আফগান তালেবান সরকারের শীর্ষস্থানে কারা রয়েছেন? আমরা তাদের সম্পর্কে কতটুকুন অবগত?

মোঃ শফিকুল আলম: আফগান তালেবান সরকারের শীর্ষস্থানে কারা রয়েছেন? আমরা তাদের সম্পর্কে কতটুকুন অবগত? সাত সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ২০২১ আফগানিস্তানে নতুন কেয়ারটেকার সরকারের সদস্যদের নাম ঘোষিত হয়েছে।

কোনো মহিলা নতুন কেবিনেটে নেই। তাদের সুপ্রিম লীডার বা ইরান স্টাইলে ধর্মীয় নেতার নাম আগেই ঘোষিত হয়েছে।
সুপ্রিম লীডার হলেন হাইবাতুল্লাহ আখুনদাজা।

অন্তর্বর্তীকালীন কেবিনেটের অধিকাংশ সদস্য হার্ডলাইনার তালেবান এবং তাদের প্রতিষ্ঠাতা একচোখ বিশিষ্ট প্রয়াত ক্লারিক মোল্লা ওমরের সমর্থক বা ঘনিষ্টজন।

ঘোষিত কেবিনেটে যাদের নাম রয়েছে তাদের কারনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরুতে বিলম্ব ঘটবে এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিটি বিশেষ করে যাদের অর্থ সাহায্যে সরকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করতে পারেন তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরীতে বিলম্ব ঘটবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দের থেকে ইন্টেরিয়র মিনিস্টার সিরাজ উদ্দিন হাক্কানির নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
কারন, সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এফবিআই’র মোস্ট-ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন।

এফবিআই তার মাথার দাম ধার্য করেছে পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিরাজউদ্দিন হাক্কানি এখনও অন্তত একজন মার্কিন নাগরিক জিম্মি করে রেখেছেন বলে মার্কিন প্রশাসন বিশ্বাস করে।

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি পাকিস্তান ভিত্তিক হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রধান। যিনি বহু নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছেন এবং বহুজনকে গুমের সাথে জড়িত।
কেবিনেটে কয়েকজন সিনিয়র সদস্য রয়েছেন যারা গুয়ান্তমো বে’র কারাগারে বন্দী ছিলেন।

তারা ২০১৪ সালে বন্দী বিনিময়ের অধীনে মার্কিন সৈন্য Bowe Bergdahi’র (২০০৯ থেকে ২০১৪ হাক্কানি নেটওয়ার্কের কাছে বন্দী ছিলেন) বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছিলেন।
বিগত সরকারগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট কাউকে কেবিনেটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।

অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি হামিদ কারজাই বা সাবেক ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন লীডার আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহকে।
আমেরিকা সব পক্ষের অন্তর্ভূক্তিতে একটি সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন।

অন্যথায়, আমেরিকা যে আফগানিস্তানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ন্ত্রন করে তা’ ফ্রজেন রাখবে।
এবারে তালেবান সরকারের কিছু সদস্য সম্পর্কে জানা যাক।

হাইবাতুল্লাহ আখুন্দাজা হবেন চুড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহনকারী ব্যক্তি। সে হতে পারে ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিম্বা সামরিক বিষয়ক সিদ্ধান্ত।
জনাব হাইবাতুল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৬ থেকে তালেবানদের এই ইসলামিস্ট গ্রুপকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন;

কিন্তু, প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।অতি রক্ষণশীল ৬০ বছর বয়স্ক এই ধর্মীয় নেতা ক্রমান্বয়ে তালেবানদের কাছে নেতা থেকে বিচারকের আসনে সমাদৃত হোন।

নিয়মিত সরকারের প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ হাসান আখুন্দ মোল্লা ওমরের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন হিসেবে সর্বজন বিদিত।
তালেবান সরকারে ১৯৯৬-২০০১ প্রথমে বিদেশ মন্ত্রী এবং পরে ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

তালেবানদের শক্তিশালী অরগ্যান লীডারশিপ কাউন্সিলেরও তিনি দীর্ঘদিন প্রধানের ভূমিকায় ছিলেন।
উপ প্রধানমন্ত্রী আব্দুল গানি বারাদার তালেবানদের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মোল্লা ওমরের বিশ্বস্তজন ছিলেন।

তিনি মৃদুভাষি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের আলোচনা শুরু করতে সহায়ক ভূমিকায় ছিলেন এবং আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের দোহাচুক্তি চুরান্ত করেছিলেন। তিনি তালেবানদের পক্ষে বিশ্বব্যাপী গ্রহনযোগ্য নেতা।

বারাদার প্রধানমন্ত্রী হবেন বিশ্বব্যাপী সকলের প্রত্যাশা ছিলো। হাক্কানি নেটওয়ার্ক এবং তার প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানির গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেরিয়র মিনিষ্টার হওয়ার ব্যাপারটি পশ্চিমের অনেক দেশকে হতচকিত করেছে।

সিরাজুদ্দিন হাক্কানি একজন নৃশংস হত্যাকারী হিসেবে পরিচিত এবং তার আইসিস এর সাথে সংযোগ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
হাক্কানি গ্রুপ তার নেতৃত্বে গত দু’দশকে অসংখ্য নৃশংস আক্রমন রচনা করে সাধারন মানুষ হত্যা করেছে।

