আফগান অর্থনীতি কি ধসে পড়বে? হতে পারে মানবিক বিপর্যয়?

মোঃ শফিকুল আলম: একজন তালেবান মুখপাত্র গত শুক্রবার বলেছেন যে বৃটেন, জার্মান এবং চায়না তাদের মানবিক সাহায্য প্রদান অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

একদিকে অর্থনীতি ধসের মুখে অন্যদিকে নতুন তালেবান সরকারের কেবিনেট ঘোষনাও পেছালো।

বৃহস্পতিবার তালেবানরা তাদের সুপ্রিম লীডার মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নাম ঘোষনা করেছে।
সুপ্রিম লীডারের অধীনে হয় প্রেসিডেন্ট শাসিত বা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার থাকবে। অনেকটা ইরানের আদলে দিব্যতন্ত্র বা ধর্মশাসন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কেবিনেটে স্পষ্টত: কোনো মহিলা থাকবেনা বা বিগত সরকারগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ অন্তর্ভূক্ত হবেননা।
শুক্রবার নামাজের পরে কেবিনেট ঘোষনার কথা থাকলেও তালেবান এবং হাক্কানি নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্বের কারনে তা’ হয়নি।

তালেবান মুখপাত্র সোহেল শাহীন বলেন যে তালেবানদের উপ রাজনৈতিক প্রধান আব্বাস স্টানিকজাই পশ্চিমা সৈন্য প্রত্যাহারে যে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে তা’ নিয়ে বৃটিশ এবং জার্মান এনভয়ের সংগে আলোচনার জন্য কাতারে মিলিত হয়েছেন।

অন্য একজন তালেবান মুখপাত্র অবশ্য চাইনিজ ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার Wu Jianghao এর সাথে আলোচনা করেছেন।

চাইনিজ অথরিটি কাবুলে তাদের এ্যাম্ব্যাসী রাখবে এবং অতীতের তুলনায় তালিবানদের সাথে অধিকতর ভালো সম্পর্ক তৈরী করবে। তালেবান মুখপাত্র শাহীন নিশ্চিত করেছে যে চায়না তাদের মানবিক সাহায্য দান অব্যাহত রাখবে।

ইটালীর বিদেশ মন্ত্রী আফগানিস্তানের প্রতিবেশী উজবিকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাতার এবং পাকিস্তান সফর শুরু করেছেন গতকাল শুক্রবার।

এই সমস্ত দেশে আফগান রিফিউজিদেরকে কিভাবে সাহায্য করা যায় তাঁর সফরের সেটিই মূল এজেন্ডা।
অপরদিকে একই এলাকা সফরে আগামী সপ্তাহে আসছেন বৃটিশ ফরেন মিনিস্টার।

তালিবানরা আর্থিক সাহায্যের জন্য আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, ইইউ এবং অন্যান্য সংস্থাকে জোড়ালো আবেদন করছে।

কিন্তু এই সকল আর্থিক সাহায্য নির্ভর করবে তালেবানদের দেয়া প্রতিশ্রুতি সম্মান করার ওপর।
অর্থাৎ, সাধারন ক্ষমা ঘোষনা, মহিলাদের কাজ করা এবং শিক্ষা গ্রহনের অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিতকরন এবং একটি ইনক্লুসিভ সরকার গঠন।

বৃহস্পতিবার পশ্চিমান্চলের হেরাত নগরীতে ডজেনখানেক মহিলা বিক্ষোভ করে নতুন সরকারে মহিলা সদস্য অন্তর্ভূক্তির দাবী জানিয়েছেন। তারা মহিলাদের কাজ করার এবং শিক্ষা গ্রহন নিশ্চিতেরও দাবা জানিয়েছেন।

বাসিরা তাহেরী একজন স্থানীয় সংগঠক বলেন, “আমরা চাই তালিবানরা আমাদের সাথে পরামর্শ করুন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখতে চাইনা মহিলারা জড়ো হচ্ছেন এবং মিটিং করছেন তাদের দাবী আদায়ের জন্য।”

একটি আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ কিভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক এবং মানবিক বিপর্যায় ত্বরান্বিত হচ্ছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে। খাদ্য সরবরাহের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে অব্যাহত গতিতে। রেকর্ড সংখ্যক লোক চাকুরী হারিয়েছে আফগান ন্যাশনাল আর্মি কলাপস করায়(আফগানের সবচাইতে বড় কর্মসংস্হানের জায়গা ছিলো)।

