ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের ইতিহাস

  •  
  •  
  •  
  •  

ইসলাম ডেস্ক: ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ একটি ঘটনার সাক্ষী ২০শে রমজান শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার অধিকারী এ ঘটনাটি হলো মক্কা বিজয়। আজ থেকে ১৪৩২ বছর আগে মহানবী (সা.) হিজরতের অষ্টম বছরে ১০ হাজার মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে মক্কা নগরী জয় করেছিলেন এদিনে। তৎকালীন আরব ভূমির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জনপদে বিজয় নিশান উড্ডীন করেছিলেন। এ ঘটনা ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের, সাফল্যের ও সন্তুষ্টির।

জন্মভূমি মক্কা হতে হিজরত করার প্রায় আট বছর পর বিজয়ীর বেশে পুনরায় মক্কায় ফিরে এলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ সন্তান বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত, নবীকুল শিরোমণি শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। বিনা যুদ্ধেই মক্কার নেতারা তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণ করলেন। বিজয়ী রাসূল (সা.) তাদের কারু প্রতি কোনরূপ প্রতিশোধ নিলেন না। সবাইকে উদারতা ও ক্ষমার চাদরে ঢেকে দিয়ে বললেন, ‘আজ তোমাদের উপরে কোনরূপ অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত’। কিন্তু কি ছিল এর কারণ? কিভাবে ঘটলো হঠাৎ করে এ ঐতিহাসিক বিজয়? আজকে আমরা এই বিষয়ে আলোচনা করব।

মক্কা অভিযানের কারণ: হুদায়বিয়া সন্ধির চার দফা চুক্তির তৃতীয় দফায় বর্ণিত ছিল যে, ‘যে সকল গোত্র মুসলমান বা কুরায়েশ যে পক্ষের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে, তারা তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে এবং তাদের কারো উপরে অত্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্ট দলের উপরে অত্যাচার বলে ধরে নেওয়া হবে’। উক্ত শর্তের আওতায় মক্কার নিকটবর্তী গোত্র বনু খোযা‘আহ (بنو خزاعة) মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর কুরায়েশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট দলের মিত্রপক্ষ হিসাবে গণ্য হয়।

কিন্তু দুই বছর শেষ না হতেই বনু বকর উক্ত চুক্তি ভঙ্গ করল এবং ৮ম হিজরীর শা‘বান মাসে রাত্রির অন্ধকারে বনু খোযা‘আহর উপরে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বহু লোককে হতাহত করল। বনু বকরের এই অন্যায় আক্রমনে কুরায়েশদের ইন্ধন ছিল। তারা অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছিল। এমনকি কুরায়েশ নেতা ইকরিমা বিন আবু জাহ্ল, ছাফওয়ান বিন উমাইয়া এবং খোদ হোদায়বিয়া সন্ধিচুক্তিতে কুরায়েশ পক্ষের আলোচক ও স্বাক্ষর দানকারী সোহায়েল বিন আমর সশরীরে উক্ত হামলায় অংশগ্রহণ করেন (তারীখে ত্বাবারী)।

বনু খোযা‘আহর অসহায় লোকেরা বনু বকরের কাছে করজোড়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেও তারা পরোয়া করেনি। এমনকি তারা পালিয়ে হারাম শরীফে আশ্রয় নিয়ে তাদেরকে إلَهَكَ إلَهَكَ ‘তোমার প্রভুর দোহাই’ ‘তোমার প্রভুর দোহাই’ বলে মিনতি করলে জবাবে তারা তাচ্ছিল্য করে لاَ إلَهَ الْيَوْمَ ‘আজ কোন প্রভু নেই’ বলে নির্দয়ভাবে তাদেরকে হত্যা করেছিল।[1]