তার নেতৃত্বে কাবুলে ২০১৭ সালে ট্রাকবোম্ব এ্যাটাকে ১৫০ জন মৃত্যুবরন করেছিলো।
প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্টেরিয়র মিনিষ্টার যথাক্রমে মোহাম্মাদ হাসান আখুন্দ এবং সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এফবিআই’র স্যাংশন তালিকায় রয়েছেন।

২০০৮ সালে কাবুলের একটি হোটেলে আক্রমনে ৬ জনের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন।
তখনই সিরাজুদ্দিন হাক্কানিকে এ্যারেস্ট করার ব্যাপারে শুধু তথ্যদাতাকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের ঘোষনা ছিলো।

নতুন বিদেশ মন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি একজন সাবেক তালেবান ফিগার যার এই বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
তাকে অনেকেই এই কাজের জন্য যোগ্য মনে করেননা। বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য যে নতুন কেবিনেটে কোনো মহিলা সদস্য নেই।

এথেকে মহিলাদের প্রতি তালেবানদের রুলস কি হবে তা’ সহজেই অনুমেয়। অলরেডি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জেন্ডার সেগ্রিগেশন শুরু হয়েছে।

মহিলা ছাত্রীদেরকে কার্টেইন দিয়ে আলাদা করা হচ্ছে। তালেবানরা ৯০ দশকে যেভাবে অধর্মের বিপরীতে ধর্মের সজ্ঞা দিয়েছেন সেই সজ্ঞার বাইরে যাবেননা।

একজন সিনিয়র তালেবান অফিসিয়াল (তালেবান কালচারাল কমিশনের উপপ্রধান) আহমাদুল্লাহ ওয়াসিক অস্ট্রেলিয়ার এসবিএস নিউজ এর সাথে বলেন মহিলাদের স্পোর্টস করা অনুমোদন দেয়া হবেনা।

কারন, স্পোর্টস মহিলাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।আফগানিস্তানের জন্য নতুন নেতৃত্ব কতোটা অর্থবহ হবে?

নতুন সরকার যদি আফগানিস্তানের জন্য সাহায্য কামনা করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাকের অর্থ ছাড় পেতে চায় তবে তাদেরকে বিশ্বনেতৃত্বের কাছে প্রমান দিতে হবে যে তাদের পরিবর্তন ঘটেছে এবং ১৯৯৬ সালের সরকারের চরিত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটবেনা।

এবং তাদের আরও প্রমান দিতে হবে যে তারা বালিকাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করবেনা।
তাদেরকে আরও প্রমান দিতে হবে যে মহিলাদের বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের অভিযোগ এনে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপণে হত্যা করবেনা।

সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ যাদের ওপর আমেরিকার স্যাংশন রয়েছে তাতে সরকারে ওপর কি প্রভাব পড়তে পারে? বিশেষজ্ঞগনের মতে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তদের সরকারে রাখার অজুহাতে বিশ্বনেতৃত্ব তালেবান সরকারকে সহযোগিতা করার দায় এড়াতে পারেন।

বাইডেন প্রশাসন সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ সালের এক্সিকিউটিভ অর্ডারের অধীনে অলরেডি আফগান সেন্ট্রাল ব্যাংকের রিজার্ভ ফ্রিজ করেছে। উত্তর কোরিয়ার মতো আফগানিস্তানেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকতে পারে।

সরকারের প্রধান সন্ত্রাসী শুধুমাত্র সেই অভিযোগে তালেবান সরকার বহু দেশের স্বীকৃতি পাবেনা এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বানিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে আস্থা পাবেনা। কোনো পশ্চিমা দেশ কি তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে?

পশ্চিমা নেতৃত্ব যদিও স্বীকৃতি না দিয়ে এক ধরনের ওয়ারিকিং রিলেশনস রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। আমেরিকা এবং তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো কেউ এই মুহূর্তে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তে নেই। তবে যেকোনো এইডস দেয়া হবে শর্তসাপেক্ষে।

আর তা’ হচ্ছে তালেবানদেরকে বেসিক হিউম্যান রাইটস নিশ্চিত করতে হবে। এবং যেসমস্ত অসহায় আফগান দেশ ত্যাগ করতে চায় তাদেরকে দেশ ত্যাগের অনুমতি প্রদান করতে হবে। তালেবানরা একমাত্র ইসরাইল ব্যতীত সকল দেশের সাথে সুসম্পর্ক চায়।

তারা সেপ্টেম্বরে কাতারে সকল দেশের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে মিলিত হবেন। চায়না অবশ্য রাশিয়াকে অনুসরন করে প্রকাশ্যেই তালেবানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলেছে। রাশিয়া তাদের এ্যাম্বাসী কাবুলে চালু রেখেছে।

যা’হোক তালেবান সরকারের কেবিনেট সিলেকশনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অবমাননার শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন যারা অন্তর্ভূক্তিমূলক সরকারের এবং পরিবর্তিত সরকারের প্রবক্তা ছিলেন।

তারা এও মনে করেন কেবিনেটে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের পুরনো দুর্নীতিবাজদেরও অন্তর্ভূক্তি ঘটেছে। তারা দুর্নীতিবাজদের বাদ দেয়ার ব্যাপারেও সোচ্চার রয়েছেন।

মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী, সাংবাদিক-কলামিস্ট এবং সমাজকর্মী।
[ঢা-এফএ]

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

এইরকম আরো খবর: