আমাকে নিয়মের যাতাকলে বেঁধে রেখো না

কবিতা
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাকে নিয়মের যাতাকলে বেঁধে রেখো না

জানি সব মানুষই কালের পুতুল হয়ে আসে
আর সূর্যের আলোকরশ্মিতে জেগে থাকে
নীল সমুদ্রের জোয়ারের তালে ভাসতে থাকে।
নতুন পাতার ভাঁজে ভাঁজে জেগে থাকে জীবন
আবার জীবন নিভে যায় ঝরে পড়া পাতার সাথে।

এক জীবনের কতো সাধ বয়ে বেড়াই আমি
আকাশের সব নীল সাদা কালো মেঘ ছুঁতে চাই,
সাগরের নীলে আর নোনা জলের তলে ডুবে যেতে চাই,
বুনোহাঁসের মতো উড়ে উড়ে যেতে চাই এই পৃথিবীর সব পদ্ম বিলে।

আমার আর সাদাবকের মতো উড়া হলো না।
খাঁচায় বন্দী আমার জীবন; প্রতি সকালেই
খসে খসে পড়ে আমার আদরের সব পালকগুলো।
সকালের রোদ ছড়িয়ে পড়ার আগেই
সেই পালকের তুলতুলে নরমে ঝাড়ুর শলা বিঁধে।
দূর মুল্লুকের ডাস্টবিনে হাজারো ময়লার ভিড়ে
তা আটকে পড়ে গুঙড়িয়ে গুঙড়িয়ে কেঁদে মরে।
আমার আর শরৎ দুপুরের সাদা মেঘ হওয়া হলো না।
এখন আর তোমার নীল শাড়ীর আচলখানা
আমাকে আর টানে না খুব বেশি, আমাকে টানে না
আর কাশবনের ধবধবে সাদা সুন্দরেরা।
অথচ আমার শরীরের রক্ত উপশিরা গলার আগে
তোমার প্রতি আমার মন গলেছিলো।
এখন আর মন গলে পড়ার তোয়াক্কা নেই;
নিয়মের বারণেরা আমার উপরে চেপে চেপে বসে।
আমি বাধ্য হয়ে যাই মনের আগে, শরীরের টানে।

বন্ধনে জড়িয়ে একসাথে মরলাম দু’জনে।
এমন মরণে মরলাম যেখানে ইচ্ছের দাম নেই,
স্বপ্নের মূল্য নেই, ভালো লাগা থাকতে নেই,
নেই ভালোবাসার ছিটেফোঁটা।
আদরের নামগুলো এখন আর নেই, আছে শুধু কিছুই নিয়ম
পালনের অদ্ভূত আচার, আর সে আচার পালনের অমানুষিক চাপ।
তাই তোমার নীল শাড়ীতে আমি আর পাগল হইনে এখন।
তোমাকে দেখলেই মনে হয় তুমি জেলার হয়ে আমাকে পাহারা দাও।
ইশারা আর ইঙ্গিতে ডেকে আমাকে হাজতবাসী করতে চাও।

রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে যারা
ধুয়াকুন্ডলীর গরমে ঠোঁট পোড়ায়,
চায়ের চুমুকে যারা মিথ্যে তৃপ্ত অভিনয়ের
ভাণ করে; তাদের দেখে আমার মায়া লাগে।
মনে হয় ওরাও আমার মতো; ক’য়েক ঘণ্টার
জন্যে ছাড়া পেয়েছে নিয়মের জেল থেকে।
আমিও তাদের মতো কিছুক্ষণের জন্যে
নিজেকে মুক্ত ভাবতে থাকি, উন্মাদনার মিছে সুখ কুড়িয়ে মরি।

অথচ কথা ছিলো কতো মুক্ত হবো দু’জনে; ভাষা,
চিন্তা আর জীবনের বাঁকে বাঁকে।
কথা টিকে থাকে নি, কথা টিকিয়ে রাখতে পারি নি কেউ।

আর তোমাকে দোষেই বা কি লাভ আমার!
এই পৃথিবীর সবকিছুতেই আমি জেলখানা দেখি;
ঐ কলমে, বইয়ের পাতার ভাঁজে ভাঁজে,
মহাশয়দের নীতিতে আর চলনে-বলনে,
হাজার বছরের প্রথাতে, পুরাণের বয়ানে – সবখানে।
শুধু আকাশের দিকে তাকালে
ঐ নীল চাদরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন পাই,
ঘাসফুলের ডগাতে মায়া খুঁজে পাই,
লালপদ্মের ভাঁজে আদর খুঁজে পাই,
দূর আকাশের নক্ষত্রে ভবিষৎ দেখতে পাই,
নীল সমদ্রের তলে আমার অমর নিদ্রা দেখতে পাই।
আমি আমার আনন্দ খুঁজে পাই চৈত্রের কোকিলের গানে,
মাঘের প্যাঁচার ডেকে যাওয়া মায়াতে, শ্রাবণের বৃষ্টির ঝনঝনানিতে,
পৌষ সকালের পড়ে থাকা শিউলিতে, কার্তিকের কাঁচাধানে,
আর অগ্রহায়ণের পাঁকাধানে মাঠ জুড়ে থাকা সোনালীতে।

এই পৃথিবীর সব পানকৌড়ি হয়ে উড়তে চাই শাপলার ঝিলে,
মাছরাঙা হয়ে ডুব দিতে চাই সব নদী আর বিলের তলে।
আমি বনের ঘুঘুর মতো গান গেয়ে উড়তে চাই সবুঝ মাঠে,
আমি বুনো পায়রার মতো বাসা বাঁধতে চাই দূর অজানা বনে।
আমাকে খাঁচায় বন্দী করে রেখো না, তা তুমি পারবে না।
এই পৃথিবীর সব খাঁচা ভেঙেচুরে আমি পাখিদের সাথে মিশে যাবো,
মিশে যাবো নদীর স্রোতে, ফুলের ভাঁজে, সবুজের বুনো তালে।
ধুলো কাদামাখা মাটির সাথে, পাহাড়ের চূড়াতে, অরণ্যের গহীনে।
আমি কালের পুতুল, আমাকে নিয়মের যাতাকলে বন্দী করো না।
না। না। আমাকে নিয়মের কলে বেঁধে রেখো না।

লেখক:
আসিফ ইকবাল আরিফ

অক্টোবর ২৬, ২০২০ ৬:২০

(Visited 32 times, 1 visits today)