিশাল সুযোগ।

ঢা/এফএইচপি

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

***ঢাকা১৮.কম এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ( Unauthorized use of news, image, information, etc published by Dhaka18.com is punishable by copyright law. Appropriate legal steps will be taken by the management against any person or body that infringes those laws. )