ইসলামে অসুস্থ মানুষের সেবা ও দেখা করার গুরুত্ব

  •  
  •  
  •  
  •  

ইসলাম ডেস্ক: শারীরিক সুস্থতা মহান আল্লাহ তায়ালার বিরাট নিয়ামত। সবাই চান সুস্থ থাকতে। এরপরও আমরা অসুস্থ হই। বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হই।অসুস্থ ব্যক্তির সেবা-যত্ন করা, তার খোঁজ-খবর নেওয়া ও সান্তনার বাণী শোনানো মহানবী (সা.)-এর সুন্নত। ইসলাম সুস্থ ব্যক্তির কল্যাণ কামনার পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের প্রতিও দয়াশীল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখনই কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন তখন তিনি তার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করতেন এবং তাকে সুসংবাদ দিতেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) রোগীর সেবাযত্ন করাকে সর্বোৎকৃষ্ঠ নেক আমল ও ইবাদত ঘোষণা করেছেন। সাহাবি হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা রোগী দেখতে যাও এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করো, কেননা তা তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’ -মুসনাদে আহমদ: ৩/৪৮

প্রিয় রাসুল (সা.) বলেন, ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা কর এবং বন্দি মানুষকে মুক্ত কর।কোনো অমুসলিমও দুঃখ-কষ্টে থাকলে তার প্রতিও সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। রাসুল (সা.) মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিমেরও সেবা করেছেন।

বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ আবু দাউদ শরীফে আছে, রাসুল (সা.) এক ইহুদি অসুস্থ যুবককে দেখতে গিয়েছিলেন।

আর রাসুল (সা.) এর চলার পথে কাঁটা বিছানো বুড়িকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাওয়ার ঘটনা তো ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়েই আছে।

একজন মহিলা সাহাবী (রা.) বলছেন, একদা আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার সেবা শুশ্রূষা করতে এসে বলেন, হে উম্মু আলা, তুমি সুসংবাদ গ্রহন করো। কেননা, মুসলমানদের অসুখের কারণে আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের গুনাহ্‌ সমূহ এমন ভাবে দূর করে দেন যেমন ভাবে আগুন সোনা-রূপার মধ্যেকার ভেজাল দূর করে দেয়। [আবূ দাউদ, ৩০৭৯]

একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্তনার বাণী শোনালে, খোঁজ-খবর নিলে, একটু সেবাযত্ন করলে তার দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। সে অন্তরে অনুভব করবে প্রশান্তি। তাই মানবিক বিচারে রোগীর খোঁজ-খবর নেওয়া, সেবাযত্ন করা উচিত।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের ৫টি হক রয়েছে। তা হলো- ১. সালামের জবাব দেওয়া, ২. হাঁচির উত্তর দেওয়া, ৩. দাওয়াত কবুল করা, ৪. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া ও ৫. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। -সহিহ বোখারি: ১২৪০

হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে যাওনি। বান্দা বলবে, আপনি তো বিশ্বজাহানের প্রতিপালক- আমি আপনাকে কিভাবে দেখতে যেতে পারি? আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তাকে দেখতে গেলে সেখানে আমাকে পেতে…। -সহিহ মুসলিম: ২১৬২

রোগীকে দেখার ফজিলত
রোগী দেখার অসংখ্য ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শোনেছি, যে ব্যক্তি সকালবেলা কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায়, সত্তর হাজার ফেরেশতা বিকাল পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর বিকেলে রোগী দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা দোয়া করে… । -সুনানে তিরমিজি: ৯৬৭

রোগী দেখার নিয়ম ও আদব
১. অজুসহকারে রোগী দেখতে যাওয়া। এ মর্মে হজরত আনাস (রা.) রেওয়ায়েত করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে যায়- তাকে জাহান্নাম থেকে ৬০ বছরের পথ দূরে রাখা হবে। -আবু দাউদ: ৩০৯৭

২. রোগীর অবস্থা বুঝে শরীরে হাত রেখে রোগের কথা জিজ্ঞাসা করা। রাসূল (সা.) বলেছেন, শুশ্রুষার পূর্ণতা হলো- রোগীর কপালে বা শরীরে হাত রেখে জিজ্ঞেস করা, কেমন আছেন? তিরমিজি

৩. রোগীর সামনে এমন কথা বলা যাতে সে সান্তনা লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো রোগীকে দেখতে গেলে বলতেন, এমন সান্তনা মূলক কথা বলতেন বলে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে।

৪. রোগীর কাছে বেশি সময় ক্ষেপন না করা। রাসূল (সা.) বলেন, রোগী দেখার সময় হলো- উটের দুধ দোহন পরিমাণ। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রোগী দেখার উত্তম পন্থা হলো- তাড়াতাড়ি ফিরে আসা।

৫. রোগী কিছু খেতে চাইলে এবং তা তার জন্য ক্ষতিকর না হলে খেতে দেওয়া। রাসূল (সা.) বলেছেন, রোগী যদি কিছু খেতে চায়- তবে তাকে খেতে দেওয়া উচিত। -ইবনে মাজাহ

৬. রোগীর সামনে উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সুন্নত হলো- রোগীর পাশে কম সময় বসা এবং উঁচু আওয়াজে কথা না বলা।

৭. রোগীর জন্য দোয়া করা। বিভিন্ন দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, কোনো রোগীর কাছে গিয়ে নিম্নের দোয়াটি সাতবার পাঠ করলে মৃত্যুরোগ ছাড়া সব রোগ থেকে সে সুস্থ হয়ে ওঠবে- ইনশাআল্লাহ।

দোয়াটি হলো- আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আই ইয়াশফিয়াকা। -আবু দাউদ: ৩১০৬

৮. রোগীর কাছে নিজের জন্য দোয়া চাওয়া। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা রোগী দেখতে গেলে তার কাছে নিজের জন্য দোয়া চাও। কেননা তার দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার সমতুল্য।’ -ইবনে মাজাহ

শিক্ষনীয়

পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ-খবর নেওয়ার ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। রাসূল (সা.) বলেন, কোনো মুসলমান অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে গেলে সে বেহেশতের ফল আহরণ করতে থাকে। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখাশোনা করলে সওয়াবের নিশ্চয়তা দিয়েছেন রাসুলে (সা.)। মুসলমান হয়ে আমরা অনেকে মুসলমান রোগীদেরও সেবা করতে আগ্রহী হই না। কোনো কোনো চিকিৎসকও রোগীর প্রতি অবহেলা করেন। প্রতিবেশী বা সমাজের কেউ অসুস্থ হলে আমরা তাদের খোঁজখবর রাখি না। চিকিৎসার যথাযথ পদক্ষেপ নেই না। এসবই ইসলামের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। মহান আল্লাহ আমাদের ভালোবেসে সৃষ্টি করেছেন। অসুস্থ মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়ালে সাহায্যকারীর প্রতি আল্লাহ অনেক খুশি হন। তাকে আরো কাছে টেনে নেন। আসুন, আমরা অসুস্থ মানুষের সেবা করি। অসহায়দের চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে অসুস্থ মানুষের সেবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন

ঢা/আইএইচই

জানুয়ারি ২১, ২০২১ ১:২০

(Visited 20 times, 1 visits today)