বনু খোযা‘আহ গোত্রের এই হৃদয়বিদারক দুঃসংবাদ নিয়ে আমের ইবনু সালেম আল-খোযাঈ ৪০ জনের একটি দল সহ দ্রুত মদীনায় আসেন। রাসূল (সা.) তখন মসজিদে নববীতে ছাহাবায়ে কেরাম সহ অবস্থান করছিলেন। এমন সময় আমের ইবনু সালেম কবিতা পাঠ করতে করতে রাসূলের সামনে মর্মস্পর্শী ভাষায় তাদের নির্মম হত্যাকান্ড এবং কুরায়েশদের চুক্তি ভঙ্গের কথা বিবৃত করেন। সাড়ে আট লাইনের সেই কবিতার শেষের সাড়ে তিন লাইন ছিল নিম্নরূপ :

إنَّ قُرَيْشًا أَخْـلَفُوْكَ الْمَوْعِدَا * وَنَقَضُوْا مِيْثَـاقَكَ الْمُؤَكَّدَا
وَجَعَلُوْا لِيْ فِيْ كَدَاءٍ رُصَّدَا * وَزَعَمُوْا أَنْ لَسْتُ أَدْعُوْ أَحَدَا
وَهُـمْ أَذَلُّ وَأَقَـلُّ عَـدَدَا * هُمْ بَيَّتُـوْنَا بِالْوَتِيْـرِ هُجَّدًا
وَقَتَلُـوْنَا رُكَّـعًا وَّسُجَّدَا * فانصر هـداك الله نصرًا أَيِّدًا
نحن ولدناك فكنتَ ولدًا-

‘নিশ্চয়ই কুরায়েশগণ আপনার সাথে করেছে এবং আপনাকে দেওয়া পাক্কা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে’। ‘তারা ‘কাদা’ নামক স্থানে আমার জন্য ওঁৎ পেতে আছে। তারা ধারণা করেছে যে আমি সাহায্যের জন্য কাউকে আহবান করবো না’। ‘তারা নিকৃষ্ট ও সংখ্যায় অল্প’। ‘তারা ‘ওয়াতীর’ নামক স্থানে রাত্রি বেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের উপরে হামলা চালিয়েছে’।

‘এবং তারা রুকূ অবস্থায় ও সিজদারত অবস্থায় আমাদেরকে হত্যা করেছে’। অতএব আপনি আমাদেরকে দৃঢ়হস্তে সাহায্য করুন। ‘আল্লাহ আপনাকে হেদায়াত করুন’। ‘আমরা আপনাকে প্রসব করেছি। অতএব আপনি আমাদের সন্তান’।কবিতার শেষের চরণ দ্বারা বুঝা যায় যে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখন মুসলমান হয়েছিলেন। যদিও জীবনীকারগণ এ বিষয়ে একমত যে, ঐ সময় পর্যন্ত তারা মুসলমান হয়নি।

বনু খোযায়ার আবেদনে রাসূলের সাড়া: আমর ইবনু সালেম-এর মর্মস্পর্শী কবিতা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলে ওঠেন- نُصِرْتَ يَا عَمْرَو بْنَ سَالِمٍ ‘তুমি সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছ হে আমর ইবনু সালেম’! এমন সময় আসমানে একটি মেঘখন্ডের আবির্ভাব হয়। তা দেখে রাসূল (সা.) বলেন, إنَّ هَذِهِ السَّحَابَةَ لَتَسْتَهِلَّ بِنَصْرِ بَنِيْ كَعْبٍ ‘এই মেঘমালা বনু কা‘বের সাহায্যের শুভসংবাদে চমকাচ্ছে’।

এরপর বনু খোযা‘আহর আরেকটি প্রতিনিধিদল নিয়ে বুদাইল বিন অরক্বা আল-খোযাঈ (بديل بن ورقاء الخزاعي) আগমন করেন এবং তাদের গোত্রের কারা কারা নিহত হয়েছে ও কুরায়েশরা কিভাবে বনু বকরকে সাহায্য করেছে, তার পূর্ণ বিবরণ পেশ করেন। অতঃপর তারা মক্কায় ফিরে যান।

রাসূলের পরামর্শ বৈঠক: সন্ধিচুক্তি ভঙ্গের পর করণীয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) ছাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। এক সময় আল্লাহর রাসূল (সা.) বলে ওঠেন, كَأَنّكُمْ بِأَبِيْ سُفْيَانَ قَدْ جَاءَكُمْ لِيَشُدَّ الْعَقْدَ وَيَزِيْدَ فِي الْمُدَّةِ ‘আমি যেন তোমাদেরকে আবু সুফিয়ানের সাথে দেখছি যে, সে মদীনায় আসছে তোমাদের কাছে চুক্তি পাকাপোক্ত করার জন্য এবং মেয়াদ বাড়ানোর জন্য’।

আবু সুফিয়ানের মদীনা আগমন ও আশ্রয় প্রার্থনা: দূরদর্শী আবু সুফিয়ান বুঝেছিলেন যে, বনু খোযায়ার উপরে এই কাপুরুষোচিত আক্রমণ হোদায়বিয়াহর সন্ধিচুক্তির স্পষ্ট লংঘন এবং এর প্রতিক্রিয়া হলো মুসলমানদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ, যা ঠেকানোর ক্ষমতা এখন তাদের নেই। তাই তিনি মোটেই দেরী না করে এবং কোন প্রতিনিধি না পাঠিয়ে কোরায়েশ নেতাদের পরামর্শক্রমে সরাসরি নিজেই মদীনা গমন করলেন।

যাইহোক মদীনা পৌঁছে তিনি স্বীয় কন্যা উম্মুল মুমেনীন উম্মে হাবীবাহর সাথে সাক্ষাত করেন। এসময় তিনি খাটে বসতে উদ্যত হলে কন্যা দ্রুত বিছানা গুটিয়ে নেন ও বলেন, هَذَا فِرَاشُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنْتَ رَجُلٌ مُشْرِكٌ نَجَسٌ ‘এটি রাসূল (সা.)-এর বিছানা। এখানে আপনার বসার অধিকার নেই। কেননা আপনি অপবিত্র মুশরিক’। অতঃপর আবু সুফিয়ান বেরিয়ে জামাতা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলেন ও সব কথা বললেন। কিন্তু রাসূল (সা.) কোন কথা বললেন না।

নিরাশ হয়ে তিনি আবুবকর (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং তাকে রাসূলের নিকটে কথা বলার অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি অপারগতা প্রকাশ করলেন। অতঃপর ওমরের কাছে গিয়ে একইভাবে তোষামোদ করলেন। কিন্তু ওমর কঠোর ভাষায় জবাব দিয়ে বললেন, أَأَنَا أَشْفَعُ لَكُمْ إلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَوَاللهِ لَوْ لَمْ أَجِدْ إلاَّ الذَّرَّ لَجَاهَدْتُكُمْ بِهِ ‘আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের নিকটে সুফারিশ করব? আল্লাহর কসম! যদি আমি কিছুই না পাই ছোট নুড়ি ছাড়া, তাই দিয়ে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করব’।

আলী (রা.) পরামর্শে আবু সুফিয়ান মসজিদে নববীতে গিয়ে দাঁড়ালেন ও লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, أَيُّهَا النَّاسُ إنِّيْ قَدْ أَجَرْتُ بَيْنَ النَّاسِ ‘হে লোকসকল! আমি সকলের মাঝে আশ্রয় প্রার্থনার ঘোষণা দিচ্ছি’। অতঃপর বেরিয়ে উটে সওয়ার হয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে যান। আবু সুফিয়ান মক্কায় এসে নেতাদের নিকটে সবকথা পেশ করেন এবং তাদের ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়ার জবাবে বলেন, وَاللهِ مَا وَجَدْتُّ غَيْرَ ذَلِكَ ‘আল্লাহর কসম! এছাড়া আমি আর কোন পথ খুঁজে পাইনি’।

রাসূলের গোপন প্রস্ত্ততি: ত্বাবারাণী হাদীছ গ্রন্থের বর্ণনাসূত্রে জানা যায় যে, কুরায়েশদের চুক্তি ভঙ্গের খবর পৌঁছবার তিন দিন আগেই আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) স্ত্রী আয়েশাকে সফরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্ত্ততি গ্রহণের আদেশ দেন- যা কেউ জানত না। পিতা আবুবকর (রাঃ) কন্যা আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলেন, يَابُنَيَّةُ، مَا هَذَا الْجِهَازُ؟ ‘হে কন্যা! এসব কিসের প্রস্ত্ততি? কন্যা জবাব দিলেন وَاللهِ مَا أَدْرِيْ ‘আল্লাহর কসম! আমি জানি না’।

আবুবকর (রাঃ) বললেন, এখন তো রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় নয়। তাহলে রাসূল (সা.) কোন দিকের এরাদা করেছেন? আয়েশা (রাঃ) আবার বললেন, وَاللهِ لاَ عِلْمَ لِيْ ‘আল্লাহর কসম! এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই’। দেখা গেল যে, তৃতীয় দিন আমর ইবনু সালেম আল-খোযাঈ ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে হাযির হলেন। তখন লোকেরা চুক্তিভঙ্গের খবর জানতে পারল।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) সবাইকে মক্কা গমনের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন এবং আল্লাহর নিকটে দোয়া করলেন- اللّهُمَّ خُذِ الْعُيُوْنَ وَالْأَخْبَارَ عَنْ قُرَيْشٍ حَتَّى نَبْغَتَهَا فِيْ بِلاَدِهَا ‘হে আল্লাহ! তুমি কুরায়েশদের নিকটে গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং এই অভিযানের খবর পৌঁছানোর পথ সমূহ বন্ধ করে দাও। যাতে তাদের অজান্তেই আমরা তাদের শহরে হঠাৎ উপস্থিত হতে পারি’।অতঃপর বাহ্যিক কৌশল হিসাবে তিনি আবু ক্বাতাদাহ হারেছ বিন রিব্‘ঈ -এর নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি দলকে ১লা রমজান তারিখে ‘ইযাম’ (بطن إضم) উপত্যকার দিকে রওয়ানা করে দেন। যাতে শত্রুরা ভাবে যে, অভিযান ঐদিকেই পরিচালিত হবে। পরে তারা গিয়ে রাসূল (সা.)-এর সাথে মিলিত হন।

মক্কার পথে রওয়ানা: ৮ম হিজরীর ১০ই রামাযান মঙ্গলবার ১০,০০০ সাথী নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। এই সময় মদীনার দায়িত্বশীল নিযুক্ত করে যান আবু রুহম কুলছূম আল-গেফারী (রাঃ) (أبو رُهم كلثوم الغفاري) -কে।

আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ: রাসূল (সা.) আবু সুফিয়ানকে বললেন, وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنْ لَا إلَهَ إلاَّ اللهُ؟ ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, بِأَبِيْ أَنْتَ وَأُمّيْ مَا أَحْلَمَك وَأَكْرَمَك وَأَوْصَلَك لَقَدْ ظَنَنْتُ أَنْ لَوْ كَانَ مَعَ اللهِ إلَهٌ غَيْرُهُ لَقَدْ أَغْنَى شَيْئًا بَعْدُ ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গীত হউন। আপনি কতইনা সহনশীল, কতই না সম্মানিত ও কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী! আমি বুঝতে পেরেছি যে, যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য থাকত, তাহ’লে এতদিন তা আমার কাজে আসত’।

তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنّيْ رَسُوْلُ اللهِ؟ ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আমি যে আল্লাহর রাসূল একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, আপনার জন্য আমার পিতামাতা উৎসর্গীত হৌন! আপনি কতই না সহনশীল, কতই না সম্মানিত এবং কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী, أَمَّا هَذِهِ فَإِنَّ فِي النَّفْسِ حَتَّى الْآنَ مِنْهَا شَيْئًا- ‘কেবল এই ব্যাপারটিতে মনের মধ্যে এখনো কিছু সংশয় রয়েছে’।

সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে আববাস (রাঃ) তাকে বলে উঠলেন, وَيْحَكَ أَسْلِمْ وَاشْهَدْ أَنْ لآ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ قَبْلَ أَنْ تُضْرَبَ عُنُقُكَ- ‘তোমার ধ্বংস হৌক! গর্দান যাওয়ার পূর্বে ইসলাম কবুল কর এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’। সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করলেন ও কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন।

অতঃপর হযরত আববাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! إنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ يُحِبُّ الْفَخْرَ فَاجْعَلْ لَهُ شَيْئًا ‘আবু সুফিয়ান গৌরব প্রিয় ব্যক্তি। অতএব এ ব্যাপারে তাকে কিছু প্রদান করুন’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, نَعَم مَنْ دَخَلَ دَارَ أَبِيْ سُفْيَانَ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ أَغْلَقَ عَلَيْهِ بَابَهُ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ أَلْقَى السَّلاَحَ فَهُوَ آمِنٌ وَمَنْ دَخَلَ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ فَهُوَ آمِنٌ ‘হ্যাঁ যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে আশ্রয় নিবে সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি অস্ত্র ফেলে দেবে, সে নিরাপদ থাকবে এবং যে ব্যক্তি মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে’।

বিজয়ীর বেশে রাসূলের মক্কায় প্রবেশ: আনছার ও মুহাজির পরিবেষ্টিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন ও হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন। অতঃপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন। এই সময় কা‘বা গৃহের ভিতরে ও বাইরে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) হাতের ধনুক দ্বারা এগুলি ভাঙতে শুরু করেন এবং কুরআনের এ আয়াত পড়তে থাকেন- وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا ‘তুমি বল, হক এসে গিয়েছে, বাতিল অপসৃত হয়েছে’। নিশ্চয়ই বাতিল অপসৃত হয়েই থাকে’ (বনু ইসরাঈল ১৭/৮১)। তিনি আরও পড়েন, قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ ‘তুমি বল হক এসে গেছে এবং বাতিল না শুরু হবে, না আর ফিরে আসবে’ (সাবা ৩৪/৪৯)। অর্থাৎ সত্যের মুকাবিলায় মিথ্যা এমনভাবে পর্যুদস্ত হয় যে, তা কোন বিষয়ের সূচনা বা পুনরাবৃত্তির যোগ্য থাকে না।

অতঃপর ওছমান বিন ত্বালহাকে ডেকে তার কাছ থেকে কা‘বা ঘরের চাবি নিয়ে দরজা খুলে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ভিতরে প্রবেশ করেন। তিনি সেখানে বহু মূর্তি ও ছবি দেখতে পান। যার মধ্যে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর দু’টি ছবি বা প্রতিকৃতি ছিল- যাদের হাতে ভাগ্য নির্ধারণী তীর ছিল (يستقسمان بالأزلام)। এ দৃশ্য দেখে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলে ওঠেন, قَاتَلَهُمُ اللهُ لَقَدْ عَلِمُوا مَا اسْتَقْسَمَا بِهَا قَطُّ ‘মুশরিকদের আল্লাহ ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! তারা জানে যে, তাঁরা কখনোই এ ধরনের তীর ব্যবহার করেননি’। তিনি সেখানে একটা কাঠের তৈরী কবুতরী দেখেন। যেটাকে নিজ হাতে ভেঙ্গে ফেলেন। অতঃপর তিনি সমস্ত ছবি-মূর্তি নিশ্চিহ্ন করে ফেলার নির্দেশ দেন এবং সাথে সাথে তা পালিত হয়।

অতঃপর তিনি কা‘বা গৃহের দরজা বন্ধ করে দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে কেবল উসামা ও বেলাল ছিলেন। এরপর তিনি দরজা বরাবর সম্মুখ দেওয়ালের তিন হাত পিছনে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করেন।তঃপর তিনি ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখেন ও সর্বত্র আল্লাহু আকবর ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়তে থাকেন। অতঃপর তিনি দরজা খুলে দেন। এ সময় হাযার হাযার লোক কা‘বা গৃহের সম্মুখে দন্ডায়মান ছিল।

ঢা/ইআ

(Visited 12 times, 1 visits today)