ইভটিজিং কমলেও বাড়ছে আত্মহত্যা প্রবণতা

ইভটিজিং কমলেও বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা
  •  
  •  
  •  
  •  

নুরুল আমিন হাসান : বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জরিপ বলছে, ‘বাংলাদেশে মেয়েদের ইভটিজিংয়ের হার কমলেও বাড়ছে এর ভয়াবহতা। ইভটিজিং  বা শ্লীলতাহানির ফলে অনেকেই ঝুকে যাচ্ছেন আত্মহত্যার দিকে। আবার প্রতিবাদ করতে গিয়েও জীবন্ত লাশ হচ্ছেন অনেকেই।’

জরিপ অনুযায়ী, ‘গত সাত বছরে উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশী। অপরদিকে উত্তক্ত্যের কারণে আত্মহত্যা করেছেন দেড় হাজারেরও বেশী কন্যা শিশু। আবার নারী উত্ত্যক্তে বাধা দিতে গিয়েও খুন হয়েছেন অনেকেই। ‘

ফলে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে কিশোরী থেকে নারীদের ইভটিজিংয়ের ঘটনা কমলেও এর ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে বলেও জানিয়েছে মহিলা পরিষদ।

সূত্রটি বলছে, গত ২০১৮ সালের ১২ মে খুনের শিকার হয়েছেন ময়মনসিংয়ের প্রতিবাদী জুলহাস, ২১ আগষ্ঠ সাভারের কলেজ ছাত্র মারুফ খান, ২ নভেম্বর রাজধানীর শ্যামপুরে ছুরিকাঘাতে খুন হন শেখ পাভেল ইসলাম।

এছাড়াও উত্ত্যক্তের পৃথক দুটি ঘটনায় ঈশ্বরদি এবং খুলনায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন ১৪ পুলিশ সদস্য। নারী উত্ত্যক্তসহ হত্যার হুমকির অভিযোগ রয়েছে স্বয়ং পুলিশের সাবেক এক ডিআইজির বিরুদ্ধে। উত্ত্যক্ত ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে শিক্ষকদের ব্যপারে।
এদিকে ইভটিজিং ও ধর্ষণের স্বীকার হওয়া ভুক্তভোগী নারী ও কিশোরীরা বলছেন, ‘ধর্ষণ ও ইভটিজিংয়ের স্বীকার হওয়ার পর অনেকেই মান সম্মানের ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হন না। আবার তাদের কেউ কেউ বলেছেন, এমন ঘটনার পর মামলা বা অভিযোগ করতে গিয়ে থানায় ও শারীরিক পরিক্ষা করতে গিয়ে হাসপাতালে পুনরায় আত্মসম্মানের অনেক হানী হয়।’

ভুক্তভোগী কোন কোন কিশোরী বলছেন, ‘এমন ঘটনার শিকার হওয়ার পর মামলা করলেও আইনী জটিলতার কারণে তারা কিছু দিন পর জামিনে বের হয়ে আবার উত্ত্যক্ত করা শুরু করে। আর তার অবস্থা আগের থেকেও বেশী খারাপ আকার ধারণ করে। সেই সাথে হুমকি ধমকির পরিমাণও বেড়ে যায় অনেক। তখন আরো কোন কুল কিনারাই পায় যায় না।’

ইভটিজিং বা উত্ত্যক্ত করার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে সরকারী তিতুমীর কলেজের ফারজানা কলি নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কোন ইভটিজার প্রভাবশালী হলে তার বিরুদ্ধে সাধারণত আইনগত ব্যবস্থা নিয়েও কোন সু-ফল পাওয়া যায় না। কারণ টাকা কিংবা আধিপত্যের কারণে সে থানা – আদালত সব জায়গা থেকেই পার পেয়ে যায়। এছাড়াও পরিবার ও সমাজ সামান্য বিষয়টিকে খারাপভাবে নেয়। ফলে নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থাও অনেকটাই খারাপ হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করার জন্য মামলা করলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ইভটিজাররা বাবা-মা, ভাই –বোনস এমনকি আত্মীয় স্বজনদের অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলে। কিন্তু তার বিচার তুলনামূলক কিছুই হয় না।’

অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মার্জিয়া মিলি বলেন, ‘একটি ইভটিজিংয়ের ঘটনার পর আইনগত ব্যবস্থা নিলে বা মামলা দায়ের করা হলে তদন্ত করতে বাসায় পুলিশ আসবে।  পরবর্তীতে এলাকাবাসীও বিষয়টি জানবে এবং বিরূপভাবে নিবে। এছাড়াও শুধু মামলা করব বললেই হয় না। মামলা করতে, মামলা চালাতে প্রয়োজন টাকার। এ সব বিষয় চিন্তা ভাবনা করেই অনেই মামলা করেন না।’

নারী বা মেয়েদের ইভটিজিং কিংবা উত্ত্যক্ত করার কারণ প্রসঙ্গে এই দুই জন ছাত্রী বলেন, ‘ইভটিজিংয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে মেয়েদের পোশাষ পরিচ্ছেদ ও বেশ ভূষা।  অনেক মেয়েদের ইনফ্লুয়েন্সর কারণেও উত্ত্যক্তের মত পরিস্থিরি শিকার হন। কিছু কিছু নারীর উগ্রবাদী স্বভাব কিংবা চলাফেরাও এর জন্য দায়ী। এছাড়াও নারীদের বিকৃত মন মানসিকতার কারণেও তারা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।’

নারীদের শালিন পোশাকাই অনেকাংশে শ্লীলতাহানী রোধ করতে পারে বলে মন্তব্য করে তারা বলেন, ‘কোন নারী বা কিশোরী যদি ভালো পোষাক পরিচ্ছেদ পরে রাস্তায়  বের হন। আর কোন ছেলের উত্ত্যক্ত করার মন মানসিকতা থাকলেও সে উত্ত্যক্ত করতে পারবে না। কারণ, ওই ছেলের বিবেকই তাকে বাধা দিবে। আবার যদি ওই নারী চিৎকার করে তাহলে তো আশে পাশের মানুষ তার অবস্থা খারাপ করে ফেলবে। আবার বেশভূষা খারাপ হলে, উত্ত্যক্ত করার পরও বেশভূষার কারণে সহজে কেউ কোন সহযোগীতা করবে না।’
এ সব বিষয়ে মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি ডা. ফৌজিয়া মোসলেম বলেন, বিচারহীনতার কারণে বাড়ছে এমন ঘটনা। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা।

তিনি বলেন, এসব কারণে উত্ত্যক্তকারীরা আরো উৎসাহিত হচ্ছে।

অপরদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দ্বিতীয় সারির ইস্যু হিসেবে দেখার মানুষিকতার কারণে ইভটিজিং বাড়ছে। সরকার কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার প্রয়োজন। এছাড়াও সমাজে আরো সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা ও সমাজের মানুষের সচেতনাতাই পারে ইভটিজিং ও ধর্ষণের ঘটনা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে।

 

মার্চ ২২, ২০১৯ ৯:৫০

(Visited 73 times, 3 visits today)