সরকারী কর্মচারীদের বেতন দেয়া যাচ্ছেনা। কারন, আন্তর্জাতিকভাবে তাদের এ্যাসেট ট্রানজেকশন ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থ নেই। নগরীর উদ্যানগুলো উদ্বাস্তুদের ছাউনিতে ভরে গেছে।

কাবুল এয়ারপোর্ট মার্কিন সৈন্যদের এবং অসহায় আফগানদের এয়ারলিফ্টিং এর সময় যে গোলোযোগ তৈরী হয়েছে তাতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত অপারেশনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা যায়নি।

এই এয়ারপোর্ট থেকে মানবিক সাহায্য আনায়নও এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।
কাতারের বিদেশ মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন কাবুল এয়ারপোর্ট অপারেশনে যেতে উপসাগরীয় দেশসমূহ কাজ করছে।
তুরস্ক তালিবানদের কাছে এস্টিমেট চেয়েছে এয়ার্পোর্ট চালু করতে কতো প্রয়োজন হবে।

এইড এজেন্সীগুলো কাবুল এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে মানবিক সাহায্য আনায়নের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘ যদিও তাদের প্লেইনস উত্তর মাযার-ই-শরীফে ল্যান্ডিং শুরু করেছে।

পূর্বের সরকারের সময় সরকারের ব্যয়িত অর্থের ৭৫% আসতো ডোনারদের কাছ থেকে।
এখন তার সিংহভাগ স্থগিত রয়েছে। ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক এবং অন্যান্য সকল কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ঝুঁকির মুখে।

প্রয়োজনীয় আমদানির জন্য তাদের ফরেন রিজার্ভ নেই। যেখানে আফগানিস্তানের পুরো অর্থনীতি আমদানি নির্ভর।
অন্যদিকে আমেরিকা আফগানিস্তানের সেন্ট্রাল ব্যাংকের ৯.৪ বিলিয়ন ইউএস ডলারের রিজার্ভ ফ্রিজ করেছে।

এখন সরকারকে নির্ভর করতে হবে দেশের বাইরে থেকে মানিগ্রাম বা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে যে ফরেন কারেন্সী দেশে ঢুকছে তার ওপর। তবে তা’ও নির্ভর করছে মানি ট্রান্সফার শুরু হওয়ার ওপর।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের উচ্চ শিক্ষিত প্রোফেশনালস এবং আমলারা গত সপ্তাহে তাদের অর্থ, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে সবাই যতোটা সম্ভব দেশ ছেড়েছেন।

নতুন শাসকরা অবশ্য দাবী করছেন তারা ১৯৯৬-২০০১ সালের মেয়াদের থেকে অনেকটা পরিমিত এবং পরিশীলিত হয়েছেন।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের তালেবানি শাসনে তারা মহিলাদের কাজ এবং শিক্ষাগ্রহন নিষিদ্ধ করেছিলেন।

মহিলাদের পুরুষ সংগী এবং নিকাববিহীন বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো। সেই সময় তারা শাস্তিস্বরূপ প্রকাশ্যে পাথর মেরে হত্যা করা, পেটানো, হাত-পা কেটে নেয়ার তথাকথিত শরীয়তি বিধান চালু করেছিলেন।

বৃহস্পতিবার কান্দাহারে এক কিম্ভূতকিমাকার মিলিটারী বিজয় প্যারেডে তালেবান সৈন্যদের মার্চ করার সময় দেখা যায় তাদের কারো কারো পরনে সুইসাইড ভেস্ট, আড়াআড়ি বাঁধা রয়েছে এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসেস।

রয়েছে সুইসাইড কারবোম্বস ইত্যাদি যেসমস্ত টেরর আর্সেনাল বিগত দুই দশক হাজার হাজার নীরিহ মানুষের প্রাণ নিয়েছে।
অপরদিকে পান্জিশির উপত্যকায় যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

৩২ বছর বয়স্ক আহমদ মাসুদের নেতৃত্বে তালেবান বিরোধী যুদ্ধ চলছে। এই মাসুদের বাবা আহামদ শাহ মাসুদ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে একজন কমান্ডার ছিলেন এবং তারপর যুদ্ধ করেছিলেন তালিবানদের বিরুদ্ধে এবং ৯/১১ এ্যাটাকের দুই দিন আগে তালেবান কর্তৃক হত্যার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ করে গেছেন।

এমতাবস্থায় আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক বিপর্যায় এবং মানবিক বিপর্যায় ঘটতে পারে বলে বিশ্লেষকগন মনে করেন।

মোঃ শফিকুল আলম

লেখক পরিচিতিঃ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী লেখক, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক।
[ঢা/এফএ]

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

এইরকম আরো খবর: