এক অপূর্ব সুন্দর বাংলাদেশ!

আজাদুল হক: কুয়াশা ঢাকা ভোর। সূর্য উঠছে। ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর” – আজানের ধ্বনি। জেগে উঠছে ঢাকা শহর। কা কা করে কাক উড়ে যায়। দোকানী দোকানের শাটার খোলে।

এক বান্ডিল নিউজপেপার ছুঁড়ে মারে নিউজ স্ট্যান্ডের বারান্দায় পিকআপ থেকে এক লোক।

মুখে পানির ঝাপ্টা মারে তিথি। অফিসের জন্য তৈরি হয় তাড়াতাড়ি। আজ কিছুতেই দেরি করা যাবে না। গত দুদিন দেরি হয়েছে বাসের জন্য। আজ দেরি হলে চাকরিটাই না আবার চলে যায়!

মাহিনও তৈরি হচ্ছে অফিসের জন্য। টাইয়ের নটটা বাঁধে। মাহিনের স্ত্রী রীপা ঠিক করে দেয় টাইটা।

ড্রাইভার এসে মাহিনের ব্রিফকেসটা নেয়। মাহিন রীপাকে বাই বলে, ছোট্ট মেয়ে নীপাকে গাল টিপে আদর করে।

মাহিন তার সিডানে করে অফিস রওয়ানা হয়। একটা নিউজপেপার ওর পাশে। মাহিন আইফোনে মেসেজ পড়তে থাকে।

তিথি তাড়াতাড়ি হাঁটে। এসে বাসের জন্য দাঁড়ায় বাস স্ট্যান্ডে। তিথির সামনে ততক্ষণে আরও তিন চার জন দাঁড়িয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর আরও বেশ ক’জন এসে দাঁড়ায়। তিথি বারবার ঘড়ি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে।

মাহিনের গাড়ি ট্রাফিকের কারণে বাস স্ট্যান্ড থেকে বেশ খানিকটা দূরে এসে আটকে আছে। মাহিন। অন্যমনস্ক হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে পড়ে বেশ কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। মাহিন দেখেও দেখে না। ধীরে ধীরে মাহিনের গাড়িটা তিথিদের সামনে এসে থেমে যায় ট্রাফিকের জন্য। মাহিন দেখে অনেক মানুষ বাসের অপেক্ষায়। মাহিন চলে যায় অফিসে।

তিথি পরিশেষে ওঠে দেরিতে আসা বাসে। অফিসে গিয়ে মুখ নিচু করে বসের কাছে তিরস্কার শোনে। তিথি মনে মনে ভাবে আর একদিন যদি দেরি হয় তাহলে আর রক্ষা নেই।

অফিসে মাহিন কাজ করতে করতে হঠাৎ থেমে যায়। চিন্তা করে কিছুক্ষণ। তারপর মুচকি হেসে কিবোর্ডে কিছু একটা টাইপ করে, একটা প্রিন্ট আউট নেয়, সেটা ব্রিফকেসে ভরে।

পরদিন। আজ তিথি আগেই চলে আসে বাস স্ট্যান্ডে যাতে বাস ধরতে দেরি না হয়। কিন্তু কপাল মন্দ, আজও বাস দেরি করে আসতে।

আবারো মাহিনের গাড়ি এসে থামে বাস স্ট্যান্ডের সামনে। কিন্তু এবার মাহিন ড্রাইভারে কাঁধে টোকা দেয় থামতে। সে গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে একটা কাগজ তুলে ধরে তিথিদের সামনে।

তিথি অবাক হয়ে তাকায় এদিক ওদিক। মিষ্টি করে হাসে মাহিন। তিথির পেছনের বৃদ্ধ হাত দেখিয়ে দেয় মাহিনের দিকে। মাথা নেড়ে সায় দেয়।

ইতস্তত করতে করতে তিথি আর তার পেছনের দুজন মানুষ মাহিনের গাড়িতে ওঠে। মাহিনের কোলে দেখা যায় কাগজটার মধ্যে লেখা,

“মতিঝিল- লাইনের প্রথম তিনজন”

তিথি অফিসের লাঞ্চের সময় ওর ফেসবুকে একটা পোস্ট করে আজকের ঘটনা নিয়ে। ধন্যবাদ জানায় নতুন জানা, নতুন চেনা মাহিনকে।

তিথি লেখে, ‘ইস যদি দেশে থাকত এমন অনেক মাহিন ভাইয়া, কি অপূর্ব সুন্দর হতো আমার এই দেশটা তাই না?”

মাহিন আর তিথি  জানে না যে এই পোস্টটা সারাদিন ধরে কয়েক হাজার লাইক পেয়ে গেছে।  কমেন্ট করেছে শত শত মানুষ।

পরদিন সকাল। মাহিন আজও ঠিক করেছে যে সে তিনজন মানুষকে রাইড দেবে ওর গাড়িতে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখে যে ওর সামনে আরও তিনটি গাড়ি ৯ জনকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। আর বাস স্ট্যান্ড খালি!

হো হো করে হেসে ওঠে মাহিন। জানালা দিয়ে দেখে, “এক অপূর্ব সুন্দর বাংলাদেশ”।

এদেশটা আমাদের সবার। আসুন না সবাই মিলে গড়ে তুলি এক অপূর্ব সুন্দর বাংলাদেশ

(Visited 1 times, 1 visits today)